বড় ফুপু সবার প্লেটে খাবার তুলে দিচ্ছেন, কথা বলতে বলতে সবাই খাচ্ছে। বড় ফুপু খুব ভালো রাঁধতে পারেন, আজকে সবাই আছে বলে অনেক কিছু বেঁধেছেন। আম্মু খেতে খেতে বড় ফুপুকে বললেন, “আপা, আপনার হাতে জাদু আছে, তা না হলে এত মজার খাবার রাঁধেন কেমন করে?”
বড় ফুপু বললেন, “জাদু না ছাই। তাড়াহুড়ো করে কী বেঁধেছি কী হয়েছে কিছুই জানি না।”
আম্মু বললেন, “খুব ভালো হয়েছে আপা। অসাধারণ।”
আব্বু বললেন, “আসলে বুবুর কোনো ক্রেডিট নাই। এটা আমাদের বংশের ধারা। আমাদের দাদা নাকি পীর ছিলেন। দোয়া করে দিয়েছিলেন এই বংশের সব মেয়ের হাতে জাদু থাকবে, যেটাই রান্না করবে সেটাই হবে অসাধারণ।“
যখন বড়দের এ রকম কথা চলছে ঠিক তখন নাদু অন্য-তিতুনির প্লেটের উপর বাম হাত দিয়ে আচারের বোতলটা নেয়ার ভান করতে করতে করতে ডান হাতে ঢেলে নেয়া এক খাবলা লবণ তিতুনির প্লেটে ঢেলে দিল। নিখুঁত কাজ। নিজের কাজ দেখে নাদু নিজেই মুগ্ধ হয়ে যায়।
তিতুনি প্লেট থেকে তার খাবার নিয়ে মুখে দিল। নাদু, দিলু আর টোটন চোখের কোনা দিয়ে তিতুনির দিকে তাকিয়ে আছে, এক মুহূর্তের জন্যে অন্য-তিতুনির ভুরু একটু কুঁচকে উঠে তারপর আবার স্বাভাবিক হয়ে যায়, সে তৃপ্তি করে খেতে থাকে। লবণের জন্যে খেতে তার কোনো সমস্যা হচ্ছে বলে মনে হলো না।
একটু অবাক হয়ে টোটন তার খাবার মুখে দিয়েই চমকে উঠল, তার খাবারের মাঝে এক গাদা লবণ। যেটুকু মুখে দিয়েছে সেটা বের করতেও পারছে না আবার খেতেও পারছে না। নাদু তিতুনির প্লেটে এক খাবলা লবণ দিতে গিয়ে তার প্লেটে দিয়ে দিয়েছে? কী সর্বনাশ! কেমন করে এটা ঘটল? এখন সে কী করবে? টোটন খাবার মুখে নিয়ে বসে থাকে। লবণের তেতো স্বাদ মুখ থেকে ধীরে ধীরে গলার দিকে যাচ্ছে, মনে হচ্ছে যেকোনো মুহূর্তে ওয়াক করে বমি করে দেবে।
অন্য-তিতুনি তৃপ্তি করে খেতে খেতে টোটনের দিকে তাকাল। বলল, “ভাইয়া তুমি খাচ্ছ না কেন?”
টোটন মুখে খাবার নিয়ে কোনোমতে বলল, “খাচ্ছি তো। খাচ্ছি।” তারপর মুখে যেটা ঢুকিয়েছিল সেটা কোনোমতে কোঁৎ করে গিলে নিল, তার মনে হলো পুরোটা এক্ষুনি উগড়ে দেবে।
নাদু একটু অবাক হয়ে একবার তিতুনির দিকে তাকাল। ইতস্তত করে বলল, “তিতুনি, খাবার ঠিক আছে?”
অন্য-তিতুনি বলল, “একেবারে ফার্স্ট ক্লাশ। আজকেও আমি রাক্ষসের মতো খাব। একদিনে মোটা হয়ে যাব।”
টোটন একধরনের আতঙ্ক নিয়ে তার প্লেটের দিকে তাকিয়ে আছে, খাবার মুখে দিচ্ছে না। আম্মু বললেন, “কী হলো টোটন, খাচ্ছিস কেন?”
“কে বলেছে খাচ্ছি না। খাচ্ছি তো!” বলে সে হাত দিয়ে খাবার নাড়াচাড়া করতে থাকে।
বড় ফুপু বললেন, “খাবার মজা লাগছে না?”
টোটন বলল, “লাগছে। লাগছে। অনেক মজা।” তারপর ভয়ে ভয়ে মুখে একটু খাবার নিয়ে মুখ বিকৃত করে বসে থাকে।
নাদু টোটনকে জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে?”
