“জে বস। বুঝেছি।”
“আপনি অন্য কিছু করেন।”
“অন্য কিছু?”
আব্বু বললেন, “হ্যাঁ। ব্যবসাপাতি। কন্ট্রাক্টরি। আপনার স্বাস্থ্য ভালো আছে, সিকিউরিটির চাকরি নিতে পারেন। বুঝেছেন?”
মতি ড্রাইভার মাথা নাড়ল, বলল, “বুঝেছি। কিন্তু—”
“কিন্তু কী?”
“আমার ওস্তাদ বুলবাল খান দিলে খুবই দাগা পাবে। আমি তার এক নম্বর ছাত্র ছিলাম।”
ওস্তাদ বুলবাল খানের এক নম্বর ছাত্র মতি ড্রাইভার মুখটা ভোঁতা করে গাড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে চুল, পেট আর বগল শেষ করে এবারে তার কান চুলকাতে লাগল।
.
গাড়ি থেকে সবার ব্যাগ নামিয়ে একটু হেঁটে সামনে একটা গ্যাস স্টেশন পাওয়া গেল। আব্বু সবাইকে দাঁড় করিয়ে একটা ট্যাক্সি ক্যাব খুঁজতে গেলেন। ঢাকা শহরের খুব কাছাকাছি চলে এসেছে, এখন খুব সমস্যা হওয়ার কথা না।
এক পাশে দাঁড়িয়ে লাইন বেঁধে গাড়িগুলোকে সি.এন.জি. নেয়া দেখতে দেখতে টোটন আবার তার কথা শুরু করল। যেহেতু তিতুনিকে সে মানুষ হিসেবে বিবেচনা করে না তাই আম্মুকে বলল, “আম্মু, মাইক্রোবাসের ড্রাইভারটা কিন্তু খুবই এক্সপার্ট ড্রাইভার।”
আম্মু ভুরু কুঁচকে বললেন, “এক্সপার্ট?”
“হ্যাঁ। রেল ক্রসিংয়ে মাইক্রোটাকে কেমন করে ছুটিয়ে এনেছ দেখোনি?”
“ঐখানে গিয়ে আটকাল কেন সেটা দেখবি না?”
টোটন সেটাকে বেশি গুরুত্ব দিল না, বলল, “একেবারে কম্পিউটার গেমের মতো গাড়ি চালায়। হুশহাশ করে ওভারটেক করে।”
অন্য-তিতুনি বলল, “খালি একটা পার্থক্য, কম্পিউটার গেমে অনেকগুলো লাইফ থাকে। এইখানে লাইফ খালি একটা।”
একশ ভাগ সত্যি কথাটার কোনো ঠিক উত্তর দিতে পারল না বলে টোটন খুবই বিরক্ত হয়ে অন্য পাশে সরে গিয়ে সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল। গ্যাস নেয়ার সময় প্যাসেঞ্জারদের গাড়ি থেকে নামতে হয়, তারাও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের কাছাকাছি খুব ফিটফাট একজন মানুষ, তার ধবধবে সাদা শার্ট, কুচকুচে কালো প্যান্ট, চোখে চশমা, মুখে সিগারেট। মানুষটার মাথায় চুল খুব বেশি নেই কিন্তু যেটুকু আছে তার জন্যে নিশ্চয়ই অনেক মায়া, তাই পকেট থেকে সবুজ রঙের একটা চিরুনি বের করে একবার চুলগুলো আঁচড়ে নিল।
গ্যাস স্টেশনে বেশ কয়েকজন ভিখারি ঘুরে ঘুরে ভিক্ষা করছে। ছোট ছোট কয়েকটা ছেলে-মেয়ে সিদ্ধ ডিম, পপ কর্ন আর আচার বিক্রি করার চেষ্টা করছে। একটা ছোট মেয়ে তার সিদ্ধ ডিমের ঝুড়ি নিয়ে ফিটফাট মানুষটার কাছে গিয়ে সেগুলো বিক্রি করার চেষ্টা করল। কী কারণ জানা নেই মানুষটা খুবই বিরক্ত হয়ে একেবারে খেঁকিয়ে উঠল, মেয়েটা তারপরেও হাল ছাড়ল না আবার করুণ মুখ করে কিছু একটা বলল। ফিটফাট মানুষটা এবারে রেগে উঠে মেয়েটাকে একটা ধাক্কা মেরে বসে, এর জন্যে মেয়েটা প্রস্তুত ছিল না, তাই একেবারে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল। ঝুড়ি থেকে বের হয়ে ডিমগুলো ছিটকে পড়ে গড়িয়ে যেতে থাকে। কিছু একেবারে থেঁতলে গেল।
