ঠিক তখন তিতুনির একটা অদ্ভুত দৃশ্য চোখে পড়ল। সড়কের পাশে একটা ডোবার মতো আছে, সেই ভোবার পাশে একটা বড় গাছ, গাছটা ডোবার দিকে হেলে পড়েছে। একটা বড় ডাল ডোবার মাঝামাঝি পর্যন্ত গিয়েছে, সেই ডালটা থেকে আরো ডাল এমনভাবে বের হয়েছে যে দেখে মনে হয় কেউ একজন খুব আরাম করে সেখানে হেলান দিয়ে বসতে পারবে। শুধু তা-ই না, সেখানে বসে ডালটাকে দুলিয়ে দিলে মনে হয় সেটা দোলনার মতো দুলতে থাকবে। তিতুনি যখনই সড়কের কাছে এই ডোবা আর এই গাছটার পাশে দিয়ে গেছে তখনই সে মনে মনে ভেবেছে, একদিন আমি ডালে বসে বসে দোল খাব। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনোদিনও তার এই ডালে উঠে দোল খাওয়া হয়নি। আজকে তিতুনি দেখল ডোবার ওপর হেলে পড়া গাছের ডালটাতে হেলান দিয়ে একটা মেয়ে বসে আছে, মেয়েটা তাদের স্কুলের ড্রেস পরে আছে, শুধু তা-ই না, তিতুনি যেভাবে ভেবেছিল ঠিক সেইভাবে গাছের ডালটাকে দোল দিচ্ছে।
এক মুহূর্ত পরে তিতুনি বুঝতে পারল গাছের ডালটাতে যে বসে আছে সে অন্য-তিতুনি! সে এত দিন ধরে যে কাজটা করবে বলে ঠিক করে রেখেছিল কিন্তু কোনোদিন করতে পারেনি আজকে এই মেয়েটা সেই কাজটাই করে ফেলছে। তিতুনি প্রথমে আশেপাশে তাকিয়ে দেখল কেউ তাদের দেখছে কি না, তারপর গাছটার পাশে দাঁড়িয়ে ডাকল, “এই মেয়ে।”
মেয়েটা তার দিকে না তাকিয়ে উত্তর দিল, “আমার নাম তিতুনি।”
তিতুনি হিংস্র গলায় বলল, “ঠিক আছে। এই তিতুনি।”
মেয়েটা ঘুরে তিতুনির দিকে তাকিয়ে বলল, “কী হলো?”
“তুমি এখানে কী করছ?”
“গাছে দোল খাচ্ছি।”
“কেন?”
“তার কারণ হচ্ছ তুমি। তুমি সব সময় এই গাছে উঠে দোল খেতে চেয়েছ কিন্তু খাও নাই। আমার এত সময় নাই, যা করার করে ফেলতে হবে। তাই আজকেই দোল খাচ্ছি।”
“যদি কেউ দেখে ফেলে?”
“দেখলে দেখবে।”
তিতুনি একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, “তুমি আসলে কী চাও, আমাকে বলবে?”
মেয়েটা কিছুক্ষণ গাছের ডালে বসে তিতুনির দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর গাছ থেকে নেমে আসতে শুরু করল। তিতুনি ভয়ে ভয়ে এদিক-সেদিক তাকিয়ে থাকে, তার পরিচিত কেউ যদি এখন হঠাৎ করে চলে আসে তখন কী হবে?
মেয়েটা নিচে নেমে এসে বলল, “চলো।”
“কোথায়?”
“স্কুলে।”
তিতুনি ভয় পাওয়া গলায় বলল, “স্কুলে?”
“হ্যাঁ।”
“দুইজন একসাথে?”
মেয়েটা মাথা নাড়ল, “না, ঠিক একসাথে না, একটু আগে-পরে। তাহলে ঝামেলা কম হবে।”
“ঝামেলা কম হবে?” তিতুনি গরম হয়ে বলল, “একটা ক্লাশে দুইজন তিতুনি আর সেটা ঝামেলা কম?”
মেয়েটা ভালো মানুষের মতো হাসল, বলল, “তুমি এত ভয় পাচ্ছ কেন? আমি গ্যারান্টি দিচ্ছি স্কুলের কেউ আমাদের দুইজনকে একসাথে দেখবে না। হয় তোমাকে দেখবে না হয় আমাকে দেখবে। কখনোই বুঝবে না আমরা দুইজন আলাদা মানুষ।”
“সেটা কেমন করে হবে?”
