তারপর মনে হলো সবাই দরজা খুলে বাইরে বের হয়ে গেল। এখন সে কী করবে? চিৎকার করতে করতে ঘর থেকে বের হবে? বলবে, “দাঁড়াও, দাঁড়াও, আমাকে নিয়ে যাও।” সবাই তখন হাঁ করে তার দিকে তাকাবে? অন্য-তিতুনি তখন সবার ব্রেনে ঢুকে সবকিছু মুছে দেবে? তখন কে যাবে? সে নাকি অন্য-তিতুনি?
তিতুনি সাবধানে জানালার কাছে গিয়ে বাইরে তাকাল। বাসার সামনে হালকা নীল রঙের একটা মাইক্রোবাস দাঁড়িয়ে আছে। পিছনের হুড খুলে সব ব্যাগ রাখা হচ্ছে। ব্যাগ ওঠানোর পর ড্রাইভার হুড বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল। আবু আর আম্মু উঠলেন। টোটন সামনে বসতে চাচ্ছিল আব্বু বসতে দিলেন না, মুখ ভোঁতা করে সে পিছনে বসল। তার সাথে অন্য-তিতুনি। আসল তিতুনি নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে থাকে, কত বড় ধড়িবাজ মেয়ে! তাকে ফেলে রেখে নিজে আসল তিতুনি সেজে ঢাকা চলে যাচ্ছে।
তিতুনি কী করবে ঠিক করার আগেই ড্রাইভার গাড়িতে উঠে মাইক্রোবাসটা স্টার্ট করে রওনা দিয়ে দিল। দেখতে দেখতে সেটা বাসার সামনের সড়কে উঠে যায়, তারপর সড়ক ধরে ছুটতে থাকে। কয়েক মিনিটের মাঝে সেটা অদৃশ্য হয়ে গেল।
তিতুনির প্রথম অনুভূতিটা হলো ভয়ের, তার বাসার সবাই তাকে ঘরের ভেতর তালা মেরে চলে গেছে। তিতুনির মনে হলো অনেক দিন পর তার আব্বু-আম্মু বাসায় এসে দেখবে সে বাসায় না খেতে পেয়ে মরে পড়ে আছে। তখন তার মনে পড়ল বাসার ফ্রিজে অনেক খাবার, সে আর যেভাবেই হোক না খেয়ে মারা যাবে না। তখন মনে হলো এই বাসার ভেতরে তালাবদ্ধ হয়ে থেকে সে পুরোপুরি পাগল হয়ে যাবে। তখন মনে পড়ল বাসার সামনের দরজায় তালা দেয়া আছে সত্যি কিন্তু সে ইচ্ছে করলেই বাসার পিছনের দরজার ছিটকিনি খুলে বের হতে পারবে। তখন মনে হলো রাত্রি বেলা যখন একা একা ঘুমাতে হবে তখন ভূতের ভয়ে সে হয়তো হার্টফেল করে মরে যাবে। চিন্তা করেই এই সকালবেলা দিনের আলোতেই তার হাত-পা কাঁপতে থাকে।
জোর করে সে মাথা থেকে চিন্তাটা দূর করে দেয়। তিতুনি প্রথমে বাথরুমে গিয়ে দাঁত ব্রাশ করে হাত-মুখ ধুয়ে নিয়ে বাসার ভেতরে এলো। ফ্রিজ খুলে দেখল খাওয়ার কী আছে। এমনিতে সকালবেলা তার কিছু খাওয়ার ইচ্ছা করে না। যেহেতু আজকে সে জানে খাবার ব্যবস্থা নেই, তাই খিদেয় পেট চো চো করতে শুরু করেছে।
তিতুনি এক স্লাইস রুটি, একটা কলা আর আধ গ্লাস দুধ মাত্র খেয়ে শেষ করেছে ঠিক তখন বাসার বাইরে সে মানুষের গলার আওয়াজ শুনতে পেল।
তিতুনি অবাক হয়ে জানালার কাছে গিয়ে পর্দার ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকায়, ঠিক তাদের বাসার সামনে বেশ কয়েকজন মানুষ। তার মাঝে একজন টিশটাশ মেয়ে। দুইজন বিদেশি, একজনের মাথার চুল পাকা অন্যজনের মাথায় ধুধু টাক। বিদেশি দুইজন একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে, অন্যেরা বাসার কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়েছে। টিশটাশ মেয়েটা জিজ্ঞেস করল, “এইটা সেই বাসা?”
