তিতুনি তার বিছানার দিকে তাকাল, এক সেকেন্ড আগেও সেখানে অন্য-তিতুনি লম্বা হয়ে শুয়েছিল, এখন সেখানে কেউ নেই। কোথায় গেল মেয়েটা?
আম্মু তার ঘরের চারিদিকে তাকালেন, বললেন, “ঘরের কী অবস্থা করে রেখেছিস? একটু পরিষ্কার করতে পারিস না?”
তিতুনি চোখের কোনা দিয়ে মেয়েটাকে তখনো খুঁজে যাচ্ছিল, শেষ পর্যন্ত খুঁজে পেয়েছে। মেয়েটা বিছানায় গড়িয়ে এক পাশে চলে গিয়ে চাঁদরের নিচে ঢুকে গেছে, তাই চোখের সামনে নেই। আম্মু বিছানার দিকে ভালো করে তাকালেই দেখতে পাবেন বিছানার এক কোনায় এলোমেলো চাঁদরের নিচে একজন মানুষ। কিন্তু আম্মু সেদিকে তাকালেন না, তাকালেও দেখলেন না। একজন মানুষ যেটা দেখবে বলে আশা করে না সেটা মনে হয় দেখেও দেখে না।
ব্যাগটা তিতুনির হাতে দিয়ে বললেন, “একটা-দুইটা ভালো জমা নিবি। খালি রং ওঠা টি-শার্ট নিয়ে রওনা দিবি না।”
তিতুনি দুর্বলভাবে বলল, “টি-শার্ট পরতে আরাম–”
“এত আরামের দরকার নাই। খুব সকালে উঠতে হবে। এখন তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়।”
আম্মু নিজের মনে গজগজ করতে করতে বের হয়ে গেলেন। তখন চাঁদরের নিচ থেকে মাথা বের করে অন্য-তিতুনি উঁকি দিল, চোখ পিটপিট করে আসল তিতুনির দিকে তাকিয়ে একটু হাসার ভঙ্গি করল।
তিতুনি ফিসফিস করে বলল, “তোমাকে আম্মু দেখলেন কেন?”
“অনেক তাড়াতাড়ি সরে গেছি তো, তাই।”
“অনেক তাড়াতাড়ি সরেছ তো কী হয়েছে? সরতে দেখা যাবে কেন?”
“যখন ফ্যানের পাখা ঘুরতে থাকে তখন তুমি সেটা দেখো?”
তিতুনি চোখ বড় বড় করে বলল, “তুমি ফ্যানের পাখার মতো তাড়াতাড়ি যেতে পারো?”
অন্য-তিতুনি প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে কেমন জানি ঘাড় ঝাঁকাল। উত্তর দিতে না চাইলে আসল তিতুনি যেভাবে ঘাড় আঁকায়।
চাঁদরের নিচ থেকে বের হয়ে মেয়েটা ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, “তুমি কাল ঢাকা যাচ্ছ?”
তিতুনি একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, “আমি যেতে চাই না।”
মেয়েটা মাথা নাড়ল, বলল, “জানি।”
“কিন্তু না যেয়ে উপায় কী? যেতেই হবে।”
মেয়েটা আবার মাথা নাড়ল, বলল, “জানি।”
“তোমাকে এই দুই দিন একা একা থাকতে হবে। তুমি তো আর আমাদের সাথে মাইক্রোবাসে ঢাকা যেতে পারবে না।”
মেয়েটা একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, “জানি।”
“যখন আমি নাই তখন তোমার বাইরে ঘোরাঘুরি করা ঠিক হবে। পরিচিত কেউ দেখে ফেললে অবাক হয়ে যাবে।”
মেয়েটা আবার একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, “জানি।”
তিতুনির তখন তাদের স্কুল এবং ফাক্কু স্যারের কথা মনে পড়ল। জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা, আজকে ক্লাশে কী হয়েছিল? তুমি ফাক্কু স্যারকে টাইট করেছ?”
