এলিয়েন তিতুনি মাথা নাড়ল। আম্মু তখন অন্য-তিতুনিকে ছেড়ে দিলেন। অন্য-তিতুনি হেঁটে হেঁটে নিজের ঘরের দিকে রওনা দিল। টোটন গজগজ করতে করতে অন্য-তিতুনির দিতে তাকিয়ে বলল, “বেশি আদর দিয়ে তোর মাথা নষ্ট করা হয়েছে আর কিছু না। আমি একেবারে গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি তুই সামনে দিয়ে যাসনি, গেলে আমি দেখতাম।”
অন্য-তিতুনি বলল, “আমি তাহলে কোন দিক দিয়ে গিয়েছি?”
“নিশ্চয়ই জানালা দিয়ে বের হয়েছিলি। তোর ঘরে জানালার শিক নিশ্চয়ই তুই খুলে রেখেছিস।”
অন্য-তিতুনি দাঁত বের করে হাসল, সেটা দেখে টোটন গরম হয়ে বলল, “খবরদার, মুখ ভ্যাংচাবি না।”
“আমি মুখ ভ্যাংচাচ্ছি না, তোমার কথা শুনে হাসছি।”
এলিয়েন তিতুনি তার ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে যখন দরজা ধাক্কা দিল তখন হঠাৎ করে আসল তিতুনির মনে পড়ল সে দরজাটার ছিটকিনি লাগিয়ে রেখেছে। দরজাটা যে ভেতর থেকে বন্ধ সেটা সাথে সাথে টোটনের চোখে পড়েছে। সে চিৎকার করে বলল, “মিথ্যুক। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ, তুই বের হলি কেমন করে?”
ঘরের ভেতর থেকে ছিটকিনি খুলে আসল তিতুনি সরে যেতে চাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই টোটন লাথি দিয়ে দরজা খুলে ফেলেছে। টোটন দেখল খোলা দরজার সামনে ঘরের ভেতর একজন তিতুনি আর দরজার বাইরে আরেকজন।
টোটন গগনবিদারি একটা চিৎকার দিয়ে দুই হাতে মাথা চেপে ধরে ছুটে যেতে গিয়ে ঘরের সামনেই আছাড় খেয়ে পড়ল।
সেই আছাড় খাওয়ার শব্দে মনে হয় পুরো বাসা কেঁপে উঠল।
০৪. তিতুনি কী করবে
তিতুনি কী করবে সেটা নিয়ে এক মুহূর্ত চিন্তা করল, তারপর হাত বাড়িয়ে এলিয়েন তিতুনিকে খপ করে ধরে ভেতরে টেনে আনল। সে যে ফ্রকটা পরে আছে এলিয়েন তিতুনিও একই ফ্রক পরে আছে, কাজেই দুইজন বদলাবদলি করলে কেউ ধরতে পারবে না।
তিতুনি এলিয়েন তিতুনির কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “তুমি ঘরের ভেতরে লুকিয়ে থাকো। বের হয়ো না।”
এলিয়েন তিতুনি মাথা নেড়ে রাজি হয়ে গেল, যেন এটা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। সব বাসাতেই যেন দুইটি করে তিতুনি থাকে, একজন বাইরে কথাবার্তা বলে আরেকজন ঘরের ভেতরে লুকিয়ে থাকে।
ঘর থেকে বের হয়ে তিতুনি টোটনের কাছে গেল, টোটন হচড় পাঁচড় করে কোনোভাবে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। তিতুনি তাকে টেনে তোলার চেষ্টা করতে করতে জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে? ভাইয়া তোমার কী হয়েছে?”
টোটন তিতুনিকে দেখে কেমন যেন ভয় পেয়ে ঝটকা মেরে তিতুনির হাতটা সরিয়ে একটা লাফ দিয়ে সরে গেল, তোতলাতে তোতলাতে বলল, “তু-তু-তু-তুই! তু-তু-তুই?”
“আমি?” তিতুনি কিছুই বুঝতে পারে নাই সে রকম ভান করে বলল, “আমি কী?”
