“জানি।”
“ফারিয়ার নাকটা অবশ্যি আগে থেকেই একটু বোঁচা।”
“জানি।”
“তাই আমি বলছিলাম ফাক্কু স্যারের ক্লাশে গিয়ে তুমি তার মাথার মাঝে ঢুকবে। ঢুকে সে যে হোম ওয়ার্ক দিয়েছে সেটা ভুলিয়ে দেবে।”
অন্য-তিতুনি মুখটা শক্ত করে বলল, “অসম্ভব।”
“অসম্ভব?”
“হ্যাঁ। তোমাদের পৃথিবীর কোনো কিছু আমাদের পরিবর্তন করার কথা না।”
তিতুনি গরম হয়ে বলল, “এই রকম বড় বড় বোলচাল করা বন্ধ করো। আমাদের পৃথিবীতে এসেছ, পৃথিবীর নিয়ম মেনে চলো।”
“পৃথিবীর নিয়ম?”
“হ্যাঁ। পৃথিবীর নিয়ম হচ্ছে বদমানুষকে সাইজ করা। ফাক্কু স্যার হচ্ছে বদ নাম্বার ওয়ান। কাজেই তাকে সাইজ করা দরকার।”
অন্য-তিতুনি মুখটা আরো শক্ত করে বলল, “অসম্ভব।”
“তুমি করবে না? শুধুমাত্র ছোট একটা জিনিস তাকে ভুলিয়ে। দেবে না?”
তিতুনির এমন রাগ উঠল সেটা আর বলার মতো না। কিন্তু রাগ করে তো আর লাভ নেই, তাই কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “ঠিক আছে, তুমি তাহলে ফাক্কু স্যারের ক্লাশে যাও। আমি যাচ্ছি না।”
“তুমি কী করবে?”
“আমি এইখানে বসে থাকব।”
অন্য-তিতুনি রাজি হয়ে গেল, বলল, “ঠিক আছে।”
“যখন দেখবে তুমি হোম ওয়ার্ক আনো নাই তখন তোমার চুলগুলি খপ করে ধরে যখন ডেস্কের মাঝে তোমার নাকটা তেলে দিবে তখন আমার কাছে নালিশ করতে এসো না।”
অন্য-তিতুনি কোনো কথা বলল না, তিতুনি বলল, “আমি ক্লাশে সবার পিছনে বসেছি। আমার ব্যাগটা খুঁজে বের করতে পারবে তো?”
অন্য-তিতুনি মাথা নাড়ল। জানাল, সে পারবে।
.
ফাক্কু স্যারের ক্লাশটা ঠিক যেভাবে শুরু হওয়ার কথা সেইভাবে শুরু হলো। ঘণ্টা বাজার সাথে সাথে ফাক্কু স্যার ক্লাশে ঢুকলেন। হাতে চক, ডাস্টারের সাথে সাথে রেজিস্টার খাতা, বই, কলম আর একটা রুলার। যে কেউ মনে করতে পারে ক্লাশে পড়ানোর জন্যে একজন স্যার এগুলো তো আনতেই পারে, আসলে ব্যাপারটা মোটেই সে রকম না। এর সবগুলি হচ্ছে ক্লাশের মেয়েদের শাস্তি দেওয়ার অস্ত্র। আগে বেত নিয়ে ক্লাশে আসতেন, গভর্নমেন্ট বেত মারা বেআইনি করে দেবার পর প্রথম প্রথম ফাক্কু স্যারের খুব মন খারাপ ছিল, তারপর আস্তে আস্তে শাস্তি দেওয়ার এই অস্ত্রগুলো আবিষ্কার করেছেন। যেমন চক কিংবা কলম দুই আঙুলের মাঝখানে রেখে আঙুল দুটো চেপে ধরা ফাক্কু স্যারের খুবই প্রিয় শাস্তি। বই আর রেজিস্টার খাতা দিয়ে দড়াম করে মাথার মাঝে মারা তার আরেকটা প্রিয় শাস্তি। দূর থেকে কাউকে শাস্তি দিতে চাইলে ডাস্টারটা ক্রিকেট বলের মতো ছুঁড়ে মারেন। পুরানো দিনের মতো বেত মারার ইচ্ছা করলে স্টিলের রুলারটা দিয়ে হাতের মাঝে মারেন। ফাক্কু স্যারের সবচেয়ে প্রিয় শাস্তি হচ্ছে খপ করে চুলগুলো ধরে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে ডেস্কের সাথে মাথাটা ঠুকে দেওয়া। স্যারকে প্রমোশন দিয়ে ছেলেদের স্কুলে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়েছিল, স্যার রাজি হননি। তার আসল কারণ হচ্ছে ছেলেদের মাথার চুল ছোট করে ছাঁটা থাকে বলে খপ করে ধরা যায় না। মেয়েদের চুল এভাবে ধরা সোজা।
ক্লাশে ঢুকেই স্যার সবাইকে একনজর দেখে মুখে একটু লোল টানলেন, তারপর জিজ্ঞেস করলেন, “তোরা সবাই হোম ওয়ার্ক এনেছিস?”
