কাকদের এই ঝটিকা আক্রমণ দেখে বেশ কিছু মানুষ ছুটে আসে। মাটিতে উপুড় হয়ে পড়ে থাকা মানুষটাকে টেনে দাঁড় করায়। চশমাটা ভেঙে গেছে, নাকটা মনে হয় থেঁতলে গেছে। মাথায়, মুখে, ঘাড়ে কাকের ধারালো ঠোঁটের আঘাতের চিহ্ন। বেশিরভাগ মানুষ শুধু কাকের ঝটিকা আক্রমণটুকু দেখেছে, মেয়েটাকে ধাক্কা দিয়ে ঢেলে দেয়ার আগের অংশটুকু দেখেনি, তাই তাদের সমবেদনাটা এই মানুষটার জন্যে, তারা হভাগা কাকগুলোকে গালি দিতে দিতে তাকে ঠিকঠাক করার চেষ্টা করতে থাকে।
ছোট মেয়েটা তার সবগুলো সিদ্ধ ডিম ঝুড়িতে ভরে সোজা হয়ে দাঁড়াল। ঝুড়িটা দুই হাতে বুকে জড়িয়ে ধরে মানুষটাকে দেখল, তার চোখে-মুখে একধরনের ভয়ের ছাপ নেমে আসে। কাকদের এই ঝটিকা আক্রমণের জন্যে তাকেই দায়ী করে তার উপর আরো বড় কোনো শাস্তি নেমে আসবে কি না কে জানে। সে দ্রুত সরে যেতে যেতে একবার টোটন আর অন্য-তিতুনির দিকে তাকাল। অন্য তিতুনির চোখের দিকে তাকিয়ে সে কী দেখল কে জানে, বিড়বিড় করে নিচু গলায় তাকে বলল, “আল্লাহর মাইর চিন্তার বাইর।”
তারপর সে ছুটে পালিয়ে যেতে থাকে। ঠিক তখন আব্বু একটা ক্যাব নিয়ে হাজির হলেন। বললেন, “চলো, সবাই ঝটপট উঠে পড়ো।”
০৯. দরজা খুলেই বড় ফুপু
দরজা খুলেই বড় ফুপু আনন্দে চিৎকার করে বললেন, “দেখে যা কারা এসেছে।”
তারপর টোটন আর তিতুনিকে জাপটে ধরে আদর করলেন, নাকে-মুখে চুমো খেলেন। যদিও বড় ফুপুর জানার কোনো উপায় নাই যে তিতুনি ভেবে যাকে ল্যাটা-প্যাটা করে চুমু খেলেন সেটা বহু দূর গ্যালাক্সি থেকে আসা একটা এলিয়েন এবং তার চুমু খাওয়াটা ছিল পৃথিবীর মানুষ দ্বারা একটা এলিয়েনকে প্রথমবার ল্যাটা-প্যাটা করে চুমু খাওয়া।
বড় ফুপুর আনন্দের চিৎকার শুনে তার ছেলে-মেয়েরা নিজেদের ঘর থেকে বের হয়ে এলো। সবাই নাদুসনুদুস, ফর্সা এবং গোলগাল, তাদের কেউই টোটন কিংবা তিতুনিকে দেখে এমন কিছু আনন্দের ভাব করল না। মুখে হালকা একটা তাচ্ছিল্যের বাঁকা হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আব্বু আর আম্মু তাদের দিকে তাকিয়ে হাত নাড়লেন, বললেন, “কী খবর তোমাদের নাদু দিলু মিলু?”
