আব্বু বললেন, “অনেক দিন ঢাকা যাই না। একটু ঘুরে আসি। বুবুর সাথে একটা কাজও আছে।”
টোটন টেবিলে থাবা দিয়ে বলল, “ফ্যান্টাস্টিক। আমরা কেন এই জঙ্গলে পড়ে থাকি আব্ব? আমরা কেন বড় ফুপুর মতো ঢাকা থাকতে পারি না?” ।
আব্বু বললেন, “ঢাকা থাকা কী মুখের কথা নাকি? লিভিং কস্ট কত জানিস? সেখানে গেলে তোরা কোন স্কুলে পড়বি? কী করবি?”
তিতুনি বলল, “আমি ঢাকা যেতে চাই না।”
টোটন বলল, “তুই হচ্ছিস গেরাইম্যা মেয়ে। তুই কেন শহরে যেতে চাইবি?”
তিতুনি বলল, “আমি সেটা বলি নাই।”
“তাহলে কী বলেছিস?” “আমি বলেছি আমি কালকে ঢাকা যেতে চাই না।”
আম্মু বললেন, “ঢাকা যেতে চাই না মানে?”
“আমার ঢাকা যেতে ভালো লাগে না। এত ভিড়, এত মানুষ—”
আব্বু বললেন, “তোর বড় ফুপু তোদের কত আদর করে।”
“বড় ফুপুকে বলো এখানে চলে আসতে।”
“সে কত ব্যস্ত, কীভাবে সময় পাবে?”
তিতুনি যদিও মুখে এই কথাগুলো বলছে কিন্তু তার মাথায় সারাক্ষণ এলিয়েন তিতুনির কথা ঘুরপাক খাচ্ছিল। তার পুরো জীবনটা এখন এলিয়েন তিতুনির হাতে। এত বড় একটা ব্যাপার অথচ ব্যাপারটা কাউকে জানাতে পারছে না-ঠিক কেন জানাতে পারছে না সেটাও বুঝতে পারে না। এলিয়েন তিতুনি যদি দেখতে অন্য রকম হতো তাহলে ব্যাপারটা কত সোজা হতো, কিন্তু শুধু যে দেখতে হুবহু এক তা-ই নয়, তার কথাবার্তা, চিন্তা-ভাবনা তার মতো, তার পুরো মগজটাও সে কপি করে নিজের মাথায় রেখেছে, সে যেটা জানে অন্য তিতুনিও সেটা জানে। মাঝে মাঝে তার সন্দেহ হতে থাকে আসল তিতুনি কোনজন, সে নাকি অন্যজন!
কাজেই যখন ঢাকা যাওয়া নিয়ে আলোচনা হচ্ছে তখন তিতুনির মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে অন্য-তিতুনির কথা। সে এখন কী করবে? তাদের সাথে যাবে নাকি এখানে একা একা থেকে যাবে?
তিতুনি অন্যমনস্কভাবে চিন্তা করছিল, তখন হঠাৎ শুনল আব্বু বলছেন, “খুব ভোরে রওনা দিব। একটা মাইক্রোবাস ভাড়া করেছি। চারজন একেবারে হাত-পা ছড়িয়ে যেতে পারব।”
টোটন বলল, “ফ্যান্টাস্টিক।”
তিতুনি বলল, “আমি যেতে চাই না।”
আম্মু একটু গরম হয়ে বললেন, “বাসায় তুই একা একা থাকবি নাকি?”
