মেয়েটা বলল, “তোমাকে এগুলো বোঝাতে সময় লাগবে। তুমি ধরেই নিয়েছ মহাজাগতিক প্রাণীদেরও তোমাদের মতো হাত, পা, মুখ থাকতে হবে, খেতে হবে, কথা বলতে হবে। সেটা সত্যি নয়। হাত, পা, মুখ ছাড়াও প্রাণী হওয়া সম্ভব। তোমাদের সাথে মহাজাগতিক প্রাণীর শুধু একটা জায়গায় মিল আছে।”
“সেটা কী?”
“তোমরা নূতন জিনিস জানতে চাও। আমরাও চাই।”
তিতুনি মুখ শক্ত করে বলল, “সরি।”
মেয়েটা জিজ্ঞেস করল, “সরি?”
“হ্যাঁ, আমার নূতন জিনিস জানার কোনো ইচ্ছা নাই। কেন আমার এলজেবরা শিখতে হবে? বাংলা ব্যাকরণ শিখতে হবে? তেলাপোকা কীভাবে খাবার হজম করে জেনে আমার কী লাভ?”
মেয়েটা আবার হেসে ফেলল, বলল, “আমি জানি। কিন্তু তোমাদের পৃথিবীর বোকাসোকা মানুষেরা যে এ পর্যন্ত টিকে আছে তার কারণ হচ্ছে মানুষ সব সময় নূতন জিনিস জানতে চায়।”
“আমি চাই না।”
“চাও। তাই একটু পরে পরে আমার কাছে আমাদের সম্পর্কে জানতে চাইছ। আমরা কীভাবে কথা বলি। কীভাবে খাই।”
তিতুনি মুখ শক্ত করে বলল, “সেটা অন্য কথা।”
“অন্য কথা না, একই কথা।”
হঠাৎ করে তিতুনি কেমন যেন আতঙ্কে জমে গেল, বলল, “সর্বনাশ!”
“কী হয়েছে?”
“মাহতাব চাচা।”
মেয়েটা সামনে তাকাল, দেখল আব্বুর দূর সম্পর্কের ভাই মাহতাব চাচা বগলে একটা ছাতা আর হাতে একটা বাজারের ব্যাগ নিয়ে সড়ক ধরে আসছেন। তিতুনি শুকনো গলায় বলল, “এখন কী হবে?”
মেয়েটা বলল, “আমার উপর ছেড়ে দাও। আমি যা বলব তুমি ঠিক তাই করবে।”
“ঠিক আছে।”
দুজনে হেঁটে যেতে লাগল, মাহতাব চাচা আরেকটু কাছে আসার পর হঠাৎ মেয়েটা বলল, “এখন।”
“এখন কী?”
“তুমি নিচু হয়ে ভান করো তোমার জুতার ফিতে খুলে গেছে, সেটা বাঁধার চেষ্টা করো। মাথাটা নিচু করে রেখে যেন তোমার চেহারা দেখতে না পায়।”
তিতুনি মাথা নিচু করে জুতার ফিতা বাঁধার ভান করতে লাগল আর মাহতাব চাচা কাছে এসে দাঁড়ালেন। মেয়েটা বলল, “স্লামালেকুম চাচা।”
“ওয়ালাইকুম সালাম তিতুনি। স্কুলে যাচ্ছিস?”
“জি চাচা।”
“স্কুলে লেখাপড়া হয়?”
মেয়েটা তিতুনির মতো হি হি করে হাসল। বলল, “মাঝে মাঝে।”
“আজকালকার লেখাপড়ার মাথামুণ্ডু কিছু বুঝি না। তোর বাবা ভালো আছে?”
“আছে।”
“মা? টোটন?”
“আছে। সবাই ভালো আছে।”
“ঠিক আছে। স্কুলে যা।” বলে মাহতাব চাচা তাদেরকে পিছনে ফেলে হেঁটে গেলেন।
তিতুনি তখন উঠে দাঁড়াল। মেয়েটা রাজ্য জয় করার ভঙ্গি করে তিতুনিকে বলল, “দেখলে, কোনো সমস্যা হয়েছে?”
