মাহতাব চাচা কেমন যেন বোকার মতো একটু হেসে বললেন, “কী আশ্চর্য। মনে করতে পারছি না।” তারপর তিতুনির দিকে তাকিয়ে বললেন, “কিন্তু তুই কেমন করে বুঝতে পারলি তোর বাবাকে একটা কথা বলতে চাইছি?”
তিতুনি কাঁধ ঝাঁকাল, বলল, “জানি না। কেন জানি মনে হলো।” মাহতাব চাচা কথাটা শুনে খুব অবাক হলেন বলে মনে হলো না। হেঁটে হেঁটে চলে গেলেন। তিতুনিও একটা বড় নিঃশ্বাস ফেলে স্কুলের দিকে হাঁটতে লাগল। সে সামনে তাকাল, তিতুনির মতো দেখতে এলিয়েন মেয়েটি হনহন করে স্কুলের দিকে যাচ্ছে। মেয়েটা আসলেই একজনের মাথার ভেতরে ঢুকে তার স্মৃতি মুছে ফেলতে পারে। কী আশ্চর্য। মুছতে যখন পারে তাহলে কি উল্টোটা সম্ভব? কারো মস্তিষ্কে কি স্মৃতি লিখে দিতে পারবে? এলজেবরা কিংবা বাংলা ব্যাকরণ কিংবা তেলাপোকার পাঁচক প্রণালি কি মেয়েটা তার মগজে লিখে দিতে পারবে? তাহলে তাকে আর কষ্ট করে লেখাপড়া করতে হবে না।
০৬. স্কুলে গিয়ে তিতুনি
স্কুলে গিয়ে তিতুনি ক্লাশে তার ব্যাগটা রেখে বের হয়ে এলো। সাধারণত সে সামনের দিকে বসে। কী ভেবে সে আজকে সবচেয়ে পিছনে তার স্কুলের ব্যাগ রাখল। স্কুলে এখনো সব মেয়েরা আসেনি-তিতুনি চোখের কোনা দিয়ে অন্য-তিতুনিকে খুঁজতে থাকে। তাদের দুইজনকে একসাথে কেউ দেখে ফেলবে আর তখন সেটা নিয়ে মহা কেলেঙ্কারি শুরু হয়ে যাবে, সেটা নিয়ে এখন আর তার ভেতরে কোনোরকম আতঙ্ক নাই।
তিতুনি স্কুলের বারান্দায় এসে ডানে-বাঁয়ে তাকাল তখন দেখল বারান্দার অন্য মাথা থেকে অন্য-তিতুনি হনহন করে হেঁটে আসছে। মুখটা খুবই গম্ভীর।
তিতুনি দাঁড়িয়ে রইল আর অন্য-তিতুনি কাছাকাছি এসে নিচু গলায় বলল, “সর্বনাশ হয়েছে।”
“কী সর্বনাশ?”
মেয়েটা ডানে-বামে তাকিয়ে বলল, “এখানে বলা যাবে না।”
“কোথায় বলবে?”
“লাইব্রেরিতে যাও। আমিও যাচ্ছি।”
তিতুনি মাথা নাড়ল, লাইব্রেরিটাই ভালো জায়গা। তাদের স্কুলে কীভাবে কীভাবে জানি একটা বেশ সুন্দর আর বড় লাইব্রেরি আছে, সেই লাইব্রেরিটা ফাঁকাই থাকে, পিছনে বসে নিরিবিলি কথা বলা যাবে। তিতুনি হেঁটে হেঁটে লাইব্রেরিতে গিয়ে পিছনের দিকে একটা বইয়ের আলমারির পিছনে বসে পড়ল। কী সর্বনাশ হয়েছে সেটা চিন্তা করে তার বুকটা ধুকপুক করছে।
কিছুক্ষণের মাঝেই অন্য-তিতুনি এসে তার সামনে বসে এদিক সেদিক তাকিয়ে নিচু গলায় বলল, “মাহতাব চাচার স্মৃতি মুছে দিয়েছি মনে আছে?”
“হ্যাঁ। মাহতাব চাচার কিছু মনে নাই।” তিতুনি তখনো বুঝতে পারল না ঠিক কোন ব্যাপারটা সর্বনাশ।
“মাহতাব চাচা আব্বুকে একট জিনিস বলতে চেয়েছিলেন মনে আছে?”
