একটু পরে অন্ধকার হয়ে যাবে, তখন সে আর আলো জ্বালাতে পারবে না, অন্ধকারে থাকতে হবে। অন্ধকারে কেমন করে কী করবে বুঝতে পারছে না। আগে ভেবেছিল ফ্রিজ থেকে কিছু খাবার বের করে গরম করে খেয়ে ফেলবে, এখন সেটাও করতে পারছে না। সারাদিন শুধু রুটি আর কলা খেয়ে কাটিয়ে দিতে হচ্ছে। দুপুরবেলা খুব সাবধানে তিতুনি দুইটা ডিম সিদ্ধ করে নিয়েছে। রাত্রে একটা ডিম খেয়ে নিবে, ডিমের মাঝে প্রোটিন থাকে, পেটের মাঝে অনেকক্ষণ থাকবে।
ফ্রিজে একটু দুধও আছে। খুব বেশি নেই, তাই একটু বাঁচিয়ে বাঁচিয়ে খাচ্ছে যেন শেষ না হয়ে যায়। এমনিতে সে একেবারেই দুধ খেতে চায় না। কেমন জানি গন্ধ গন্ধ লাগে, এখন ভিন্ন কথা। বিপদে পড়লে বাঘে নাকি ঘাস খায় আর তিতুনি একটু দুধ খেতে পারবে না?
আজ সকালে তার খুব দুশ্চিন্তা ছিল রাত্রি বেলা সে একা একা কেমন করে থাকবে? ভূতের ভয়ে সে নিশ্চয়ই হার্টফেল করে মরেই যাবে। এখন অবশ্যি ভিন্ন কথা-আজ রাতে আর যেটা নিয়েই ভয় থাকুক ভূতের ভয় হবে না। তাদের বাসা ঘিরে এত মানুষ, এত যন্ত্রপাতি, ভূত নিয়ে ভয় পাবার সুযোগ কোথায়? সময় কোথায়?
কিন্তু তার বুকের ভেতর একটা দুশ্চিন্তা খচখচ করছে। এলিয়েন মেয়েটাকে যদি সত্যি ধরে ফেলে তখন কী হবে? মেয়েটাকে কি জোর করে আটকে রাখবে? পুলিশ যে রকম করে রিমান্ডে নেয় এই এলিয়েন মেয়েটাকেও কী রিমান্ডে নিবে? অত্যাচার করবে? কেটে-কুটে ফেলবে? মেয়েটা যে দেখতে হুবহু তার মতো সেটা নিয়ে কি কোনো সমস্যা হবে?
তিতুনি ভেবে ভেবে কোনো কূল-কিনারা পায় না। এলিয়েন মেয়েটার সাথে একটু কথা বলতে পারলে হতো কিন্তু সে তো ঢাকায় বসে আছে। সেখানে কী যন্ত্রণা পাকাচ্ছে কে জানে। বড় ফুপুর মতো সুইট মানুষ দুনিয়াতে আর একজনও আছে কি না সন্দেহ কিন্তু তার ছেলে-মেয়েগুলো কেমন যেন! টোটনের সাথে খাতির কিন্তু তাকে একেবারে দেখতে পারে না। এলিয়েন তিতুনির সাথে কোনো কিছু নিয়ে বড় ফুপুর ছেলে-মেয়ের লেগে যাবে না তো?
১১. ঢাকায় বড় ফুপুর ফ্ল্যাটটা
ঢাকায় বড় ফুপুর ফ্ল্যাটটা বড় রাস্তার উপরে, ফ্ল্যাটের বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখা যায় রাস্তা দিয়ে বাস, গাড়ি, টেম্পো যাচ্ছে এবং আসছে। অন্যতিতুনি প্রায় পুরো সময়টাই বারান্দায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বাস, গাড়ি, টেম্পো আর মানুষ দেখল। রাস্তার দুই পাশে ফুটপাথ, বেশিরভাগই নানা ধরনের হকাররা দখল করে রেখেছে, যেটুকু ফাঁকা আছে সেখান দিয়ে পিলপিল করে মানুষ যাচ্ছে-আসছে। প্রত্যেকটা মানুষেরই নিজের একটা জীবন আছে এবং সবাই নিজের মতো কিছু একটা ভাবতে ভাবতে যাচ্ছে-আসছে, সেটা অন্য-তিতুনি খুবই মনোযোগ দিয়ে দেখল। সন্ধ্যেবেলা যখন একটা একটা করে বাতি জ্বলে উঠল, নিয়ন আলো দিয়ে রাস্তার দুই পাশ আলো ঝলমল করতে লাগল, সেটাও অন্য-তিতুনি খুব মনোযোগ দিয়ে দেখল। তাকে এ রকম গভীর মনোযোগ দিয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে
একসময় মিলু জিজ্ঞেস করল, “তিতুনি আপু, তুমি কী দেখো?”
