টোটন খুবই মনোযোগ দিয়ে ড্রাইভারের কথা শুনছিল, এবারে জিজ্ঞেস করল, “আরেকটা কী?”
“দুই নম্বর জিনিস হচ্ছে–”, হঠাৎ করে মতি ড্রাইভার থেমে গিয়ে রিয়ার ভিউ মিররে পিছনে তাকিয়ে বলল, “নাহ্, সেইটা এখন বলা যাবে না।”
“কেন বলা যাবে না?”
“তুমরা পুলাপান মানুষ, তুমাদের সামনে বলা ঠিক নাইক্কা।”
“কেন বলা ঠিক না বলেন।” টোটনের শোনার খুবই আগ্রহ।
মতি ড্রাইভার খুবই অনিচ্ছার ভঙ্গি করে বলল, “আরেকটা হচ্ছে বোতল।”
“বোতল?” টোটন অবাক হয়ে বলল, “কীসের বোতল?”
আব্বু টোটনকে একটা ধমক দিলেন, বললেন, “তুই চুপ করবি এখন?”
ড্রাইভার অনেকটা নিজের মনে বলল, “ট্রিপ দেওয়ার আগে আধা বোতল, ট্রিপের শেষে আধা বোতল, ব্যস কুনো ঝুট-ঝামেলা নাই।”
আব্বু খুবই বিরক্ত হয়ে বললেন, “আপনি কথা না বলে এখন ঠিক করে গাড়ি চালান।”
ড্রাইভার বলল, “জি বস। গাড়ি চালাই।” বলে গ্যাসের প্যাডালে চাপ দিয়ে মাইক্রোবাসের স্পিড আরো বাড়িয়ে ফেলল। গাড়ির সবাই একেবারে নিঃশ্বাস বন্ধ করে বসে থাকে।
যেকোনো সময় যা কিছু ঘটে যেতে পারত কিন্তু কিছু ঘটল না। ঘণ্টা খানেক পর যখন ঢাকার কাছাকাছি পৌঁছেছে তখন হঠাৎ দেখা গেল সামনে গাড়িগুলো লাইন বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে। আব্বু জিজ্ঞেস করলেন, “কী ব্যাপার? জ্যাম নাকি?”
মতি ড্রাইভার বলল, “জে না। ক্রসিং।” “রেল ক্রসিং?”
“জে বস।” বলে সামনের গাড়িগুলোর পিছনে থেমে না গিয়ে সে পাশের ফাঁকা লেন দিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে থাকে। আব্বু ভয় পেয়ে বললেন, “কী হলো? কই যান?”
“ক্রসিং পার হই।”
“ক্রসিং পার হন মানে?”
“এই ট্রেন কখন আসবে কুনো ঠিক আছে? ঠিক নাইক্কা। উল্টা লেনে সামনে গিয়া রেললাইন ক্রস কইরা সামনে আবার ঠিক লেনে উইঠা যামু। আপনি খালি দেখেন।”
আব্বু বললেন, “সামনে রেল গেট ফেলে রাস্তা বন্ধ করে রেখেছে না?”
“পুরাটা করে নাই। মাইক্রো যাওনের ফাঁক আছে।”
“ফাঁক আছে বলেই উল্টা রাস্তায় আপনি এখন রেললাইন ক্রস করবেন?”
