নাদু মাথা নাড়ল, বলল, “না। এই সব করলে আম্মু বকুনি দিবে। আম্মু-আব্বু যেন সন্দেহ না করে।”
“তাহলে কী করব?”
“এমন একটা কাজ করব যেটা দিয়ে সারা জীবন তিতুনিকে লজ্জা দেয়া যায়।”
টোটনের চোখ চকচক করে উঠল, “কী কাজ?”
“আগেরবার এটা করেছিলাম মিতুলের উপর। এখন তাকে আর কেউ মিতুলি ডাকে না। সবাই ডাকে হিসুনি।”
“হিসুনি?”
“হ্যা”, নাদুর মুখে হাসি ফুটে ওঠে। “মিতুল হচ্ছে আমার চাচাতো বোন। মাত্র ছয়-সাত বছর বয়স কিন্তু হেব্বি যন্ত্রণা। সারাক্ষণ কথা বলে, এক সেকেন্ড মুখ বন্ধ করে না। ধমক দিলে শুনে না, উল্টা ধমক দেয়। তখন ঠিক করলাম তাকে সাইজ করতে হবে। কি করলাম জানো?”
টোটন আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কী?”
নাদু হাসি হাসি মুখে বলল, “জন্মের মতো সাইজ করে দিলাম। কি দিয়ে করলাম জানো?”
“কী দিয়ে?”
“এক গ্লাস পানি।”
টোটন অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “এক গ্লাস পানি?”
“হ্যাঁ। মিতুল যখন ঘুমিয়েছে বিছানায় তার নিচে এক গ্লাস পানি ঢেলে দিলাম। সকালে ঘুম থেকে উঠে সে বেকুব হয়ে গেল-ভাবল সে বিছানায় হিসু করে দিয়েছে।”
নাদুর বুদ্ধি দেখে টোটন চমৎকৃত হয়ে গেল। নাদু দুলে দুলে হাসতে হাসতে বলল, “মিতুল সকালে ঘুম থেকে উঠে লজ্জায় টমেটোর মতো লাল হয়ে গেল। কারো সামনে মুখ দেখাতে পারে না। আমরা কি ছাড়ি নাকি? টিটকারি করতে করতে মিতুলের বারোটা বাজিয়ে ছেড়ে দিলাম। তাকে নিয়ে একটা কবিতা বানালাম–
মিতুল মিতুল হিসুনি
এমন কাম আর করবানি?
তারপর তার পিছে পিছে এই কবিতা বলতে লাগলাম। মিতুল কেন্দেকেটে একাকার। তার নামই হয়ে গেল হিসুনি। হিস্যু থেকে হিসুনি। সেই যে আমাদের বাসা থেকে গিয়েছে আর কোনোদিন আসে নাই।”
টোটন আনন্দে হাততালি দিয়ে বলল, “তোমার কী বুদ্ধি! ফ্যান্টাস্টিক।” তারপর বলল, “আমরা তিতুনির উপরেও এটা করতে পারি না?”
নাদু বলল, “একশ’ বার।”
উত্তেজনায় টোটনের চোখ চকচক করতে থাকে, “তিতুনির বেলা কাজটা আরো সোজা হবে। গাধাটা যখন ঘুমায় মড়ার মতো ঘুমায়। কিছু টের পাবে না।”
নাদু গম্ভীর হয়ে বলল, “একেবারে ঠাণ্ডা পানি না নিয়ে পানিটা একটু গরম করে নিতে হবে, শরীরের সমান টেম্পারেচার, তাহলে পানি ঢালার সময়ে টের পাবে না।”
টোটন নাদুর কথায় একেবার মুগ্ধ হয়ে গেল, আবার বলল, “তোমার কী বুদ্ধি নাদু!”
দিলু মাথা নাড়ল, বলল, “হ্যাঁ। ভাইয়ার মাথায় অনেক বুদ্ধি।”
“বুদ্ধির তোমরা কী দেখেছ। আরো দেখবে।”
দিলু বলল, “আমরা তিতুনিকে নিয়ে কবিতা বানাব না?”
নাদু বলল, “কবিতা তো বানাতেই হবে। কবিতা ছাড়া কী আর এই প্রজেক্ট শেষ হয় নাকি?”