অন্য-তিতুনি বলল, “মানুষ দেখি।”
“তুমি আগে মানুষ দেখো নাই?”
অন্য-তিতুনি ফিক করে হেসে ফেলল, বলল, “দেখব না কেন? দেখেছি। কিন্তু এই উপর থেকে পিলপিল করে হাজার হাজার মানুষ হেঁটে যাচ্ছে দেখতে খুব ভালো লাগে।”
মিলু কিছুক্ষণ এই খুব ভালোলাগার দৃশ্যটা দেখার চেষ্টা করল কিন্তু কিছুক্ষণেই তার ধৈর্য ফুরিয়ে গেল। মানুষদের দেখার কী আছে। কে জানে?
.
সন্ধ্যেবেলা আম্মু বড় ফুপুকে নিয়ে একটু কেনাকাটা করতে বের হলেন। আম্মু যখনই ঢাকা আসেন তখনই একটু কেনাকাটা করে নিয়ে যান। অন্য-তিতুনিকে শুধুমাত্র জিজ্ঞেস করার জন্যে বললেন, “তিতুনি যাবি আমাদের সাথে?”
অন্য-তিতুনি সাথে সাথে রাজি হয়ে গেল। আম্মু বেশ অবাক হলেন, কারণ তিতুনি কখনোই ঢাকা শহরে ভিড় ঠেলে দোকানপাটে যেতে চায় না। মিলু ঠিক তার উল্টো, সে সবসময়ই বাইরে যেতে চায়, তাই সেও তাদের সাথে রওনা হলো। বড় ফুপু আর আম্মুর সাথে অন্য-তিতুনি আর মিলু বের হয়ে যাবার সাথে সাথে নাদুর ঘরে নাদু, দিলু আর টোটন মিলে একটা মিটিং শুরু করে দেয়। মিটিং না বলে এটাকে অবশ্যি ষড়যন্ত্র বলাই ভালো, কারণ মিটিংয়ের বিষয়বস্তু হচ্ছে কেমন করে তিতুনিকে একটা সত্যিকারের শিক্ষা দেওয়া যায়, যেন সে সারা জীবনের জন্যে সাইজ হয়ে যায়। নাদু বলল, “টোটন, তোমার বোন মানুষটা খুবই ডেঞ্জারাস।”
টোটন মাথা নাড়ল, বলল, “আমি জানি।”
“আমি তার প্লেটে এক খাবলা লবণ দিয়েছি, সে নিশ্চয়ই হাত দিয়ে সেটা ধরে তোমার প্লেটে দিয়ে দিয়েছে।”
টোটন মাথা নাড়ল। নাদু বলল, “তা না হলে এর পর থেকে শুধু আমাদের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসে কেন?”
দিলু মাথা নাড়ল, সায় দিয়ে বলল, “হাসে কেন?”
নাদু বলল, “আমাকে বলে বোকা।”
দিলু বলল, “আমাকে বলে নাদুসনুদুস মোটাসোটা গোলগাল ফুটবল।”
টোটন বলল, “তোমাদের সাথে মাত্র একদিন থেকেছে, এর মাঝে তিতুনি কত কী বলে ফেলেছে। আমার সাথে সারাক্ষণ থাকে, চিন্তা করে দেখো আমার কী অবস্থা।”
নাদু বলল, “কাজেই তাকে ঠিকভাবে সাইজ করা দরকার।”
দিলু বলল, “চুলের মাঝে চিউয়িংগাম লাগিয়ে দেই?”