“নাহ্ সে রকম কিছু না। শুধু ব্রেনের ভেতর আকার-উকার বলার অংশটা মুছে দিয়েছি। এখন ঠিক করে কথা বলতে পারছে না।”
তিতুনি বলল, “আমি যখন বললাম হোম ওয়ার্কের কথাটা ব্রেন থেকে মুছে দিতে তখন রাজি হলে না, এখন পুরো আকার-উকার মুছে দিয়েছ? এখন কোনো দোষ হয়নি?”
“এটা অন্য ব্যাপার। আকার-উকার মুছে দিলেও ক্ষতি নাই। আস্তে আস্তে আবার শিখে নিবে। একটা স্মৃতি মুছে দিলে সেটা আর ফেরত আসবে না। আমি সেটা করতে পারব না।”
“তোমার ঢং দেখে আমি বাঁচি না।”
মেয়েটা তিতুনির দিকে তাকিয়ে বলল, “তোমার সমস্যাটা কি জানো?”
“কী?”
“তোমার মনে থাকে না যে আমি দূর গ্যালাক্সি থেকে আসা একটি এলিয়েন। তুমি মনে করো আমিও বুঝি তোমার মতো বোকাসোকা একটা মেয়ে।”
তিতুনি দাঁত কিড়মিড় করে বলল, “আমি বোকালোকা?”
অন্য-তিতুনি ঘাড় ঝাঁকিয়ে বলল, “সেটা নিয়ে দুশ্চিন্তা না করে এখন ঘুমাও। মনে আছে তোমার খুব সকালে ঘুম থেকে উঠতে হবে?”
তিতুনি বলল, “আগে আমার ব্যাগ গোছাতে হবে।”
“সেটা নিয়ে তোমার চিন্তা করতে হবে না। আমি তোমার ব্যাগ গুছিয়ে দেব।”
“তুমি পারবে?”
“এইটা হচ্ছে তোমার দুই নম্বর সমস্যা। তুমি ভুলে যাও যে আমি হচ্ছি তুমি। একেবারে হান্ড্রেড পার্সেন্ট তুমি। বলা উচিত হান্ড্রেড অ্যান্ড টেন পারসেন্ট তুমি!
“সেইটাই হচ্ছে সমস্যা।”
তিতুনি বালিশে মাথা রাখতেই ঘুমিয়ে গেল। এটা কী তার নিজের সত্যিকারের ঘুম নাকি অন্য-তিতুনি কোনো একটা কায়দা করে তাকে ঘুম পাড়িয়ে দিল সে বুঝতে পারল না।
.
ঠিক যত সকালে তার ঘুম থেকে ওঠা উচিত তিতুনির ঘুম ভাঙল তার থেকে পরে। ঘুম থেকে উঠে সে বাসার ভেতরে অন্যদের কথা শুনতে পেল, এবং রীতিমতো আঁতকে উঠল। শুনল আম্মু বলছেন, “টোটন, তুই তোর ঘরের জানালা বন্ধ করেছিস?”
“করেছি আম্মু।”
“মনে আছে একবার জানালা খুলে রেখে গেলি, বৃষ্টিতে ঘরবাড়ি ভেসে গেল। আমার এত দামি টেবিল ক্লথের বারোটা বাজিয়ে দিলি।”
টোটন বলল, “না আম্মু, এইবার জানালা বন্ধ করে এসেছি।”
তখন আম্মু বললেন, “তিতুনি। তুই?”
তিতুনি নিঃশ্বাস বন্ধ করে শুনল, অন্য-তিতুনি বলছে, “জি আম্মু, আমার ঘরের জানালা বন্ধ।”
তার মানে অন্য-তিতুনি আম্মু, আব্বু আর টোটনের সাথে ঢাকা যাচ্ছে। তাকে এখানে একা ফেলে রেখে। এখন সে কী করবে? চিৎকার করে বলবে, “আমি আসল তিতুনি? আমাকে নিয়ে যাও।”
তিতুনি শুনল আব্বু বলছেন, “সবাই বের হও। মাইক্রোবাস অপেক্ষা করছে। ট্রাফিক জ্যাম শুরু হবার আগে পৌঁছে যেতে হবে।”
টোটন বলল, “চলো আব্বু।”
তিতুনি শুনল অন্য-তিতুনি বলছে, “আমি রেডি।”