জিনস আর টি-শার্ট পরা একজন বলল, “হ্যাঁ, এইটা সেই বাসা।”
“তুমি কেমন করে জানো?”
“আমি জানি। স্পেসশিপ ট্র্যাকিং ডাটা থেকে দেখেছি এই বাসার ঠিক পিছনে এলিয়েন স্পেসশিপ ল্যান্ড করেছে।”
“কেউ টের পেল না কেমন করে?”
“সবাই টের পেয়েছে কিন্তু সবাই মনে করেছে মাইল্ড ট্রেমার। ভূমিকম্প। এটা যে একটা স্পেসশিপ ল্যান্ড করেছে কেউ বুঝতে পারেনি।”
“ও।”
জিন্স আর টি-শার্ট পরা মানুষটা তিতুনিদের বাসাটার উপরে নিচে তাকিয়ে বলল, “এলিয়েনটা স্পেসশিপ থেকে বের হয়ে এই বাসায় ঢুকেছিল।”
“তুমি কেমন করে জানো?”
“আমাদের ডাটা থেকে আন্দাজ করছি।”
“এই বাসায় কে থাকে?”
“ছোট একটা ফ্যামিলি। হাজব্যান্ড, ওয়াইফ, একটা ছেলে আর মেয়ে।”
টিশটাশ মেয়েটা বলল, “বাসায় তো তালা মারা।”
“হ্যাঁ। পুরো ফ্যামিলি আজ সকালে বের হয়ে গেছে। মনে হয় একটা ট্রিপে গিয়েছে।”
“বাসাটা তাহলে ফাঁকা?”
“হ্যাঁ ফাঁকা। কেউ নেই।”
“গুড। আমরা নিরিবিলি কিছু ইনভেস্টিগেট করতে পারব।”
“হ্যাঁ। এই ফাঁকে সব যন্ত্রপাতি সেটআপ করে ফেলি।”
তারপর জিন্স আর টি-শার্ট পরা মানুষটা হেঁটে হেঁটে বিদেশি লোক দুজনের কাছে গেল, তাদের সাথে কিছুক্ষণ কথা বলল। বিদেশি লোক দুজন তখন খুবই উত্তেজিত হয়ে হাত-পা নেড়ে কথা বলতে থাকে। দূর থেকে তাদের কথা শোনা যাচ্ছিল না, শোনা গেলে তিতুনি কিছু বুঝত কি না সন্দেহ। বিদেশিদের ইংরেজি খুবই অদ্ভুত, গলার ভেতর থেকে কী রকম একটা শব্দ বের করে কথা বলে।
শুধু একটা কথা শুনতে পেল, “এবারে এই এলিয়েনটাকে ধরতেই হবে। এটা হচ্ছে সারা পৃথিবীর ইতিহাসের একমাত্র সুযোগ।”
অনন্যরাও মাথা নাড়ল, বলল, “ধরতেই হবে।” তিনি জানালা থেকে সরে এলো, তার হাত-পা কাঁপছে। এবারে এলিয়ান তিতুনিকে ওরা ধরে ফেলবে। ভুল করে যদি তাকে ধরে ফেলে? তখন কী হবে?
০৮. বাসা থেকে যখন মাইক্রোবাস
বাসা থেকে যখন মাইক্রোবাসটা রওনা দিল তখন সবারই মনে একধরনের ফুরফুরে আনন্দের ভাব। সবচেয়ে বেশি আনন্দ টোটনের মনে। সে একটানা কথা বলে যাচ্ছে কিন্তু সে যেহেতু তিতুনিকে মানুষ বলেই বিবেচনা করে না তাই তার কথাবার্তা সব আবু-আম্মুর সাথে। কথার বিষয়বস্তু অবশ্যি কম্পিউটার গেম আর ফ্রায়েড চিকেনের বাইরে যাচ্ছিল না।
মাইক্রোবাসটা রওনা দিতেই টোটন বলল, “আব্ব, আমাকে একটা কম্পিউটার কিনে দেবে?”