“হ্যাঁ।” তিতুনি মাথা নাড়ল, “মাহতাব চাচা সেটা মনে করতে পারে নাই। সেটাও ভুলে গেছে।”
তিতুনির মতো দেখতে মেয়েটা মুখ গম্ভীর করে বলল, “আমি যখন স্মৃতি মুছে দিচ্ছিলাম তখন সেটা মুছে গেছে।”
তিতুনি মাথা নাড়ল, বলল, “আমারও তাই মনে হচ্ছিল।”
“কত বড় সর্বনাশ।”
তিতুনি ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, “কোন জিনিসটা সর্বনাশ?”
“এই যে আমি অন্য একটা স্মৃতি মুছে দিলাম–”
“সর্বনাশের কী আছে? আমরা সব সময় এইটা-সেইটা ভুলে যাই। সবকিছু মনে রাখলে উপায় আছে?”
মেয়েটা কঠিন মুখ করে বলল, “তোমরা ভুলে যাও সেটা তোমাদের ব্যাপার, কিন্তু আমাদের একটা নিয়ম মানতে হয়।”
“নিয়ম?”
“হ্যাঁ। খুবই কঠিন একটা নিয়ম। আমরা যখন কোনো গ্রহে যাই সেই গ্রহটাতে যদি কোনো বুদ্ধিমান প্রাণী থাকে তাহলে সেই গ্রহের কোনো কিছু আমরা পরিবর্তন করি না। কিন্তু আমি পরিবর্তন করে ফেলেছি। যেটুকু মোছা দরকার তার থেকে বেশি মুছে ফেলেছি। আমরা যে সেই গ্রহে গিয়েছি সেটা গ্রহের একটা প্রাণীও জানতে পারে
যে আমরা এসেছি।”
“আমি যে জানলাম?”
“সেটা সাময়িক।”
“সাময়িক মানে?”
মেয়েটা বলল, “সাময়িক মানে হচ্ছে আমি যাবার সময় তোমার সব স্মৃতি মুছে দিয়ে যাব।”
তিতুনি চোখ কপালে তুলে বলল, “কী বললে?”
“কী বলেছি তুমি শুনেছ।”
তিতুনি হিংস্র চোখে বলল, “তুমি খালি চেষ্টা করে দেখো। আমি তোমাকে খুন করে ফেলব।”
তিতুনি খুন করে ফেলবে শুনেও মেয়েটা খুব ঘাবড়ে গেল মনে হলো না, বলল, “সেটা পরে দেখা যাবে। কিন্তু এখন কী করি বলো দেখি? আমি যে মাহতাব চাচার নিজস্ব কিছু স্মৃতি মুছে ফেলোম। এত বড় একটা নিয়ম ভেঙে ফেলোম–”
তিতুনি বলল, “তোমার নিয়মের খেতা পুড়ি। আমার উল্টো একটা আইডিয়া মাথায় এসেছে। ফাটাফাটি মারামারি কাটাকাটি আইডিয়া।”
“কী আইডিয়া?”অন্য-তিতুনি বলল, “আমি ইচ্ছে করলে তোমার মাথায় ঢুকে দেখতে পারি।”
তিতুনি চোখ পাকিয়ে বলল, “খবরদার, তুমি আমার মাথায় ঢুকবে। খবরদার।”
“তাহলে বলো।”
“আজকে ফার্স্ট পিরিয়ড ফাক্কু স্যারের ক্লাশ। ফাক্কু মানে হচ্ছে ফখরুল–”
“জানি।”
“ফাক্কু স্যার হোম ওয়ার্ক দিয়েছে। আজকে জমা দেওয়ার কথা।”
“জানি।”
“আমি হোম ওয়ার্ক করি নাই। করতে ভুলে গেছি, তুমি এসে সবকিছু ওলটপালট হয়ে গেছে।”
“জানি।”
“হোম ওয়ার্ক না আনলে ফাক্কু স্যার মারে।”
“জানি।”
“খপ করে চুলটা ধরে ফেলে। এমনি করে ঝাঁকুনি দেয়।” তিতুনি হাত দিয়ে দেখাল।
“গত মাসে ফারিয়ার চুল ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে বেঞ্চে মেরেছে, নাকটা বোঁচা হয়ে গেছে।”
