এলিয়েন মেয়েটা মাথা নাড়ল, বলল, “বুঝেছি।”
তিতুনি গলার স্বরটা একটু নরম করে বলল, “তুমি আমার উপরে রাগ হওনি তো?”
“নাহ্। নিজের উপর নিজে রাগ হবে কেমন করে? তুমি আর আমি তো একই।” বলে মেয়েটা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আর সেটা দেখে তিতুনির একটু মন খারাপ হলো।
০৫. সকালবেলা হইচই-চেঁচামেচি
সকালবেলা হইচই-চেঁচামেচি শুনে তিতুনির ঘুম ভাঙল। সে ধড়মড় করে উঠে বসে এদিক-সেদিক তাকায়, মেয়েটা কোথাও নেই। তিতুনি বিছানা থেকে নেমে বাথরুমে দেখল, বিছানার নিচে এবং ফ্যানের উপরেও দেখল। সেখানেও নাই, তখন দরজার দিকে তাকাল, দরজার ছিটকিনি খোলা, তার মানে মেয়েটা ঘর থেকে বের হয়েছে। এই মেয়েটার কারণেই কী হইচই? তিতুনি কান পেতে শোনার চেষ্টা করল, দরজা খোলাসংক্রান্ত একটা বিষয় নিয়ে আম্মু চিৎকার করছেন। তিতুনি তখন সাবধানে ঘর থেকে বের হলো, বাইরের ঘরে এসে উঁকি দিল।
আম্মু চিৎকার করে বলছেন, “এই বাসায় সব দায়িত্ব আমার? দরজা খোলা রেখে সব মানুষ ঘুমিয়ে গেল? এইটা কী একটা বাসা নাকি হোটেল?”
তিতুনি পরিষ্কার করে বুঝতে পারল না দরজা খোলার সাথে হোটেলের কী সম্পর্ক। এখন সেটা নিয়ে কথা বলাটাও অবশ্যি ঠিক হবে না। দরজাটা কেন খোলা সেটাও তিতুনি বুঝতে পারল। কেউ ঘুম থেকে ওঠার আগে তিতুনির মতো দেখতে এলিয়েন মেয়েটা দরজা খুলে বের হয়ে গেছে।
আম্মু বললেন, “কেন সবকিছু আমাকে দেখতে হবে? আমি একদিন দেখলাম না আর সবাই দরজা খোলা রেখে ঘুমিয়ে গেল?”
আব্বুও ঘুম ঘুম চোখে উঠে এসেছেন, বললেন, “আমার স্পষ্ট মনে আছে দরজার ছিটকিনি লাগানো–”
আম্মু আব্বকে কথা শেষ করতে দিলেন না, বললেন, “তোমার মনে থাকলেই তো হবে না। দরজার ছিটকিনি লাগানো থাকলে সেটা খুলল কে? ভূত?”
আম্মু আরো কথা বলতে থাকলেন, তখন তিতুনি সরে এলো। হাত-মুখ ধুয়ে স্কুলের ড্রেস পরতে গিয়ে আবিষ্কার করল সেটা নাই। এলিয়েন মেয়েটি সকালবেলা তার স্কুলের পোশাক পরে বের হয়ে গেছে। কী সর্বনাশ! সে কী এখন তার স্কুলে হাজির হয়ে যাবে?
তিতুনি খুঁজে তার অন্য পোশাকটা বের করে সেটা পরল। একটু ময়লা হয়ে আছে, ধোয়া দরকার কিন্তু এখন সেটা নিয়ে দুশ্চিন্তা করার সময় নেই।
খাবার টেবিলে সবাই যখন নাশতা খেতে বসেছে তখন আম্মু হঠাৎ করে একটুখানি হাসি এবং একটুখানি অবাক মুখ করে তিতুনিকে জিজ্ঞেস করলেন, “আচ্ছা! তোর গত রাতে হয়েছিলটা কী?”
