“কী করবি কম্পিউটার দিয়ে?”
টোটন প্রশ্নটা শুনে অবাক হলো, বলল, “কী করব মানে? গেম খেলব। কী ফাটাফাটি গেম আছে তুমি জানো আব্বু?”
আব্বু মাথা নেড়ে জানালেন যে জানেন না। টোটন বলল, “একটা গেম আছে খুবই মজার। তুমি গাড়ি চালাবে আর পাবলিককে চাপা দিবে। যত বেশি চাপা দিবে তত পয়েন্ট।”
আম্মু বললেন, “এটা আবার কী রকম গেম?”
টোটন দ্বিগুণ উৎসাহ নিয়ে বলল, “যখন একজনকে চাপা দিবে তখন ফটাস করে মাথাটা ফেটে যায়, না হলে ভ্যাড়াৎ করে হুঁড়ি ফেঁসে যায়
আম্মু আবার বললেন, “ছিঃ!”
টোটন তবু থামল না, “মাথার মগজ নাড়ি ভুড়ি রক্ত সব ছিটকে ছিটকে যাবে। যা মজার গেম, তোমরা চিন্তাও করতে পারবে না। খুবই রিয়েলিস্টিক।”
আব্বু বললেন, “থাক, অনেক হয়েছে রিয়েলিস্টিক গেম।”
টোটন একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, “আমার যদি একটা কম্পিউটার থাকত তাহলে দিন-রাত আমি কম্পিউটারে গেম খেলতাম। চব্বিশ ঘন্টার মাঝে বাইশ ঘণ্টা।”
অন্য-তিতুনি বেশি কথা বলছিল না। এবারে একটু চেষ্টা করল, জিজ্ঞেস করল, “বাকি দুই ঘণ্টা?”
টোটন মুখ শক্ত করে বলল, “বাকি দুই ঘণ্টা খেতাম। ফ্রায়েড চিকেন।”
অন্য-তিতুনি বলল, “কিন্তু কম্পিউটার তৈরি হয়েছে প্রোগ্রামিং করার জন্যে”
টোটন বলল, “আমি প্রোগ্রামিংয়ের খেতা পুড়ি।”
অন্য-তিতুনি বলল, “ও!” তারপর থেমে গেল।
টোটন আবার কথা শুরু করল, বলল, “আম্মু, ফুপুর বাসার কাছেই একটা ফ্রায়েড চিকেনের দোকান আছে। যা মজা, তুমি চিন্তাও করতে পারবে না। বেসন দিয়ে মাখিয়ে ডুবা তেলে ভাজে। তেল চপচপ ফ্রায়েড চিকেন। ইয়াম ইয়াম।”
কথা শেষ করে টোটন মুখে লোল টেনে নিল। আব্বু বললেন, “ফ্রায়েড চিকেন একটা খাওয়ার জিনিস হলো?”
টোটন মহা উৎসাহে বলল, “বার্গারও পাওয়া যায়। আর পিতজা।”
টোটন খাওয়ার আলোচনাটা আরো খানিকক্ষণ চালিয়ে যেতে চাইছিল কিন্তু তখন রাস্তার মোড়ে ছোট একটা ভিড় চলে এলো এবং ড্রাইভার এমনভাবে হর্ন দিতে লাগল যে কারো আর কোনো কথা শোনার উপায় থাকল না।
আব্বু একটু বিরক্ত হয়ে ড্রাইভারকে বললেন, “এত জোরে হর্ন দেওয়ার কোনো দরকার আছে? দেখছেন না সামনে ভিড়।”
ড্রাইভার হর্ন থামানোর কোনো লক্ষণ দেখাল না, বলল, “এই মানুষগুলা এমনি এমনি সরবি মনে করেন? এরা সরবি না। হর্ন দিলেও সরবি না। দুই-একটারে চাপা দিলে যদি সরে।”
অন্য-তিতুনি বলল, “ভাইয়ার কম্পিউটার গেমের মতো।”
টোটন না শোনার ভান করে সামনে তাকিয়ে রইল। শেষ পর্যন্ত ভিড়টা পার হয়ে মাইক্রোবাসটা বড় রাস্তায় উঠে পড়ল এবং তখন হঠাৎ করে সবাই বুঝতে পারল এই ড্রাইভার একেবারে পাগলের মতো গাড়ি চালায়। আবু কয়েক মিনিট সহ্য করার চেষ্টা করলেন, তারপর বললেন, “ড্রাইভার সাহেব, করছেন কী? আস্তে গাড়ি চালান অ্যাক্সিডেন্ট হবে তো।”