মেয়েটা বলল, “সেটা আমার উপর ছেড়ে দাও।”
“তোমার উপর ছেড়ে দিলে কী হয় সেটা আমার খুব ভালো জানা আছে। টোটন আমাদের দুইজনকে একসাথে দেখার পর কি ঝামেলা হয়েছিল মনে আছে?”
মেয়েটা বলল, “মনে আছে। আর সেটা আমার জন্যে হয় নাই, সেটা হয়েছে তোমার মাতবরির জন্যে।”
তিতুনি চোখ পাকিয়ে বলল, “আমার মাতবরি? আমি কী মাতবরি করেছিলাম?”
“পুরো একটা নাটক করলে-আমাকে ফ্যানের উপর বসে থাকতে হলো।”
“তাহলে আমার কী করা উচিত ছিল?”
“আমার উপরে ছেড়ে দেওয়া উচিত ছিল।”
“তাহলে তুমি কী করতে?”
“আমি টোটনের মাথার ভেতরে ঢুকে তার নিউরন থেকে দুইজনকে একসাথে দেখার দৃশ্যটা মুছে দিতাম।”
তিতুনি মুখ হাঁ করে বলল, “তুমি কী করতে?”
“বললাম তো, যেসব নিউরনে দৃশ্যটা আছে সেটা মুছে দিতাম। দুইজনকে একসাথে দেখার কোনো স্মৃতি থাকত না। কেস কমপ্লিট।”
তিতুনি মুখ হাঁ করে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে থেকে আবার জিজ্ঞেস করল, “তুমি কী করতে?”
মেয়েটা একটু বিরক্ত হয়ে বলল, “এক কথা কয়বার বলব?”
তিতুনি রীতিমতো কষ্ট করে তার হাঁ হয়ে থাকা মুখটা বন্ধ করে বলল, “তুমি যখন ইচ্ছা যার মাথার ভেতরে ঢুকে যা খুশি তাই করতে পারো?”
মেয়েটা কোনো কথা না বলে মাথা নাড়ল, যেন এটা এমন কোনো ব্যাপারই না। তিতুনি আবার জিজ্ঞেস করল, “কীভাবে?”
মেয়েটা কেমন যেন হতাশভাবে মাথা নাড়ল, বলল, “তুমি কেন ভুলে যাচ্ছ আমি তোমার মতো দেখতে হলেও তোমার মতো বোকাসোকা, সাদাসিধে মানুষ না। আমি অনেক দূর গ্যালাক্সি থেকে এসেছি; অনেক উন্নত, অনেক বুদ্ধিমান একটা প্রাণী-যার ক্ষমতা তুমি কিংবা তোমাদের মানুষের চৌদ্দ গুষ্টি কল্পনা করতে পারবে না।”
তিতুনি মুখ শক্ত করে বলল, “তুমি যে মহাকাশের যত বড় লাট সাহেবই হও না কেন, তুমি কিন্তু খুবই খারাপ ভাষায় কথা বলছ।”
“সেটা আমার দোষ না, সেটা তোমার দোষ। তোমার সাথে কথা বলার জন্য আমি তোমার ব্রেন ব্যবহার করছি, তুমি যেভাবে কথা বলো আমি সেভাবে কথা বলছি। এইগুলি আমার কথা না, এইগুলি তোমার কথা, তুমি নিজে ভদ্রভাবে কথা বলা প্র্যাকটিস করে তারপর আমাকে উপদেশ দিও।”
তিতুনি বকুনিটা হজম করে বলল, “তোমরা কীভাবে কথা বলো?”
“আমরা কথা বলি না।”
“কথা বলো না? একজনের সামনে আরেকজন মুখ ভোঁতা করে বসে থাকো?”
মেয়েটা ফিক করে হেসে ফেলল, বলল, “আমাদের মুখ নাই, তাই মুখ ভোঁতা করার উপায় নাই।”
“মুখ নাই?” তিতুনি রীতিমতো চিৎকার করে বলল, “তাহলে খাও কোন দিক দিয়ে?”
