ঘুমানোর ঠিক আগে তিন গ্লাস পানি খাওয়ার কারণে গভীর রাতে তলপেটে প্রচণ্ড চাপ অনুভব করে নাদুর ঘুম ভেঙে যায়। অন্ধকার ঘরে তার পাশে দিলু এবং দিলুর পাশে টোটন মড়ার মতো ঘুমাচ্ছে। নাদু মশারি তুলে বের হয়ে এলো। আবছা অন্ধকারে বাথরুমে গিয়ে নাদু বাথরুমের বাতিটা জ্বালিয়ে কমোডের দিকে এগিয়ে গেল। হিস্যু করায় মনে হয় একধরনের আনন্দ আছে, বিশেষ করে যখন অনেক বেশি হিস্যুর দরকার পড়ে তখন মনে হয় আনন্দটাও অনেক বেশি। তলপেটের চাপ কমে আসার সাথে সাথে নাদুর একধরনের আরাম হতে থাকে। সে মনে হয় চোখ বন্ধ করে আরামের একধরনের শব্দও করে ফেলল। তখন হঠাৎ তার বিচিত্র একটা অনুভূতি হলো, তার মনে হলো তার শরীরের নিচে একধরনের কুসুম কুসুম গরমের প্রবাহ হচ্ছে এবং ঠিক তখন দ্বিতীয়বার নাদুর ঘুম ভেঙে গেল। নাদুর এক মুহূর্ত সময় লাগল বুঝতে যে এবারে সত্যি সত্যি ঘুম ভেঙেছে, এর আগেরটা ছিল ঘুম ভাঙার স্বপ্ন। নাদুর সারা শরীর দিয়ে আতঙ্কের একটা হিম শীতল প্রবাহ বয়ে যায়, সে চৌদ্দ বছরের একটা দামড়া ছেলে বিছানায় হিস্যু করে দিয়েছে! প্রচণ্ড আতঙ্কে সে পাথরের মতো জমে গেল, এটা কীভাবে সম্ভব? এখন কী হবে? সে তার পাশে তাকাল, দিলু ঘুমাচ্ছে। ঘুমাতে ঘুমাতে ছটফট করে কিছু একটা বলল, তারপর হঠাৎ উঠে বসে পড়ল। দিলু এদিক-সেদিক তাকায়, তারপর নাদুকে ধাক্কা দিয়ে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, “ভাইয়া।”
নাদু জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে?”
“আমি-আমি–”, বলে ফাঁস ফাস করে কাঁদতে শুরু করে।
“আমি কী?”
দিলু বলল, “আমি বিছানা হিস্যু করে দিয়েছি।”
“তুইও? নাদু দিলুর কথা শুনে বিরক্ত না হয়ে কেমন যেন খুশি হয়ে উঠল।
দিলু কাঁদতে কাঁদতে বলল, “তোমার জন্যে।”
“আমার জন্যে?”
“হ্যাঁ। আমি স্বপ্ন দেখলাম, তুমি আমাকে ধরে বাথরুমে নিয়ে বললে, কর হিস্যু কর আর আমি হিস্যু করে দিয়েছি।”
নাদু বলল, “কাঁদিস না। আমারও বিছানায় হিস্যু হয়ে গেছে।”
দিলু মুহূর্তে কাদা বন্ধ করে বলল, “তোমারও?”
নাদু বলল, “হ্যাঁ। আমারও।”
গভীর রাতে দুই ভাইয়ের কথা শুনে টোটনেরও ঘুম ভেঙে গেছে। সে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, “আমারও।”
তখন তিনজন বিছানায় বসে অন্ধকারে একজন আরেকজনের দিকে তাকিয়ে থাকে। এটা কী হলো? সকালে তারা বাসার সবার সামনে মুখ দেখাবে কেমন করে? যেদিন তারা তিনজন মিলে ঠিক করেছে তিতুনিকে একটা শিক্ষা দেবে সেদিন উল্টো তাদের তিনজনের একটা উল্টো শিক্ষা হয়ে গেল? এর থেকে বড় হৃদয়বিদারক ঘটনা আর কী হতে পারে? এ রকম কাকতালীয় ঘটনা কি আগে কখনো ঘটেছে? ভবিষ্যতে কখনো ঘটবে? তিতুনি যখন সকালবেলা এটা আবিষ্কার করবে তখন আত্মহত্যা করা ছাড়া তাদের আর কি কোনো গতি আছে?”