ক্লাশের প্রায় সবাই মাথা নাড়ল, কেউ মুখে কোনো কথা বলল না। যারা হোম ওয়ার্ক আনেনি শুধু তাদের চেহারা কেমন যেন রক্তশূন্য হয়ে গেল। ফাক্কু স্যার কেমন যেন ক্ষুধার্ত বাঘের মতো সবার দিকে তাকিয়ে বললেন, “কারা কারা হোম ওয়ার্ক আনিসনি?”
পাঁচজন খুব ধীরে ধীরে হাত তুলল। তাদের চেহারা দেখে মনে হলো তাদের শরীরে এক ফোঁটা রক্ত নেই। ফাক্কু স্যার মুখে একটা হিংস্র হাসি ফুটিয়ে কাছাকাছি মেয়েটার দিকে এগিয়ে গেলেন, নাগালের মাঝে চলে আসতেই খপ করে মেয়েটার চুল ধরে ফেললেন, মেয়েটা একটা আর্তচিৎকার করল। ফাক্কু স্যার জিজ্ঞেস করলেন, “তুই কেন হোম ওয়ার্ক আনিসনি?”
“শরীর খারাপ ছিল স্যার। জ্বর আর মাথাব্যথা।”
ফাক্কু স্যার চুল ধরে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে বললেন, “মাথাটা টান দিয়ে ছিঁড়ে ফেলি? তাহলে তো আর মাথাব্যথা থাকবে না!”
মনে হলো মেয়েটা সত্যি সত্যি ভাবল ফাক্কু স্যার তার মাথাটা টেনে ছিঁড়ে ফেলবেন। সে ভয় পাওয়া গলায় বলল, “না স্যার। না স্যার! প্লিজ স্যার। প্লিজ স্যার।”
ফাক্কু স্যার বড় একটা ঝাঁকুনি দিয়ে পরের মেয়েটার দিকে এগিয়ে গেলেন। মুখে লোল টেনে বললেন, “তুই কেন হোম ওয়ার্ক করিসনি?”
“করেছি স্যার, খাতাটা আনতে ভুলে গেছি।”
ফাক্কু স্যার খপ করে মেয়েটার চুল ধরে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে বললেন, “শুধু যে হোম ওয়ার্ক আনিসনি তা না, আবার আমার সাথে মিথ্যা কথা?”
মেয়েটা প্রায় হাহাকারের মতো শব্দ করে বলল, “না স্যার, সত্যি স্যার। সত্যি হোম ওয়ার্ক করেছি স্যার।”
ফাক্কু স্যার গর্জন করে বললেন, “আবার মিথ্যা কথা?” তারপর চুলের মুঠি ধরে মেয়েটার মাথাটা প্রচণ্ড জোরে ডেস্কে মেরে বসলেন। খটাস করে এত জোরে শব্দ হলো যে মনে হলো মেয়েটার মাথাটা বুঝি দুই টুকরো হয়ে ভেতরের মগজ বের হয়ে এসেছে।
ক্লাশের সবাই নিঃশ্বাস বন্ধ করে বসে রইল আর ফাক্কু স্যার তখন তিন নম্বর মেয়েটার কাছে এগিয়ে গেলেন। এতক্ষণে এই মেয়েটি বুঝে গেছে যে শুধু শুধু কোনো একটা অজুহাত দেখিয়ে লাভ নেই, তাতে শাস্তিটা বরং আরো বেশি হতে পারে, তাই সে একেবারে সরাসরি স্যারেন্ডার করে বলল, “ভুল হয়ে গেছে স্যার। আর কখনো ভুল হবে না।”