নাদু দিলু মিলু আব্বুর কথা শুনল কি না বোঝা গেল না, কারণ তারা যেভাবে দাঁড়িয়ে ছিল সেভাবেই দাঁড়িয়ে রইল। বড় ফুপুর ছেলে মেয়েদের মাঝে নাদু বড়, বয়সে টোটনের সমান কিন্তু চোখে চশমা আর মোটাসোটা বলে তাকে আরো অনেক বড় দেখায়। তার নাকের নিচে হালকা গোঁফ দেখা দিতে শুরু করেছে, গলার স্বর পরিবর্তন হচ্ছে বলে সেটাতে কন্ট্রোল নেই, তাই আজকাল বেশি কথা বলে না। দিলু দ্বিতীয় ছেলে, একেবারে তিতুনির বয়সী, চোখে চশমা, নাদুর মতোই মোটাসোটা কিন্তু সাইজে তিতুনি থেকে ছোট বলে আরো বেশি মোটা দেখায়। তিতুনি মেয়ে বলে তাকে পাত্তা না দেয়াটা টোটন আর নাদুর কাছে শিখেছে, কাজেই সেও তিতুনিকে পাত্তা দেয় না। সবচেয়ে ছোট জনের নাম মিলু, বয়স নয়, সে তিতুনিকে বেশ পছন্দই করে কিন্তু বড় দুই ভাই এবং টোটন যেহেতু সব সময় তিতুনিকে হাসি তামাশা ঠাট্টা টিটকারি করে তাই সে ধরে নিয়েছে এটাই নিয়ম। বড় দুই ভাইয়ের কারণে সে বেশি কম্পিউটার গেম খেলায় সুযোগ পায় না বলে চোখে এখনো চশমা ওঠেনি। বড় ফুপু টোটন আর অন্য তিতুনিকে ধরে ভেতরে আনলেন, আব্বু আর আম্মু পিছনে পিছনে ভেতরে ঢুকলেন। বড় ফুপু বললেন, “ওমা। দেখো, টোটন কত বড় হয়ে গেছে। তিতুনিও দেখি লম্বা হয়েছে।”
আব্বু বললেন, “বুবু, তোমার ওদের সাথে তিন মাস আগে দেখা হয়েছে-তুমি এমন ভাব করছ যে কয়েক বছর পরে দেখছ।”
ফুপু বললেন, “চিন্তা কর, পুরো তিন মাস পরে দেখছি। আর মাঝেমধ্যেই এক-দুই দিনের জন্যে দেখা আর না দেখার মাঝে কোনো পার্থক্য আছে নাকি?”
আম্মু বললেন, “আপা, আপনারাও তো মাঝে মাঝে আসতে পারেন, গ্রামে আমরা কেমন থাকি না হয় একবার দেখে আসলেন।”
বড় ফুপু বললেন, “অনেক হয়েছে। এখন আমাদের নিয়ে আর টিটকারি কোরো না। এই ঢাকা শহরে মানুষ কীভাবে থাকে মাঝে মাঝে এসে দেখে যেও।”
টোটন বলল, “না বড় ফুপু, ঢাকা শহরই ভালো। গ্রামে কোনো লাইফ নাই।”
বড় ফুপু বললেন, “থাক আমাকে আর লাইফ শিখাতে হবে না। এখন যা হাত-মুখ ধুয়ে একটু বিশ্রাম নে। একটু পরেই খেতে দেব।”
টোটন বলল, “বেশি করে খেতে দিবে তো বড় ফুপু? আমাদের তিতুনি আজকাল রাক্ষসের মতো খায়।”
তিতুনি রাক্ষসের মতো খায় কথাটা টোটন বেশ নাটকীয়ভাবে বলল আর সেটা শুনে নাদু-দিলু হি হি করে হেসে উঠল আর বড় দুই ভাইকে হি হি করে হাসতে দেখে মিলুও হাসার চেষ্টা করল। নাদু আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করল, “সত্যি?”
টোটন বলল, “সত্যি না তো মিথ্যা নাকি? আমার কথা বিশ্বাস না করলে আম্মুকে জিজ্ঞেস করে দেখো। একদিন রাত দুইটার সময় আম্মু ঘুম থেকে উঠে দেখে তিতুনি ফ্রিজ খুলে যা পাচ্ছে তা-ই গপগপ করে খাচ্ছে। তাই না আম্মু?”
আম্মু একটু বিরক্ত হয়ে বললেন, “খিদে পেয়েছে তো খেয়েছে। তাতে তোর সমস্যা কী? যা এখন বিরক্ত করিস না।”
টোটন বলল, “নাদু, চলো তোমার রুমে যাই। তোমার নূতন গেমগুলি দেখি।”
মিলু বলল, “ভাইয়া যা একটা গেম–”, নাদু তখন চোখ পাকিয়ে মিলুর দিকে তাকাল আর মিলু সাথে সাথে কথা বন্ধ করে ফেলল।