টোটন বলল, “আমাকে বড় ফুপু বেশি দিয়ে দিয়েছে। তুমি আমার কাছ থেকে একটু নাও।” বলে নাদু কিছু বলার আগেই নিজের প্লেট থেকে প্রায় পুরোটাই নাদুর প্লেটে ঢেলে দিল। নাদু কিছুক্ষণ অবাক হয়ে একবার টোটনের দিকে আরেকবার নিজের প্লেটের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর সাবধানে একটু মুখে দিয়ে মুখ বিকৃত করে ফেলল। অন্য-তিতুনি যখন খুব তৃপ্তি করে খাওয়া শেষ করল তখন টোটন আর নাদু দুইজনই একধরনের আতঙ্ক নিয়ে তাদের প্লেটের দিকে তাকিয়ে আছে। দুইজনের কেউই ধরতে পারল না যে খাবারে যেটুকু তেতো ভাব এসেছে সেটা সাধারণ লবণের তেতো না, সেটা অন্য রকম ভয়ংকর তেতো।
.
খাওয়া শেষে নাদুর ঘরে টোটনের সাথে নাদুর একটা বড় ধরনের ঝগড়া হয়ে গেল। টোটন বলল, “তোমার লবণ দেয়ার কথা ছিল তিতুনির প্লেটে, আমার প্লেটে কেন দিয়েছ?”
নাদু খানিকক্ষণ মাথা চুলকে বলল, “বুঝতে পারলাম না। আমি তো ভেবেছিলাম আমি তিতুনির প্লেটেই দিয়েছি।”
“না, তুমি দেও নাই। তুমি দিয়েছ আমার প্লেটে–”
নাদু গরম হয়ে বলল, “ঠিক আছে আমি না হয় ভুল করে তোমার প্লেটে দিলাম, তুমি কেন সেটা আমার প্লেটে ঢেলেছ? আমার খাওয়া কেন নষ্ট করেছ?”
“তুমি আমার খাওয়া নষ্ট করতে পারো আর আমি তোমার খাওয়া নষ্ট করতে পারব না?”
ঝগড়া আরো ডালপালা ছড়িয়ে আরো অগ্রসর হতে পারত কিন্তু ঠিক তখন অন্য-তিতুনি আর মিলু ঘরে ঢুকল বলে দুজনে থেমে গেল। টোটন এবং নাদু এই দুজনের কারোই জানার কোনো উপায় ছিল না তাদের কোনো কিছুই এই তিতুনির কাছে গোপন নেই। সে মানুষের মস্তিষ্কের ভেতর ঢুকে নিউরনের সিনাক্স কানেকশন ওলটপালট করে দিতে পারে। তার কাছে একটা প্লেটের লবণ অন্য প্লেটে পাঠানো কোনো ব্যাপারই না। সেই লবণকে একশ গুণ বেশি তেতো করে দেয়াও তার কাছে পানির মতো সহজ।
১০. আসল তিতুনি চুপচাপ
আসল তিতুনি চুপচাপ গালে হাত দিয়ে জানালার কাছে বসে আছে। পর্দার ফাঁক দিয়ে সে বাইরে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে। বাইরে অনেক রকম কাজকর্ম চলছে। নানা ধরনের গাড়ি আসছে-যাচ্ছে, গাড়ির ভেতরে কী আছে কে জানে। কেউ যেন সন্দেহ না করে সে জন্যে গাড়িগুলো ঠিক তাদের বাসার সামনে রাখছে না, দূরে নিয়ে রাখছে। একসাথে বেশি মানুষ আসে না, একজন-দুজন আসে। তিতুনি বুঝতে পারছে তাদের বাসাটাকে চারিদিক থেকে নানা যন্ত্রপাতি দিয়ে ঘিরে ফেলেছে। বিদেশি মানুষ দুটোও একবার-দুইবার বাসার সামনে থেকে ঘুরে গেছে। যারা তাদের বাসার চারপাশে কাজ করছে তারা কথাবার্তা বলে না, যদি বলতে হয় চাপা স্বরে বলে, তাই কী বলছে ঠিক শুনতে পাচ্ছে না। সে যে বাসার ভেতরে আছে সেটা যেন বাইরের মানুষেরা বুঝতে না পারে সে জন্যে তিতুনি খুবই সাবধানে আছে। চলাফেরা করছে খুবই কম, যদিও বা একটু এক ঘর থেকে অন্য ঘরে যেতে হয়, নিচু হয়ে হামাগুড়ি দিয়ে যাচ্ছে।
