ঠিক তখন শুনল ফিসফিস করে মেয়েটা তাকে ডাকছে, “তিতুনি! এই তিতুনি।
তিতুনি চমকে উঠে এদিক-সেদিক তাকাল, মেয়েটাকে দেখা যাচ্ছে না, কোথা থেকে কথা বলছে?
“এই যে। আমি এইখানে।”
তিতুনি গলার স্বর লক্ষ্য করে উপরের দিকে তাকাল এবং উপরের দৃশ্যটি দেখে তার হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে গেল। মাথার ওপরে ফ্যানটা ফুল স্পিডে ঘুরছে, তার উপরে ফ্যানের রডটা ধরে গুটিশুটি মেরে মেয়েটি বসে আছে। কোনোভাবে যদি হাত ফসকে যায় তাহলে ফ্যানের ব্লেডের উপর পড়বে, তখন কী অবস্থা হবে সে চিন্তাও করতে পারে না।
আব্বু-আম্মুকে নিয়ে টোটন এই ঘরের সব জায়গায় মেয়েটাকে খুঁজেছে, কিন্তু তাদের কারো মাথায় একবার উপরে তাকানোর কথা মনে হয়নি। কেন তাকাবে, একজন মানুষ যে ঘুরন্ত ফ্যানের রড ধরে ঝুলে থাকতে পারে, সেটা কি কেউ কখনো চিন্তা করতে পারে?
মেয়েটা ফিসফিস করে বলল, “তিতুনি। ফ্যানটা একটু বন্ধ করো।”
তিতুনি তখন দৌড়ে ফ্যান বন্ধ করল। ফ্যানের ব্লেডগুলো থেমে যাবার আগেই মেয়েটা রড থেকে ঝুলে মেঝেতে নেমে এলো। হাত দিয়ে শরীর পরিষ্কার করতে করতে তিতুনির দিকে এমনভাবে তাকাল
যেন এটা খুবই একটা স্বাভাবিক ব্যাপার।
তিতুনি হাঁ করে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর বলল, “তু-তুমি ওখানে উঠেছ কেমন করে?”
তিতুনি যে রকম করে কাঁধ ঝাঁকায় মেয়েটা ঠিক সেভাবে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, “চেষ্টা-মেস্টা করে।”
“কী রকম চেষ্টা-মেস্টা?”
“তুমি হলে যে রকম উঠতে আমি সে রকম করে উঠেছি।”
“আমি মোটেও ফ্যানের উপরে উঠে বসে থাকতাম না।”
মেয়েটা তিতুনির কথা মেনে নিয়ে একটা হাই তুলল। তিতুনি কেন জানি একটু রেগে ওঠে। রেগে উঠলে গলা উঁচিয়ে চিৎকার করে কথা বলতে হয় কিন্তু এখন ফিসফিস করে কথা বলতে হচ্ছে, তাই রাগটা পুরোপুরি বোঝানোনা গেল না। হাত-পা নেড়ে ফিসফিস করে বলল, “তোমাকে আমি একশ’বার বলেছি বাসায় আসবে না বাসায় আসবে না-তারপরেও তুমি বাসায় কেন চলে এসেছ?”
“অনেকক্ষণ বাসায় কাউকে দেখি না, তাই কী রকম মন কেমন কেমন করছিল।”
তিতুনি চোখ কপালে তুলে বলল, “কী বললে? বাসায় কাউকে দেখো না? তুমি কোথাকার একজন এলিয়েন আর আমার বাসার মানুষের জন্য তোমার মন কেমন কেমন করে?”
এলিয়েন মেয়েটা মাথা নাড়ল। তিতুনি আরো রেগে বলল, “ঢং করো?”
মেয়েটা না-সূচকভাবে মাথা নেড়ে বলল, “নাহ্। ঢং করি না। এখন তো আমি হচ্ছি তুমি। সারাদিন বন-জঙ্গল, মাঠঘাট, নদীর পাড়ে ঘুরে বেড়ালে তোমার বাসার মানুষের জন্যে মন খারাপ করত না?”