আব্বু রীতিমতো চিৎকার করে বললেন, “থামান। গাড়ি থামান।”
ড্রাইভার আব্বকে সান্ত্বনা আর সাহস দেয়, “বস, এত ঘাবড়ান কীসের লাইগ্যা? কুনো ভয় নাইক্কা। আর এইখানে গাড়ি থামানুর উপায় আছে?” বলে সে মাইক্রোবাসটা একেবারে রেল গেটের কাছে এসে উল্টো লেন থেকে বাঁকা হয়ে রেললাইনের উপর উঠে পড়ল। সাথে সাথে দূর থেকে ট্রেনের প্রচণ্ড হুইসিলের শব্দ শোনা যায়, প্রচণ্ড গতিতে দৈত্যের মতো একটা ট্রেন আসছে। ট্রেনের হুইসিল শুনে এইবার মতি ড্রাইভার পর্যন্ত ঘাবড়ে যায়। ট্রেন লাইনটা সোজাসুজি পার না হয়ে কোনাকুনি পার হওয়ার চেষ্টা করছে বলেই কি না কে জানে মাইক্রোবাসটা শেষ মুহূর্তে রেললাইনের উপর আটকে গেল। ট্রেনের ইঞ্জিন বিকট শব্দে হুইসেল দিয়ে এগিয়ে আসছে, ভয়ে-আতঙ্কে গাড়ির ভেতরে সবাই চিৎকার করে উঠল। মতি ড্রাইভার পাগলের মতো শেষবার চেষ্টা করল, গ্যাস প্যাডেলে প্রাণপণে চাপ দিয়ে কয়েকবার চেষ্টা করার পর হঠাৎ গাড়িটা কোনোভাবে ছুটে এলো এবং একটা ঝটকা দিয়ে সেটা লাইন থেকে সরে যেতেই দৈত্যের মতো বিশাল ট্রেনটা প্রচণ্ড গুইসেল দিতে দিতে বাতাসের ঝাঁপটা দিয়ে গাড়িটার একেবারে গা ঘেঁষে বের হয়ে গেল।
মতি ড্রাইভার কোনোমতে গাড়িটাকে রাস্তার ওপর তুলে এবারে ঠিক লেনে ছুটে যেতে থাকে। আব্বু একেবারে ফ্যাকাসে হয়ে গিয়েছিলেন, কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, “ড্রাইভার সাহেব, গাড়ি থামান।”
“কী বললেন বস? গাড়ি থামামু?”
“হ্যাঁ। গাড়ি থামান।”
ট্রেন ক্রসিংয়ের জন্যে সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িগুলোর পাশে দিয়ে ছুটে যেতে যেতে ড্রাইভার বলল, “কী জন্যে বস?”
আব্বু গর্জন করে বললেন, “বলছি গাড়ি থামান।”
মতি ড্রাইভার বলল, “কিছু তো হয় নাইক্কা।”
“কিছু হয়েছে কী হয় নাই আমি সেটা নিয়ে কথা বলছি না। গাড়ি থামান।”
আম্মুও এতক্ষণে নিজেকে সামলে নিয়েছেন, কাঁপা গলায় বললেন, “গাড়ি থামান।”
টোটনও যোগ দিল, বলল, “থামান, গাড়ি থামান।”
শুধু অন্য তিতুনি কিছু বলল না। মতি ড্রাইভার নার্ভাসভাবে একটু হাসার ভঙ্গি করে বলল, “বস, গাড়ি তো এখন থামান যাবে নাইক্কা। দিরং হয়ি যাবি। আপনাদের নামানোর পর আরেকটা বড় ট্রিপ আছে কক্সবাজার। ঐ ট্রিপ তো মিস করা যাবি না। কাস্টমার খুব ত্যাড়া।”
আব্বু হুংকার দিয়ে বললেন, “আমি কিছু শুনতে চাই না। গাড়ি থামান, আমরা নেমে যাব।”
সামনের দিক থেকে আসা আরেকটা ট্রাককে খুবই বিপজ্জনকভাবে পাশ কাটিয়ে গিয়ে মতি ড্রাইভার মুখ শক্ত করে বলল, “রাগ করেন ক্যান বস। আমি বলছি গাড়ি থামান যাবি না।”
মতি ড্রাইভার কথা শেষ করার আগেই গাড়ির ইঞ্জিন একটা বিদঘুঁটে শব্দ করল, গাড়িটা একটা ঝাঁকুনি দিল, তারপর কেমন যেন কাশির মতো শব্দ করতে করতে রাস্তার পাশে থেমে গেল। কেন হঠাৎ করে গাড়ির ইঞ্জিনটা বন্ধ হয়ে গেল সেটা অন্য-তিতুনি ছাড়া আর কেউ জানল না। একটু আগে ট্রেন লাইনে আটকে যাওয়া মাইক্রোবাসটা কেমন করে শেষ মুহূর্তে ছুটে এসেছে সেটাও কেউ জানে না। পুরো রাস্তার বিপজ্জনক ওভারটেকগুলোতে প্রত্যেকবার কেমন করে নিরাপদে পার হয়ে এসেছে সেটাও অন্য-তিতুনি ছাড়া আর কেউ জানে না।