ড্রাইভার গাড়ির স্পিড কমানোর কোনো নিশানা দেখাল না, গুলির মতো ছুটিয়ে নিতে নিতে বলল, “আমি মতি ড্রাইভার, সতের বছর থেকে গাড়ি চালাই, কুনোদিন এসকিডেন্ট হয় নাইক্কা।”
আব্বু ‘এসকিডেন্ট’ শব্দটাকে শুদ্ধ করার কোনো চেষ্টা করলেন না, বললেন, “আগে কখনো এসকিডেন্ট হয় নাই মানে না যে এখন হতে পারে না। আস্তে চালান।”
মতি ড্রাইভাই বলল, “আমি আস্তেই চালাবার লাগছি বস। আপনারা বাচ্চাকাচ্চা নিয়া উঠছেন তাই পুরা স্পিড এখনো দেই নাইক্কা।”
কথা বলতে বলতে সে বিপজ্জনকভাবে একটা ট্রাককে ওভারটেক করে সামনের দিক থেকে ছুটে আসা একটা বাসের মুখোমুখি হয়ে গেল, একেবারে কপাল জোরে মুখোমুখি অ্যাক্সিডেন্ট থেকে বের হয়ে রাস্তা থেকে ছিটকে বের হতে হতে আবার রাস্তায় চলে এলো। মতি ড্রাইভার হা হা করে হেসে বলল, “দেখলেন বস? হইচে এসকিডেন্ট? হইছে?”
আব্বু নিঃশ্বাস আটকে রেখে বললেন, “না হয় নাই। কিন্তু হতে পারত।”
“হবে নাইক্কা। কুনোদিন হয় নাই।”
মতি ড্রাইভার বিকট স্বরে হর্ন বাজাতে বাজাতে রাস্তা দিয়ে প্রায় উড়ে যেতে লাগল। বাস-ট্রাক ওভারটেক করে যখন খুশি রাস্তার অন্য পাশে যেতে থাকল এবং উল্টো দিক থেকে আসা গাড়িগুলোকে রীতিমতো ভয় দেখিয়ে রাস্তা থেকে নেমে পাশে সরে যেতে বাধ্য করতে লাগল। একটা ট্যাক্সিকে এভাবে রাস্তা থেকে নামিয়ে আনন্দে হা হা করে হাসতে হাসতে বলল, “বুঝলেন বস? আমারে গাড়ি চালান শিখাইছে আমার ওস্তাদ। ওস্তাদের নাম ছিল বুলন্দ খান।” মতি ড্রাইভার এই সময় স্টিয়ারিং থেকে হাত ছেড়ে কপাল ছুঁইয়ে তার ওস্ত দিকে সালাম জানিয়ে আবার শুরু করল, “ওস্তাদ ছিলেন কামেল মানুষ। বারো চাক্কার ট্রাক চালাইতেন, কুনো ঘুম ছাড়া একবার বাহার ঘণ্টার ট্রিপ দিছিলেন।”
বিপজ্জনকভাবে আরেকটা মাইক্রোবাসকে ওভারটেক করে সামনে থেকে আসা আরেকটা ট্রাকের পাশ দিয়ে বের হয়ে মতি ড্রাইভার আবার শুরু করল, “সেই ওস্তাদ বলত, বুঝলি মতি, গাড়ি চালানোর জন্যে লাগে দুইটা জিনিস। একটা হচ্ছে সাহস। কুনো ভয় পাবি না, সামনে দিয়ে দৈত্যের মতন ট্রাক আসতাছে? গাড়ি নিয়া সামনে দাঁড়াবি, সেই ট্রাক তোরে সাইড দিতে বাধ্য। সেই ট্রাকের বাবা তোরে সাইড দিব।”
আব্বু চোখ কপালে তুলে বললেন, “আপনার ওস্তাদ আপনাকে তাই শিখিয়েছে?”
“জে। একেবারে একশ ভাগ খাঁটি কথা। অন্য ড্রাইভার ভয় পায়, আমি পাই না। বুকের মাঝে ভয়-ডর থাকলে এই লাইনে আসা ঠিক না। ওস্তাদের জবান খাঁটি জবান।” বলে মতি ড্রাইভার আবার কপালে হাত দিয়ে ওস্তাদকে সালাম জানাল।