.
ভোরবেলা ব্যাপারটা নিয়ে বাসায় ছোটখাটো একটা উত্তেজনা হলো, তিনজন শুনল মিলু ছুটে গিয়ে তিতুনিকে খবরটা দিচ্ছে।
“তিতুনি আপু কি হয়েছে জানো?”
“কী হয়েছে?”
“ভাইয়া, ছোট ভাইয়া আর টোটন ভাইয়া একসাথে বিছানায় পিশাব করে দিয়েছে। গন্ধে ঘরে যাওয়া যায় না।”
তিনজনই এই সময়ে তিতুনির গলা থেকে একটা আনন্দধ্বনি শোনার অপেক্ষা করছিল, কিন্তু সেটা শুনল না, উল্টো শুনল তিতুনি বলছে, “শ-স-স-স! মিলু এটা নিয়ে কোনো কথা বলো না। ইচ্ছে করে তা করেনি–হঠাৎ হয়ে গেছে, তারা তো বড় হয়ে গেছে, কিছু একটা নিশ্চয়ই কারণ আছে। হয়তো ঘুমানোর আগে বেশি পানি খেয়েছিল। তাদের কোনো দোষ নাই।”
“দোষ নাই?”
“না। ভান করো তুমি কিছু জানো না। আমি কিছু জানি না। মানুষকে কখনো লজ্জা দিতে হয় না।”
মিলু খুবই অনিচ্ছার সাথে বলল, “ঠিক আছে।”
নাদু, দিলু আর টোটন ঘরে বসে একজন আরেকজনের মুখের দিকে তাকায়। একজন যদি আরেকজনকে লজ্জাই না দিবে তাহলে কী দেবে? কী বলে তিতুনি?
১২. ঢাকা থেকে বাসায় ফিরে
ঢাকা থেকে বাসায় ফিরে আসার পুরো সময়টা টোটন কোনো কথা বলল না। আব্বু এবারে আর মাইক্রোবাস ভাড়া করার সাহস পেলেন না, সবাইকে নিয়ে বাসে চলে এসেছেন। বাস থেকে নেমে রিকশা করে বাসার কাছাকাছি এসে একেবারে হকচকিয়ে গেলেন। বাসার রাস্তার কাছাকাছি পুলিশ ব্যারিকেড করে রেখেছে, কাউকে যেতে দিচ্ছে না। অস্ত্র হাতে একজন পুলিশ মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, “এই রাস্ত Tয় যেতে পারবেন না। অন্য রাস্তায় যান।”
আব্বু বললেন, “অন্য রাস্তায় যাব মানে? আমার বাসা এই রাস্তায়, আমি অন্য রাস্তায় গিয়ে কী করব? কী হয়েছে এই রাস্তায়?”
“আমি জানি না।”
“কে জানে?”
পুলিশটি এবারে অস্ত্র ঝাঁকিয়ে বলল, “আমি সেটাও জানি না।”
“আমরা তাহলে কী করব? নিজের বাসায় যেতে পারব না?”
“সেটা আমি জানি না। আমার উপর অর্ডার কাউকে যেতে দেয়া যাবে না।”
আম্মু এবারে রিকশা থেকে নেমে এসে কড়া গলায় বললেন, “কে আপনাকে অর্ডার দিয়েছে তাকে ডেকে আনেন। আমরা কথা বলব।”
আম্মুর তেজি গলায় পুলিশ একটু থতমত খেয়ে গেল। মাথা চুলকে বলল, “আপনারা দাঁড়ান, স্যারকে ডেকে আনি।”
কিছুক্ষণের মাঝেই একজন সুদর্শন পুলিশ অফিসার এসে ভুরু কুঁচকে আব্বুকে জিজ্ঞেস করল, “কোনো সমস্যা?”
আব্বু মাথা নাড়লেন, “জি, সমস্যা। আমি আমার বাসায় যেতে পারছি না।”
“আপনার বাসা কোথায়?”
