ফাক্কু স্যার আবার বলার চেষ্টা করলেন, সবাই শুনল স্যার বললেন, “তক অম খন কর ফলব।” নিশ্চিতভাবেই বলার চেষ্টা করছেন তোকে আমি খুন করে ফেলব, কিন্তু বলছেন অন্যভাবে।
তিতুনির মতো মেয়েটাকে খুন করে ফেলার কাজটা আপাতত বন্ধ করে ফাক্কু স্যার ঠিক করে কথা বলার চেষ্টা করলেন, বিড়বিড় করে বললেন, “ক হল অমর? অম ঠক কর কথ বলত পরছ ন কন?”
ক্লাশের মেয়েদের ভেতর অবাক হওয়ার বিষয়টা শেষ হয়ে হঠাৎ করে একধরনের মজা পাওয়ার বিষয়টা শুরু হলো। কে যেন খুকখুক করে হেসে উঠল। হাসি ব্যাপারটা সংক্রামক এবং হঠাৎ করেই অনেকে খুকখুক করে হাসতে শুরু করল। ফাক্কু স্যার ক্লাসের দিকে তাকালেন এবং হুংকার দিয়ে বললেন, “খবরদর! চপ কর সবই।”
যদিও কথার উচ্চারণ বিচিত্র কিন্তু সবাই বুঝল, ফাক্কু স্যার সবাইকে চুপ করতে বলছেন, তাই আপাতত তারা হাসি থামিয়ে আর কী মজা হয় সেটা দেখার জন্যে আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল। স্যার একবার সেঁক গিললেন, তারপর বিড়বিড় করে বললেন, “হল! হল! হল মক্ৰফন টস্টং। ওন ট থ্র ফর ফভ–”
মাইক টেস্ট করার সময় যেভাবে বলে, “হ্যালো! হ্যালো! হ্যালো মাইক্রোফোন টেস্টিং। ওয়ান টু থ্রি ফোর ফাইভ” ঠিক সেভাবেই ফাক্কু স্যার তার কথা বলার সিস্টেম টেস্ট করে দেখছেন। কাজ হচ্ছে না।
ফাক্কু স্যার ক্লাশের দিকে তাকালেন, ফ্যাকাসে মুখে বললেন, “ক হল অমর?”
অন্য-তিতুনি হাসি হাসি মুখে বলল, “স্যার, আপনি আকার উকার-একার ব্যবহার না করে কথা বলার চেষ্টা করছেন।”
স্যার ফ্যাকাসে মুখে মাথা নাড়লেন। ক্লাশের ফার্স্ট গার্ল যে সবকিছু জানে সে বলল, “স্যার আপনার মনে হয় ব্রেন স্ট্রোক করেছে।”
ফাক্কু স্যার চোখ কপালে তুলে বললেন, “ব্রন স্টর্ক?”
“জি স্যার। ব্রেন স্ট্রোক হয়ে ব্রেনের যে জায়গায় আকার-উকার একার আছে সেটা ড্যামেজ হয়ে গেছে। তাই আকার-উকার-একার বলতে পারছেন না।”
ফাক্কু স্যারের মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল, স্যার বললেন, “তই কমন কর জনস?” কারো বুঝতে সমস্যা হলো না স্যার বলার চেষ্টা করছেন, “তুই কেমন করে জানিস?”
মেয়েটা উত্তর দেওয়ার আগেই অন্যেরা বলল, “ওর আব্বু ডাক্তার।”
ডাক্তারের মেয়ে নিশ্চয়ই অর্ধেক ডাক্তার হবে, তাই ফাক্কু স্যার তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “ওখন ক হব?” অর্থাৎ “এখন কী হবে?”
ডাক্তারের মেয়ে মাথা চুলকাতে থাকে, এখন কী হবে সে জানে। তখন অন্য-তিতুনি বলল, “স্যার, মনে হয় আপনাকে আবার নূতন করে শিখতে হবে।”
ফাক্কু স্যার মুখ কালো করে বললেন, “নতন কর শখত হব?”
“জি স্যার, প্রথমে আকার বলা প্র্যাকটিস করেন, তারপর ইকার, তারপর উকার এভাবে। আস্তে আস্তে শিখতে হবে।”
ফাক্কু স্যার একটু আগে স্টিলের রুলার দিয়ে পিটিয়ে অন্য তিতুনিকে খুন করে ফেলতে চেয়েছিলেন। ঠিক করে কথা বলতে না পারায় এই ভয়াবহ বিপদে পড়ে এখন সেসব ভুলে গেছেন। যে যেই পরামর্শ দিবে সেটাই মেনে নিতে রাজি। অন্য-তিতুনির পরামর্শ খুব আগ্রহ নিয়ে শুনলেন।
অন্য-তিতুনি বলল, “জি স্যার, একটা কবিতা আবৃত্তি করার চেষ্টা করেন। সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি’ কবিতাটা আপনি জানেন স্যার?”