দৃশ্যটা দেখে টোটন মনে হয় একটু আমোদ পেল, তাই ভালো করে দেখার জন্যে আরো কাছে এগিয়ে গেল। তিতুনিও টোটনের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। যেন কিছুই হয়নি এ রকম মুখের ভাব করে ছোট মেয়েটা তার গড়িয়ে যাওয়া ডিমগুলো তুলতে থাকে। ঘেঁতলে যাওয়া ডিমটা বিক্রি করতে পারবে কি না সেটা নিয়ে তার ভেতরে একটু দুর্ভাবনা হয় কিন্তু সেটা নিয়ে সে বেশি মাথা ঘামাল না। তার এই ছোট জীবনে সে প্রতিদিন এর থেকে অনেক বড় বড় বিপদ পার করে। তবে সে নিশ্চয়ই খুবই অবাক হতো যদি জানতে পারত ঝুড়ির ভেতরে এ্যাতলানো ডিমগুলো রাখতেই সেগুলো ম্যাজিকের মতো ঠিক হয়ে যাচ্ছে।
অন্য-তিতুনি নিচু গলায় টোটনকে বলল, “কাজটা ঠিক হলো না।”
“কোন কাজটা?”
“এই যে মেয়েটাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল। এখন মানুষটার ঝামেলা হবে।”
টোটন ভুরু কুঁচকে বলল, “কী ঝামেলা?”
অন্য-তিতুনি গ্যাস স্টেশনের ছাউনির উপর বসে থাকা কয়েকটা কাককে দেখিয়ে বলল, “ঐ কাকগুলো দেখেছ?”
“কী হয়েছে কাকের?”
“এরা পুরো ব্যাপারটা দেখে খুব রেগে গেছে মনে হয়।”
কথাটা শুনে টোটন এমনভাবে তাকাল যেন অন্য-তিতুনির মাথা পুরোপুরি খারাপ হয়ে গেছে। সে মুখে একটা বিদ্রুপের হাসি এনে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, তার আগেই সত্যি সত্যি একটা কাক ছাউনি থেকে উড়ে এসে ঠিক ফিটফাট মানুষের মাথায় বাথরুম করে দিল। ছোট একটা কাকের পেটে এত বিপুল পরিমাণ বাথরুম থাকতে পারে কে জানত! কারণ দেখা গেল কাকের বাথরুম তার মাথা, চোখ, গাল বেয়ে ধবধবে সাদা শার্ট পর্যন্ত ছড়িয়ে গেছে।
হতচকিত মানুষটা অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে একবার নিজের দিকে তারপর মাথা উঁচু করে কাকটার দিকে তাকাল। আর ঠিক তখন অন্য কাকগুলো কা কা করে উড়ে এসে মানুষটার মাথা, ঘাড়, মুখে ঠোকরাতে শুরু করে। মানুষটা দুই হাতে নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা করে, কিন্তু কাক খুবই ভয়ংকর পাখি, দল বেঁধে থাকলে তাদেরকে ঠেকানো সোজা কথা নয়। মানুষটা নিজেকে বাঁচানোর জন্যে দৌড়ে তার গাড়িটাতে ওঠার চেষ্টা করে কিন্তু তার আগেই সে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল।
কাকগুলো যে রকম হঠাৎ করে এসেছিল ঠিক সে রকম হঠাৎ করে উড়ে আবার তাদের ছাউনির উপর ফিরে গেল। সেখানে বসে খুবই নিরাসক্তভাবে কাকগুলো ফিটফাট মানুষটাকে দেখতে থাকে।