তিতুনির ইচ্ছে হলো বলে, “আমি মোটেও একা থাকব না। আমার সাথে থাকবে একটা এলিয়েন। তোমরা আমাকে যতটুকু দেখে-শুনে রাখবে এই এলিয়েন আমাকে তার থেকে একশ গুণ বেশি দেখে-শুনে রাখবে। ফাক্কু স্যারের মতো মানুষকে সে সাইজ করে ছেড়ে দিয়েছে। কিন্তু সত্যি সত্যি তো আর সেটা বলতে পারে না, তাই চুপ করে রইল।
আম্মু বললেন, “খাওয়ার পর ছোট একটা ব্যাগে দুই দিনের জামা-কাপড় গুছিয়ে নিস। সকালে যেন দেরি না হয়।”
তিতুনি কোনো কথা বলল না, একটা বড় নিঃশ্বাস ফেলল। আজকে স্কুল থেকে ফেরার পর অন্য-তিতুনির সাথে তার দেখা হয়নি। কোথায় আছে কে জানে। আজকে কোন কায়দায় বাসায় ঢুকবে, ঢুকে আবার কোন ঝামেলা পাকাবে সেটাই বা কে জানে! স্কুলে ফাক্কু স্যারকে সাইজ করার জন্য ক্লাশে সে একটা বড় কিছু অঘটন ঘটিয়েছে টের পেয়েছে, অঘটনটা ঠিক কী সেটাও তিতুনি জানে না। না জানা পর্যন্ত সে খুব অস্বস্তিতে আছে, কারণ ক্লাশের সবাই ধরেই নিয়েছে। ঘটনাটা ঘটিয়েছে সে।
তিতুনি চুপচাপ খেয়ে নিজের ঘরে ফিরে এসে চমকে উঠল। বিছানায় লম্বা হয়ে অন্য-তিতুনি শুয়ে আছে। তিতুনি চমকে উঠে ফিসফিস করে বলল, “তুমি?”
অন্য-তিতুনি মাথা নাড়ল, বলল, “হ্যাঁ। আমি।”
“কেমন করে ঢুকেছ?”
অন্য-তিতুনি বলল, “জানালা দিয়ে।”
“জা-জানালা দিয়ে?”
“হ্যাঁ।”
“দোতলার জানালায় উঠেছ কেমন করে?”
“হ্যাচড়-পাঁচড় করে, খামচা-খামচি করে।”
“জানালার শিকের ভেতর দিয়ে ঘরে ঢুকেছ কেমন করে?”
“শিক বাঁকা করে নিয়েছি।”
তিতুনি জানালার দিকে তাকাল, শিক কোনোটাই বাঁকা নয়। অন্য-তিতুনি দাঁত বের করে হাসল, বলল, “আবার সোজা করে রেখেছি।”
তিতুনি চোখ বড় বড় করে তাকাল, এই মোটা মোটা লোহার শিক কেমন করে বাঁকা করল? কেমন করে আবার সোজা করল? অন্য-তিতুনি বলল, “আজকে তোমার কিছু নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। আমি খেয়ে এসেছি।
“খেয়ে এসেছ? কোথা থেকে খেয়ে এসেছ?”
“ঐ তো!” বলে অন্য-তিতুনি বিষয়টা এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করল। তিতুনি চাপা গলায় যতটুকু সম্ভব কঠিন স্বরে জিজ্ঞেস করল, “কোথা থেকে খেয়ে এসেছ?”
তিতুনির কঠিন গলায় কথা বলার কারণ আছে, কারণ সে যেখান থেকেই খেয়ে আসুক সবাই ধরে নিয়েছে এটা তিতুনির কাজ। তিতুনি আবার চাপা গলায় জিজ্ঞেস করল, “বলো কোথায় খেয়ে এসেছ?”
অন্য-তিতুনি একটু লাজুক মুখে বলল, “মাহতাব চাচার বাসা থেকে।”
তিতুনি চোখ কপালে তুলে বলল, “মা-হ-তা-ব চা-চা-র বাসা থেকে, তুমি মাহতাব চাচার বাসায় গিয়েছিলে? ভাত খেতে?”
“জোর করে খাইয়ে দিলেন। চাচি খুবই সুইট। মাহতাব চাচার ছোট বাচ্চাটা খুবই কিউট।”
তিতুনির তখনো বিশ্বাস হচ্ছে না, সে চোখ দুটো কপালে তুলেছিল সেগুলো কপালে রেখেই বলল, “তুমি শুধু ভাত খেতে মাহতাব চাচার বাসায় চলে গেলে? তোমার লজ্জা করল না?”
মেয়েটা আবার দাঁত বের করে হাসল, “লজ্জা করবে কেন? আমার জায়গায় তুমি হলে তুমিও চলে যেতে।”
ঠিক তখন দরজা খুলে আম্মু ঘরের ভেতর ঢুকলেন, তিতুনি ঘুরে আম্মুর দিকে তাকাল, এখন আম্মু নিশ্চয়ই একটা ভয়ংকর চিৎকার করে উঠবেন, কিন্তু আম্মু চিৎকার করলেন না, হাতে ধরে রাখা একটা ব্যাগ তিতুনির দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, “নে, এইখানে তোর জিনিসগুলি রাখ।”