তিতুনি চাপা গলায় বলল, “মাহতাব চাচা আমার চেহারা দেখেন নাই সে জন্যে সমস্যা হয় নাই। এখানে তোমার কোনো ক্রেডিট নাই।”
“দেখলেও কোনো সমস্যা ছিল না–”মেয়েটার কথা প্রমাণ করার জন্যেই কি না কে জানে হঠাৎ করে পিছন থেকে মাহতাব চাচা ডাকলেন, “এই তিতুনি। একটু দাঁড়া!”
তিতুনি এবং তিতুনির মতো দেখতে এলিয়েন মেয়ে দুজনেই দাঁড়াল। তিতুনি চাপা গলায় জিজ্ঞেস করল, “এখন? এখন কী করব?”
মেয়েটা বলল, “কিছুই করতে হবে না।”
মাহতাব চাচা লম্বা পা ফেলে এসে তিতুনিকে বললেন, “একটা কথা বলতে ভুলে গেছি। তোর বাবাকে বলিস–”
মাহতাব চাচা হঠাৎ করে থেমে গেলেন, তিতুনির পাশে দাঁড়ানো মেয়েটি তার চোখে পড়েছে আর কেমন যেন ইলেকট্রিক শক খাওয়ার মতো তার সারা শরীর কেঁপে উঠল। আমতা আমতা করে বললেন, “এ-এ-এইটা কে?”
“কোনটা?” প্রশ্নটা খুবই বোকার মতো হয়ে গেল কিন্তু তিতুনি আর কী করবে বুঝতে পারল না।
মাহতাব চাচা তোতলাতে তোতলাতে বললেন, “দু-দু-দু দুইটা তিতুনি?”
তিতুনি মাথা নাড়ল, “জি চাচা। দুইটা।”
“দুইটা কেমন করে হয়?” মাহতাব চাচার মুখটা কেমন যেন হাঁ হয়ে গেল। মাছের মতো কেমন যেন খাবি খেলেন।
তিতুনি মাথা চুলকে বলল, “আমিও ঠিক জানি না চাচা।”
মাহতাব চাচা হঠাৎ কেমন যেন মাথা ঘুরে পড়ে যেতে গিয়ে নিজেকে সামলে নিলেন। তিতুনি খপ করে মাহতাব চাচার হাতটা ধরে ফেলল, ডাকল, “মাহতাব চাচা।”
মাহতাব চাচা কোনো উত্তর না দিয়ে কেমন যেন ঘোলা চোখে তিতুনির দিকে তাকিয়ে রইলেন। তিতুনির মতো দেখতে এলিয়েন মেয়েটি ফিসফিস করে বলল, “আমি সরে যাই। স্মৃতি মুছে দিয়েছি।”
মেয়েটি ঘুরে জোরে জোরে পা ফেলে স্কুলের দিকে যেতে শুরু করল আর মাহতাব চাচা হঠাৎ কেমন করে জানি জেগে উঠলেন, তিতুনির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “তিতুনি? স্কুলে যাচ্ছিস?” বোঝাই যাচ্ছে তার আগের কথা কিছু মনে নাই।
তিতুনি শুকনো মুখে বলল, “জি চাচা।”
“স্কুলে লেখাপড়া হয়?” তিতুনি একটু হাসার চেষ্টা করে বলল, “মাঝে মাঝে।”
মাহতাব চাচা মাথা নেড়ে বললেন, “আজকালকার লেখাপড়ার মাথামুণ্ডু কিছু বুঝি না।”
তিতুনি মাথা নাড়ল, “আমিও বুঝি না।”
“তোর বাবা ভালো আছে?” “আছে।” “মা? টোটন?” “আছে। সবাই ভালো আছে।” তিতুনি চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। মাহতাব চাচা আব্বুকে কিছু একটা বলার জন্য ফিরে এসেছিলেন, সেটা শুনে নেয়া যাক। মাহতাব চাচা অবশ্যি কিছু বললেন না, চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলেন। তিতুনি জিজ্ঞেস করল, “মাহতাব চাচা, আব্বুকে কিছু একটা বলতে হবে?”
মাহতাব চাচা মাথা নাড়লেন, “হ্যাঁ হ্যাঁ। তোর বাবাকে বলবি–”, বলে মাহতাব চাচা দাঁড়িয়ে মনে করার চেষ্টা করতে লাগলেন। খানিকক্ষণ চেষ্টা করলেন কিন্তু মনে করতে পারলেন না। মেয়েটা মাহতাব চাচার স্মৃতি থেকে ওই কথাটাও মুছে দিয়েছে।
