নাদু মুখে অহঙ্কারের একটা ভাব এনে বলল, “পরের লেভেলটা আরো ভালো, সেখানে এসিড ছোঁড়া যায়।”
নাদু সরে টোটনকে বসার জায়গা করে দিল। টোটন মাউসটা হাতে নিয়ে শপাং শপাং করে মেয়েটাকে চাবুক দিয়ে মারতে লাগল আর ঠিক তখন খুবই বিচিত্র একটা ব্যাপার ঘটে গেল। হঠাৎ চাবুকটা একটা ফুলের মালায় পাল্টে গেল। আর সেটা দিয়ে মারার চেষ্টা করতেই ফুলগুলো ঝুরঝুর করে মেয়েটার চারিদিকে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। ভীত-আতঙ্কিত মেয়েটার মুখ হঠাৎ হাসি হাসি হয়ে যায় আর তার চারপাশে যখন ফুলগুলো ঝরে পড়তে থাকে তখন মেয়েটা আনন্দে খিলখিল করে হাসতে থাকে। সেটা দেখে মিলুও হাততালি দিয়ে আনন্দে খিলখিল করে হেসে উঠল।
নাদু অবাক হয়ে বলল, “এটা কী হলো?” টোটনের কাছ থেকে মাউসটা নিয়ে সে চেষ্টা করল, প্রত্যেকবারই চাবুকের বদলে একটা ফুলের মালা মেয়েটার দিকে ছুটে যাচ্ছে, সেখান থেকে ফুল ঝরে পড়ছে। শুধু তা-ই না, সাথে সাথে মিষ্টি একটা বাজনা হতে থাকে আর মেয়েটা আনন্দে খিলখিল করে হাসতে থাকে।
নাদু প্রায় খেপে যায়, হিসহিস করে বলল, “বাগ, নিশ্চয়ই একটা বাগ। কিন্তু আমি কালকেই খেলেছি, কোনো সমস্যা হয় নাই।”
টোটন বলল, “অন্য একটা অস্ত্র নাও। চাপাতি না হলে চায়নিজ কুড়াল।”
নাদু চায়নিজ কুড়াল বেছে নিল, সত্যি সত্যি এবারে কুড়াল সামনে দুলতে থাকে। কিন্তু কুড়ালটা দিয়ে আঘাত করতেই সেটা হঠাৎ করে একটা আইসক্রিম হয়ে গেল। মেয়েটা হাত বাড়িয়ে আইসক্রিমটা নিয়ে চেটে চেটে খেতে শুরু করে। শুধু যে খেতে থাকল তা-ই না, খুব পরিতৃপ্তির মতো শব্দ করতে লাগল।
নাদু প্রায় হুংকার দিয়ে বলল, “কী হচ্ছে এটা?”
সে আবার আঘাত করার চেষ্টা করতেই আরেকটা আইসক্রিম বের হয়ে আসে। মেয়েটা দ্বিগুণ উৎসাহে সেটাও আরেক হাতে নিয়ে নেয় আর মহানন্দে খেতে থাকে।
মিলু আনন্দে হাততালি দিয়ে বলল, “আমি খেলব। আমি খেলব।”
নাদু গর্জন করে বলল, “চুপ কর পাজি মেয়ে। আমার এত সুন্দর গেমটার বারোটা বেজে গেছে আর সে খেলবে।”
নাদু অস্ত্র হিসেবে ধারালো চাপাতি বেছে নিল, সেটা প্রথমে ঠিকই একটা চাপাতি থাকলেও সেটা দিয়ে কোপ দেওয়া মাত্র সেটা এক স্লাইস চকোলেট কেক হয়ে গেল। মেয়েটা হাত বাড়িয়ে কেকটা নিয়ে খেতে থাকে। শুধু যে খেতে থাকে তা-ই নয়, হাত-পা দুলিয়ে নাচতে থাকে এবং মনে হলো একসময় নাদুর দিকে তাকিয়ে একটা চোখ টিপে দিল।
অন্য-তিতুনি হাসি হাসি মুখে বলল, “এইবার গেমটা ঠিক আছে। খুবই সুইট গেম।”
মিলু লাফাতে লাফাতে বলল, “আমি খেলব। আমি খেলব।”
নাদু ধমক দিয়ে বলল, “চুপ কর।”
টোটন বলল, “এটা কেমন করে হচ্ছে?”