তিতুনির কী হয়েছিল সে জানে না। ভেতরে ভেতরে সে ভয়ানক চমকে উঠল। নিশ্চয়ই গত রাতে এলিয়েন তিতুনি কিছু একটা করেছে, সেটা সে জানে না। এটা যদি সবাই বুঝে ফেলে তাহলে বিপদ, আবার আম্মুর প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে-না দিলে সেটাও বিপদ। কী করবে বুঝতে না পেরে সে মুখের মাঝে খানিকটা লজ্জা খানিকটা ড্যাম কেয়ার ভাব নিয়ে বসে রইল।
টোটন ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছিল আম্মু? তিতুনি কী করেছিল?”
আম্মু একবার তিতুনির মুখের দিকে তাকালেন তারপর অন্যদের দিকে তাকালেন, বললেন, “রাত্রে হঠাৎ দেখি ঘরে আলো জ্বলছে, টুং টাং শব্দ। উঠে এসে দেখি ফ্রিজ খুলে খাবার বের করে তিতুনি খাচ্ছে।”
টোটন এমন একটা মুখের ভঙ্গি করল যেন খাওয়াটা একটা খুবই জঘন্য কাজ। মুখটা বিকৃত করে বলল, “খাচ্ছে?”
“হ্যাঁ। সে কী খাওয়া। আমি অবাক হয়ে গেলাম-তোর হয়েছিল কী? গভীর রাতে এত খিদে লেগে গেল?”
তিতুনি কোনোমতে মুখে একটা স্বাভাবিক ভাব ধরে রেখে বলল, “হ্যাঁ আম্মু, রাত্রে হঠাৎ কেন জানি খিদে লেগে গেল!”
“খিদে লেগেছে তো আমাকে ডেকে তুলে সেটা বল। খাবার গরম করে দিই। ঠাণ্ডা ভাত-তরকারি যেভাবে গপগপ করে খাওয়া শুরু করলি!”
তিতুনি কিছু বলল না। আব্বু বললেন, “গ্লোয়িং স্টেজ তো, এ রকম হয়। বাচ্চারা ধীরে ধীরে বড় হয় না-হঠাৎ হঠাৎ বড় হয়। তিতুনির নিশ্চয়ই সে রকম একটা স্টেজ যাচ্ছে–”
তিতুনি খুব সাবধানে বুক থেকে একটা নিঃশ্বাস বের করে দিল। এলিয়েন মেয়েটা রাক্ষসের মতো খেয়ে তাকে আরেকটু হলে বিপদে ফেলে দিত।
.
তিতুনির স্কুলটা বাসা থেকে বেশ দূরে, বড় সড়কটা ধরে হেঁটে হেঁটে সে স্কুলে যায়। এটা মোটেও ঢাকা শহরের মতো না, বড় সড়কটায় বাস, টেম্পো, ট্রাক কিছু নেই। একটা-দুইটা রিকশা যায়, মাঝে মাঝে একটা মোটরসাইকেল। যদি কখনো একটা গাড়ি যায় তাহলে সবাই মাথা ঘুরিয়ে দেখে কার গাড়ি কোথায় যাচ্ছে।
তিতুনি সড়কটা ধরে হেঁটে হেঁটে যাচ্ছে, একটু আগে বাসা থেকে বের হয়েছে, তাই সড়কটাতে স্কুলের ছেলে-মেয়ে বেশি নেই। একটু পরেই তাদের গার্লস স্কুলের মেয়ে আর সরকারি স্কুলের ছেলেদের দিয়ে সড়কটা ভরে যাবে। তিতুনি একটু অন্যমনস্কভাবে হাঁটছে, সে এমন একটা ঝামেলার মাঝে পড়েছে, যার থেকে বের হবার কোনো রাস্তাই খোলা নেই। ছোটখাটো ঝামেলা হলে সে তার ক্লাশের বন্ধু রিতু কিংবা মাইশা কিংবা ঝিনুর সাথে কথা বলতে পারত, একটু বুদ্ধি পরামর্শ নিতে পারত। কিন্তু এই সমস্যাটা এমনই জটিল যে কারো সাথে সেটা নিয়ে কথাও বলতে পারছে না। কাউকে বললে সে বিশ্বাসও করবে না। এলিয়েন মেয়েটি আজকে তার স্কুলের ড্রেস পরে বের হয়ে গেছে। এখন যদি স্কুলে এসে হাজির হয় তখন কী হবে? ব্যাপারটা চিন্তা করেই তার গায়ে কেমন জানি কাঁটা দিয়ে উঠল।
