ফাক্কু স্যার তার চুলের ঝুঁটি ধরে তাকে টেনে মেঝে থেকে কয়েক ইঞ্চি উপরে তুলে নিয়ে বললেন, “ভুল? আর যদি ভুল হয় তাহলে তোর মাথার সব চুল ছিঁড়ে ফেলব।”
মেয়েটা কোনোমতে বলল, “আর ভুল হবে না স্যার।”
চতুর্থ মেয়েটির কাছে যাবার আগেই মেয়েটি ফ্যাসফ্যাস করে কাঁদতে শুরু করেছে। ফাক্কু স্যার তাকে কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই সে বলল, “মাফ করে দেন স্যার। মাফ করে দেন।”
“কী জন্যে মাফ করব? চুরি করেছিস নাকি কারো পকেট মেরেছিস?”
“না স্যার।” মেয়েটা ফ্যাসফ্যাস করে কাঁদতে কাঁদতে বলল, “হোম ওয়ার্ক আনি নাই স্যার।”
ফাক্কু স্যার খুবই অবাক হয়েছেন সে রকম ভান করে বললেন, “কী আশ্চর্য। হোম ওয়ার্ক আনিস নাই বলে এত কান্না!” তারপর খপ করে মেয়েটার চুল ধরে হঠাৎ করে মুখ খিঁচিয়ে বললেন, “কান্না বন্ধ করবি কি না বল। না হলে চোখ দুটো খাবলে বের করে নিব।”
ভয়ে মেয়েটার কান্না বন্ধ হয়ে গেল, শুধু হেঁচকি উঠতে লাগল। ফাক্কু স্যার চুল ধরে মাথাটা ডানে-বাঁয়ে সামনে-পিছনে এক পাক ঘুরিয়ে একটা ধাক্কা দিয়ে ছেড়ে দিলেন, আর সে একেবারে পিছনে হুমড়ি খেয়ে পড়ল। সেটা দেখে ফাক্কু স্যার খুবই তৃপ্তির একটা শব্দ করে বললেন, “আর কে যেন হোম ওয়ার্ক আনে নাই।”
একেবারে পিছনে বসে থাকা তিতুনির মতো দেখতে এলিয়েন মেয়েটি হাত তুলে বলল, “আমি স্যার।”
গলার স্বরে ভয়-ভীতি-আতঙ্ক কিছু নেই। ফাক্কু স্যর খুব অবাক হয়ে অন্য-তিতুনির দিকে তাকালেন, বললেন, “তুই হোম ওয়ার্ক আনিসনি?”
“না স্যার।” এবারেও গলার স্বর বেশ স্বাভাবিক, প্রায় হাসি-খুশি বলা যায়।
ফাক্কু স্যারের মুখটা দেখতে দেখতে কেমন যেন হিংস্র হায়েনা কিংবা বেজির মতো হয়ে গেল। দাঁতে দাঁত কষে বললেন, “কেন আনিসনি?”
অন্য-তিতুনি খুবই স্বাভাবিক গলায় বলল, “কেন আনিনি সেটার ইতিহাস খুবই জটিল। আপনাকে সেটা বললে আপনি বুঝবেন বলে মনে হয় না।”
মেয়েটার কথা শুনে ফাক্কু স্যার যত অবাক হলেন ক্লাশের মেয়েরা তার থেকে অনেক বেশি অবাক হয়ে তিতুনির দিকে তাকাল। বলে কী মেয়েটা! তার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? ফাক্কু স্যার নাক দিয়ে বড় একটা নিঃশ্বাস ফেলে ক্লাশের পিছনের দিকে এগুতে লাগলেন, মুখে বললেন, “তুই কী বললি? আমি বুঝব বলে মনে হয় না?”
অন্য-তিতুনি বলল, “না স্যার।”
“একবার বলেই দেখ আমি বুঝি কি না।”
“কোনো লাভ নাই স্যার। আমার মনে হয়–”
“কী মনে হয়?”
“অন্যদের যে রকম শাস্তি দিয়েছেন, আমাকেও দিয়ে ঝামেলা চুকিয়ে ফেলেন।”
ফাক্কু স্যার কেমন যে হাঁ হয়ে গেলেন। একবার খাবি খেয়ে বললেন, “ঝামেলা চুকিয়ে ফেলব?”