তিতুনি অস্বীকার করতে পারল না যে তারও মন খারাপ হতো কিন্তু তারপরও বিষয়টা মেনে নেওয়া তার জন্যে সহজ হলো না।
তিতুনির মতো মেয়েটা মুখ কাঁচুমাচু করে বলল, “তা ছাড়া আরো একটা ব্যাপার আছে।”
তিতুনি জিজ্ঞেস করল, “কী ব্যাপার?”
“অন্ধকার হবার পর কেমন জানি ভয় ভয় করতে লাগল।”
“ভয়?”
তিতুনি অবাক হয়ে বলল, “কীসের ভয়?”
মেয়েটা একেবারে সরল মুখে বলল, “ভূতের।”
তিতুনি আরেকটু হলে একটা চিৎকার করে উঠছিল, অনেক কষ্ট করে নিজেকে সামলে ফিসফিস করে বলল, “তুমি ভূতকে ভয় পাও?”
মেয়েটা বলল, “তুমি ভয় পাও দেখেই তো আমি ভয় পাই। আমি হচ্ছি তুমি।”
তিতুনি কী বলবে বুঝতে পারল না। খানিকক্ষণ হতাশভাবে মাথা নেড়ে বলল, “দেখো মেয়ে, তোমার জন্যে আমার কিন্তু অনেক বড় বিপদ হতে পারে।”
“কী বিপদ?”
“যদি কোনোভাবে কেউ তোমার কথা জেনে যায়, তাহলে তোমাকে ধরে নিয়ে যাবেই। তোমার জায়গায় আমাকে ধরে নিয়ে যাবার চান্স ফিফটি ফিফটি। যদি আমাকে ধরে নিয়ে যায় তখন কী হবে?”
মেয়েটা মাথা চুলকে বলল, “কেটেকুটে দেখবে। মনে হয় ইলেকট্রিক শক দিবে। ব্রেনটা খুলে খুলে দেখবে।”
“তাহলে?”
মেয়েটাকে কিছুক্ষণ চিন্তিত দেখায়, তারপর হঠাৎ চিন্তাটাকে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে হাসি হাসি মুখে বলল, “যেটা হয় নাই সেটা নিয়ে চিন্তা করে কী হবে? যখন হবে তখন দেখা যাবে।”
তিতুনি অবশ্যি এত সহজে ছেড়ে দিল না, ফিসফিস করে বলল, “তোমার কাজটা ঠিক হয় নাই।”
“কোন কাজটা?”
“এই যে আমার মতো চেহারা করেছ। অন্য রকম চেহারা করলে কী হতো?”
মেয়েটা অপরাধীর মতো মুখ করে বলল, “তোমাকে প্রথম দেখলাম, পছন্দ হলো
তিতুনি হাত নেড়ে বলল, “পছন্দের খেতা পুড়ি।”
কিছুক্ষণ দুইজনেই চুপ করে থাকে। মেয়েটা একসময় বলল, “যখন সকাল হবে তখন আমি না হয় চলে যাব।”
“কোথায়?”
“এই তো এদিক-সেদিক। এসেছি যখন পৃথিবীটা একটু ঘুরে দেখি।”
তিতুনি মাথা নাড়ল, বলল, “সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করার দরকার কী? এখনই যাও। আমার ঝামেলা মিটে যায়।”
মেয়েটা জানালা দিয়ে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বলল, “না বাবা। ভয় করে।”
“সকালবেলা কেমন করে যাবে? যদি আম্মু না হয় আবু দেখে ফেলে তখন কী হবে?”
“দেখবে না। খুব সকালে কেউ ঘুম থেকে ওঠার আগে চলে যাব।” তিতুনি বলল, “মনে থাকে যেন।”
“মনে থাকবে।”
তিতুনি একটু ইতস্তত করে বলল, “দেখো তুমি মনে কোরো না যেন আমি তোমাকে বাসা থেকে বের করে দিচ্ছি।”
মেয়েটা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “দিচ্ছই তো।”
“না।” তিতুনি মাথা নাড়ল, বলল, “তুমি একজন এলিয়েন মানুষ, তুমি কত কী করতে পারো। আমি তো আর কিছু করতে পারি না। তোমার মতন দেখতে বলে যদি আমাকে ধরে নিয়ে যায় শুধু সেই জন্যে-বুঝেছ?”