ফাক্কু স্যার মাথা নেড়ে জানালেন যে কবিতাটা জানেন। তিতুনি বলল, “তাহলে আপনি এখন প্রথমে এটাকে বলবেন এভাবে
সকল উঠয় অম মন মন বল
সরদন যন অম ভল হয় চল।
তারপর এর সাথে আকার লাগিয়ে বলার চেষ্টা করবেন। তখন এটা হবে
সাকালা আঠায়া আমা মানা মানা বালা
সারাদান যানা আমা ভালা হায়া চালা।
যখন আকার প্র্যাকটিস হয়ে যাবে তখন ইকার লাগাবেন। তখন বলবেন
সিকিলি ইঠিয়ি ইমি মিনি মিনি বিলি
সিরিদিন যিনি ইমি ভিলি হিয়ি চিলি।
যখন এইটা প্র্যাকটিস হবে তখন–”
ফাক্কু স্যার হাত তুলে অন্য-তিতুনিকে থামালেন, বললেন, “বঝছ। অম বঝছ।” অর্থাৎ “বুঝেছি। আমি বুঝেছি।”
একটু পরে দেখা গেল ফাক্কু স্যার চেয়ারে গুটিশুটি হয়ে বিড়বিড় করে কবিতা বলার চেষ্টা করছেন।
ক্লাশ শেষ হওয়ার আগে ক্লাশের বেশিরভাগ মেয়েই আকার-ইকার ছাড়া কথা বলতে এবং সেই কথা বুঝতে শিখে গেল।
স্কুল ছুটির পর আসল তিতুনি যখন বাসায় ফিরে যাচ্ছে তখন তাদের ক্লাশের একজন মেয়ে ঝিনু ছুটে এসে তাকে ধরে বলল, “ততন, ও ততন!”
তিতুনি অবাক হয়ে বলল, “কী বলছিস তুই?”
মেয়েটি হি হি করে হাসতে হাসতে বলল, “অম বলছ অজক ক মজ হল, তই ন?”
তিতুনি সাথে সাথে বুঝে গেল অন্য-তিতুনি ক্লাশে নিশ্চয়ই কোনো একটা অঘটন ঘটিয়েছে। কী অঘটন ঘটিয়েছে এখন জানার উপায় নেই কিন্তু যেটাই ঘটে থাকুক সেটা নিশ্চয়ই খুবই মজার। তা না হলে সবাই এই বিচিত্র ভাষায় কথা বলছে কেন?
মেয়েটা বলল, “ক হল? তই কথ বলস ন কন?”
তিতুনি বলল, “বলছ। অম কথ বলছ।”
তারপর দুইজনে মিলে হি হি করে হাসতে লাগল। শুধু তিতুনি তখনো জানে না সে কেন হাসছে।
০৭. খাবার টেবিলে আব্বু বললেন
খাবার টেবিলে আব্বু বললেন, “কালকে সবাই মিলে ঢাকা যাব।” টোটন আনন্দের মতো শব্দ করল আর তিতুনি যন্ত্রণার মতো একটা শব্দ করল। ঢাকা শহর টোটনের খুবই পছন্দ, তার একটা কারণ ঢাকা গেলে তারা সাধারণত বড় ফুপুর বাসায় ওঠে আর বড় ফুপুর বড় ছেলে ঠিক টোটনের বয়সী। স্বভাবও ঠিক টোটনের মতো। বড় ফুপুর সব ছেলে-মেয়েগুলোই জানি কী রকম আঠা আঠা, কথা বলে না, হাসে না। যখন হাসে তখন মুখটা জানি কী রকম বাঁকা করে হাসে, দেখেই তিতুনির মেজাজ গরম হয়ে যায়। ঠিক কী কারণ কে জানে বড় ফুপুর সব ছেলে-মেয়ে মিলে সব সময় টোটনকে নিয়ে তিতুনির উপর চড়াও হয়। তাকে জ্বালাতন করে, টিটকারি মারে, তাকে নিয়ে হাসাহাসি করে। তা ছাড়া ঢাকায় ফুপুর সেই অ্যাপার্টমেন্টে তিতুনির দম বন্ধ হয়ে আসে, চারিদিকে বিল্ডিং আর বিল্ডিং, কোথাও এতটুকু ফাঁকা জায়গা নেই। ফুপুর ছেলে-মেয়েরা কখনো অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বের হয় না, সবার গায়ের রং ইটের নিচে চাপা পড়ে থাকা ঘাসের মতো ফর্সা, সবাই গোলগাল, নাদুসনুদুস। সবাই চব্বিশ ঘণ্টা কম্পিউটারে গেম খেলে না হয় টিভি দেখে দেখে তাই সবার চোখে চশমা।