মেয়েটা মাথা নাড়ল, “জি স্যার।”
শিকার ধরার আগে বাঘ যে রকম এক পা এক পা করে গিয়ে যায় ফাক্কু স্যার ঠিক সে রকম এক পা এক পা করে তিতুনির মতো মেয়েটার দিকে এগিয়ে গিয়ে খপ করে তার চুলগুলো ধরলেন। তারপরে একটা ঝাঁকুনি দিতে গিয়ে আবিষ্কার করলেন তার ঘাড়টা লোহার মতো শক্ত, ঝাঁকুনি দিয়ে এক বিন্দু নাড়াতে পারলেন না। ফাক্কু স্যার চুলগুলো ছেড়ে দিয়ে আবার খাবলা দিয়ে আরো ভালো করে চুলগুলো শক্ত করে ধরে আরো জোরে একটা ঝাঁকুনি দেয়ার চেষ্টা করলেন কিন্তু মেয়েটার মাথাটা এক বিন্দু নাড়াতে পারলেন না, মনে হলো ঘাড়টা বুঝি কংক্রিট দিয়ে তৈরি।
ফাক্কু স্যার আরো কয়েকবার ঝাঁকুনি দেওয়ার চেষ্টা করে চুলগুলো ছেড়ে দিয়ে ক্ষিপ্ত চোখে মেয়েটার দিকে তাকালেন। মেয়েটা হাসি হাসি মুখে বলল, “আমার শাস্তি শেষ স্যার?”
ফাক্কু স্যার বললেন, “তুই তুই তুই–”
ফাক্কু স্যারের কথা শেষ হবার জন্যে মেয়েটা অপেক্ষা করতে লাগল কিন্তু ফাক্ব স্যার কথা শেষ করতে পারলেন না। মেয়েটা জিজ্ঞেস করল, “আর কিছু বলবেন স্যার?”
ফাক্কু স্যার হুংকার দিয়ে বললেন, “তোকে আজকে খুন করে ফেলব। পিটিয়ে তক্তা করে দেব। বেয়াদব মেয়ে, আমার সাথে টিটকারি?”
তারপর ফাক্কু স্যার পিটিয়ে তক্তা করার জন্যে ক্লাশের সামনে গিয়ে টেবিলের উপর থেকে স্টিলের রুলারটা হাত নিলেন, তারপর সেটা ঘুরাতে ঘুরাতে স্টিম ইঞ্জিনের মতো ক্লাশের পিছনে অন্য তিতুনির দিকে এগুতে লাগলেন।
ক্লাশের সব মেয়েরা নিঃশ্বাস বন্ধ করে এই ভয়ংকর দৃশ্যটি দেখতে লাগল। ফাক্কু স্যার রুলারটা তরবারির মতো ঘুরাতে ঘুরাতে এগিয়ে আসতে আসতে হঠাৎ করে মাঝখানে দাঁড়িয়ে গেলেন, তাকে দেখে মনে হলো কী করছেন, কোথায় যাচ্ছেন হঠাৎ করে ভুলে গেছেন। খানিকক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলেন, দেখে মনে হতে লাগল
যন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘুমিয়ে গেছেন। তারপর হঠাৎ করে যেন জেগে উঠলেন, জেগে উঠে হাতে ধরে রাখা স্টিলের রুলারটা অনিশ্চিতের মতো ঘুরাতে লাগলেন এবং এদিক-সেদিক তাকাতে লাগলেন। দেখে বোঝা যাচ্ছে ফাক্কু স্যার কী করছেন নিজেই ভালো করে জানেন না।
এক জায়গায় দাঁড়িয়ে স্টিলের রুলারটা ঘুরাতেই থাকলেন, ঘুরাতেই থাকলেন। ঘুরাতে ঘুরাতে একসময় হঠাৎ করে তার সবকিছু মনে পড়ল, তখন আবার তিতুনির মতো দেখতে এলিয়েন মেয়েটির দিকে তাকালেন আর তার চোখ দুটি ধক করে জ্বলে উঠল। হিংস্র গলায় বললেন, “তোকে আমি খুন করে ফেলব।” তারপর নাক দিয়ে ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, “তক অম খন কর ফলব।” বলেই কেমন যেন ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলেন। কী বললেন স্যার?