শুধু অন্য-তিতুনিই জানে এটা কেমন করে হচ্ছে কিন্তু সে কাউকে বুঝতে দিল না, বলল, “ভাইরাস। কম্পিউটার ভাইরাস। তাই না নাদু ভাইয়া?”
নাদু মেঘস্বরে বলল, “যেটা জানো না সেটা নিয়ে কথা বলো না। কম্পিউটার ভাইরাস একটা প্রোগ্রামকে অন্য কিছু করে দিতে পারে। এটা খালি নষ্ট করে দিতে পারে, না হলে বন্ধ করে দিতে পারে।”
অন্য-তিতুনি বলল, “তাহলে কম্পিউটার ব্যাক্টেরিয়া।”
নাদু বলল, “কম্পিউটার ব্যাক্টেরিয়া বলে কিছু নাই। বোকার মতো কথা বলো না।”
অন্য-তিতুনি ফিক করে হেসে ফেলল, বলল, “বোকাঁদের সাথে বোকাঁদের মতো কথা না বললে কেমন করে হবে!”
ঠিক তখন ঘরের দরজায় বড় ফুপু ধাক্কা দিলেন, বললেন, “কী হলো? দরজা বন্ধ করে তোরা কী করছিস? বের হয়ে আয়, টেবিলে খাবার দিয়েছি।”
তিতুনি দরজা খুলে বের হয়ে এলো, তার হাত ধরে মিলুও বের হয়ে গেল। ঘরের ভেতর টোটন, নাদু আর দিলু। নাদু বলল, “টোটন, তোমার এই বোনটা খুবই জ্বালাতন করে।”
টোটন বলল, “একবার বাসায় নিয়ে নিই তখন টাইট করে ছেড়ে দেব।”
“বাসাতে নিয়ে না, এইখানেই একবার টাইট করা দরকার। কী সাহস, আমাকে বোকা বলে। আমাদের ক্লাশে সবচেয়ে বেশি বুদ্ধি আমার। গত সপ্তাহেই আমি ফারজানাকে মার খাইয়েছি।”
টোটন জিজ্ঞেস করল, “ফারজানা কে?”
“আমাদের ক্লাশের একটা মেয়ে। হেভি নেকু। আমি নেকু মেয়েদের দুই চোখে দেখতে পারি না।”
টোটন বলল, “আমি মেয়েদেরকেই দেখতে পারি না।”
দিলু এক টিমে থাকার জন্যে বলল, “আমিও।”
নাদু বলল, “আজকে খাবার টেবিলে একবার টাইট দেই।”
“কীভাবে?”
নাদু কয়েক সেকেন্ড মুখ সুচালো করে চিন্তা করল তারপর বলল, “খাবার সময় তিতুনির প্লেটে এক খাবলা লবণ ঢেলে দিই। নাম যেহেতু তিতুনি, একটু তিতা খাবার খেয়ে দেখুক।”
দিলু মাথা নাড়ল, বলল, “খেয়ে দেখুক।”
টোটন জিজ্ঞেস করল, “কীভাবে লবণ দেবে?”
“আমার উপর ছেড়ে দাও, আমি এটার এক্সপার্ট। এর আগেরবার একটা বিয়ের দাওয়াতে করেছিলাম।”
“কার প্লেটে করেছিলে?”
“চিনি না, আমার পাশে বসেছিল, বেকুব টাইপের একটা ছেলে।”
“কীভাবে করো?”
“খুব সোজা। প্লেটের উপর দিয়ে হাত বাড়িয়ে কিছু একটা নেওয়ার ভান করি, তখন অন্য হাতের তলা দিয়ে লবণটা ঢেলে দিই। এই যে এইভাবে–”, নাদু করে দেখাল, এবং পদ্ধতিটা দেখে টোটন মুগ্ধ হলো। নাদুর কাছে তার অনেক কিছু শেখার আছে।
নাদু বলল, “শুধু একটা জিনিস দরকার, ঠিক পাশে বসা দরকার।”
.
খাবার টেবিলে কায়দা করে নাদু তিতুনির পাশে বসে গেল। অন্য পাশে টোটন, দুই পাশে দুইজন বসেছে প্লেটে লবণ ঢেলে দেওয়া আজকে কঠিন হওয়ার কথা না।