ততক্ষণে আব্বু আর আম্মুও ছুটে চলে এসেছেন।
ভয় পাওয়া গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “কী হয়েছে?”
তিতুনি বলল, “জানি না।”
টোটন তিতুনির দিকে আঙুল তুলে বলল, “তি-তি-তি…” কিন্তু কথাটা শেষ করল না, সে যে তিতুনি বলার চেষ্টা করছে সেটা বুঝতে অবশ্যি কারো সমস্যা হলো না।
আম্মু জিজ্ঞেস করলেন, “কী হয়েছে তিতুনির?”
টোটন এবার খানিকটা সামলে নিয়েছে। তিতুনিকে দেখে সে কেমন জানি ভয় পেয়ে গেল, একটু সরে গিয়ে বলল, “দু-দুইটা তিতুনি।”
কথাটার অর্থ তিনি ছাড়া আর কেউ বুঝতে পারল না। তিতুনি অবশ্য তার আব্বু আর আম্মুর মতো ভান করল সেও টোটনের কথাটার মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারছে না। বলল, “দুইটা আমি?”
“হ্যাঁ”, টোটন বলল, “তুই দুইটা।”
আব্বু ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন, “তিতুনি দুইটা? তার মানে কী?”
টোটন বলল, “একটা তিতুনি ঘরের ভেতরে। আরেকটা বাইরে।”
আব্বু আর আম্মু একজন আরেকজনের দিকে তাকালেন, তারপর তিতুনির দিকে তাকালেন, তিতুনি কাঁধ ঝাঁকিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করল সে কিছুই বুঝতে পারছে না। আম্মু টোটনের দিকে তাকিয়ে বললেন, “একজন মানুষ দুইটা কেমন করে হয়?”
টোটন বলল, “আমি দেখেছি। দুইটা তিতুনি।”
আম্মু বললেন, “কোথায় দেখেছিস?”
টোটন তিতুনির ঘরের দিকে দেখিয়ে বলল, “ঘরের ভেতরে।”
তিতুনি এইবারে হাসার ভঙ্গি করল, তারপর বলল, “ভাইয়ার মাথা খারাপ হয়ে গেছে।”
টোটন গর্জন করে বলল, “মাথা খারাপ হয় নাই। আমি স্পষ্ট দেখেছি।”
“তাহলে ভাইয়া গাঞ্জা খেয়ে এসেছে।”
টোটন আরো জোরে গর্জন করে উঠল, বলল, “আমি গাঞ্জা খাই নাই।”
“তাহলে ইয়াবা।”
টোটন এবারে কোনো কথা বলল না, শুধু হিংস্র চোখে তিতুনির দিকে তাকাল। তার চোখ থেকে আগুন বের হতে থাকল।
আব্বু চিন্তিত মুখে বললেন, “কী হয়েছে বোঝা দরকার। টোটন বাবা তুমি পরিষ্কার করে বলো দেখি তুমি কী দেখেছ।”
টোটন বলল, “আমি দেখেছি দুইটা তিতুনি। একটা ঘরের ভেতরে আরেকটা বাইরে।”
“দুইটা তিতুনি মানে কী?”
টোটন কেমন জানি অধৈর্য হয়ে বলল, “দুইটা মানে দুইটা। এক দুই। ওয়ান টু।”
আব্বু বললেন, “একজন মানুষ দুইটা হয় কেমন করে?”
টোটন যুক্তি-তর্কের দিকে গেল না, বলল, “হয়েছে। আমি দেখেছি।”
তিতুনি বলল, “হয় নাই। তুমি তবু দেখেছ। তুমি তো আমাকে একেবারে সহ্য করতে পারো না তাই সব জায়গায় আমাকে দেখো। তোমার মনের ভুল।”
আম্মু মাথা নাড়লেন, বললেন, “হ্যাঁ। মনের ভুল।”
আব্বু বললেন, “কিংবা চোখের ভুল।”
তিতুনি বলল, “মাথায় ঠাণ্ডা পানি ঢাললে মনে হয় ঠিক হয়ে যাবে।” আম্মুর দিকে তাকিয়ে বলল, “ঠাণ্ডা পানি আনব?”