টোটন চকচকে চোখে বলল, “তিতুনিকে নিয়ে কবিতা বানানো আরো সোজা হবে-আমরা বলতে পারি
“তিতুনি রে তিতুনি
তুই হলি হিসুনি–”
নাদু বলল, “কিংবা–
হিস্যু হিস্যু হিসুনি
তিতা তিতা তিতুনি।”
দিলু আনন্দে হাততালি দিয়ে দাঁত বের করে হাসতে লাগল। অনেক দিন এ রকম মজা হয়নি।
.
আম্মু, আর বড় ফুপু মিলু আর অন্য-তিতুনিকে নিয়ে ফিরে এলেন ঘণ্টা দুয়েক পরে। মিলু একটা নূতন পুতুল কিনে এনেছে, সেটা নিয়ে তার উত্তেজনার শেষ নেই। ফুপাও প্রায় একই সময় অফিস থেকে ফিরলেন। ফুপা ব্যাংকে চাকরি করেন। এই সময়ে তার কাজের চাপ অনেক বেড়ে যায়, ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে যায়। বড় ফুপুর তুলনায় ফুপা একটু গম্ভীর। ছেলে-মেয়েরা মনে হয় তাকে একটু ভয়ই পায়। টোটনের খুব ইচ্ছা ছিল মোড়ের ফাস্ট ফুডের দোকান থেকে ফ্রায়েড চিকেন কিনে খাবে কিন্তু বড় ফুপু এত কিছু রান্না করেছেন যে সাহস করে সেটা আর বলতে পারল না। খাবার টেবিলে আব্বু আর ফুপা পলিটিক্স নিয়ে আলোচনা করতে থাকলেন, আম্মু আর বড় ফুপু পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস নিয়ে আলোচনা করতে থাকলেন, নাদু, দিলু আর টোটন কম্পিউটার গেম নিয়ে আলোচনা করতে করতে চোখের কোনা দিয়ে তিতুনিকে লক্ষ করতে লাগল। আজ রাতে এক গ্লাস পানি দিয়ে কী ম্যাজিক করে ফেলা হবে সেটা চিন্তা করেই তাদের মন আনন্দে ভরে যাচ্ছিল। মিলু তার ক্লাশের পাজি ছেলেদের নানা রকম কাজকর্মের বর্ণনা তিতুনিকে শুনিয়ে যাচ্ছিল। তিতুনি খুব মনোযোগ দিয়ে সেগুলো শোনার ভান করছিল, যদিও আসলে তার আলাদা করে কিছুই শোনার দরকার নেই, কার মনের ভেতর কী আছে সেগুলো সে খুব ভালো করে জানে।
খাওয়ার পর তিতুনিকে মিলুর সাথে তার নূতন কিনে আনা পুতুলটা নিয়ে খেলতে হলো। নাদু, দিলু আর টোটন নানা রকম ভয়ংকর কম্পিউটার গেম খেলে সময় কাটিয়ে দিল। রাত একটু গম্ভীর হওয়ার পর বড় ফুপু আর আম্মু সবাইকে ঘুমাতে পাঠিয়ে দিলেন। মিলুর ঘরে তার বিছানায় মিলুর সাথে তিতুনি। নাদুর ঘরে মেঝেতে তোষক পেতে আড়াআড়িভাবে নাদু, দিলু আর টোটনের শোয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
ঠিক ঘুমানের আগে হঠাৎ নাদু আবিষ্কার করে তার খুবই পানির তৃষ্ণা পেয়েছে। পরপর দুই গ্লাস পানি খাবার পরও তৃষ্ণা যায় না, তিন নম্বর গ্লাস খাবার পর তার তৃষ্ণা মিটল। নাদুকে এভাবে পানি খেতে দেখে টোটনেরও তৃষ্ণা পেয়ে গেল আর টোটনকে পানি খেতে দেখে কেমন করে জানি দিলুরও তৃষ্ণা পেয়ে গেল। তিনজন যখন শুতে এসেছে তখন তিনজনেরই পানি খেয়ে একটু আঁইটাই অবস্থা। বিছানায় শুয়ে হাঁসফাঁস করতে করতে তারা একসময় ঘুমিয়ে গেল।
