টুকি মাথা নেড়ে বলল, কিন্তু আসলে আমরা সত্যিই বিজ্ঞানী নই।
খুব যেন একটা মজার কথা শুনেছে সেরকম ভান করে বিদ্রোহী দলের নেতা জিজ্ঞেস করল, তাহলে আপনারা কী?
আমরা আসলে চোর।
চোর? হা হা হা–দলপতির সাথে অন্য সবাই এবারে উচ্চস্বরে হা হা করে হাসতে শুরু করে এবং টুকি আর ঝা হঠাৎ করে খুব অস্বস্তি বোধ করতে থাকে। দলপতি এক সময় হাসি থামিয়ে বলল, আপনারা সত্যি সত্যি জীবন সম্পর্কে সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ ব্যক্তি। মিথ্যা কথাটি কেমন করে বলতে হয় তার বিন্দু বিসর্গও জানেন না। মিথ্যা কথা বলতে হয় সত্যের খুব কাছাকাছি করে। আপনাদের বলা উচিত ছিল যে আপনারা ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার কিংবা শিল্পীসাহিত্যিক। তা না বলে আপনারা বললেন চোর!
টুকি মুখ শক্ত করে বলল, আমরা সত্যিই চোর।
দলপতি তার চোখে কৌতুকের হাসি ধরে রেখে বলল, তার কোন প্রমাণ আছে?
আছে। আমরা শেষবার যেটা চুরি করেছি সেটা আমাদের কাছেই আছে।
দেখি, কী চুরি করেছেন।
টুকি তার কোমর থেকে খুলে হীরার ঝোলাটি দলপতির দিকে এগিয়ে দিল। সে ভিতরে এক নজর তাকিয়ে একটা বড় সাইজের হীরা বের করে এনে আবার উচ্চস্বরে হাসতে থাকে। অন্য সবাই যারা কাছাকাছি ছিল এবারে তারাও হাসতে শুরু করল। টুকি এবং ঝা প্রথমবারের মত পুরোপুরি বিভ্রান্ত হয়ে গেল, হীরা চুরি করার মাঝে কোন অংশটি হাসির কে জানে। দলপতি কোনমতে হাসি থামিয়ে চোখ মুছে বলল, আপনারা চুরি করার আর জিনিস পেলেন না? হীরা চুরি করলেন?
কী হয় হীরা চুরি করলে?
খুব বড় রকমের গাধামো হয়। মাটি থেকেই যখন দশ কেজি বিশ কেজি সাইজের হীরা তুলে নেওয়া যায় তখন যদি কেউ এইটুকুন হীরা দেখিয়ে বলে সে সেটা চুরি করে এনেছে তখন শুনতে কেমন লাগে?
টুকি আর ঝা কিছুই বুঝতে পারল না, খানিকটা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। দলপতি বলল, এই পুরো গ্রহটা হীরার তৈরি। এই যে আপনি মেঝের উপরে দাঁড়িয়ে আছেন সেটা হীরার, দেওয়ালটা হীরার, এই গ্রহের ছাদ হীরার, বাইরের পাহাড়টা হীরার! দুই বিলিয়ন বছর আগে এই গ্রহের কার্বন-কোর বাইরের পাথরের চাপে হীরা হয়ে গেছে। তারপর গত এক বিলিয়ন বছরে বাইরের পাথর ক্ষয়ে গিয়ে ভিতরের হীরা বের হয়ে এসেছে। এখানে কেউ হীরা চুরি করে না।
টুকি এবং ঝা নিচে তাকাল। সত্যি সত্যি তারা স্বচ্ছ কিছুর উপর দাঁড়িয়ে আছে, চারিদিকে সেই একই স্বচ্ছ দেওয়াল, স্বচ্ছ ঘরের ছাদ। চারিদিকে এত হীরা আর তারা কী না এই অল্প কয়টা হীরা চুরি করার জন্যে জীবন পণ করেছিল? টুকি এবং বার হঠাৎ নিজেদের বোকার মত মনে হতে থাকে।
দলপতি হাসি হাসি মুখে বলল, আপনারা কী এখনো দাবি করবেন যে আপনারা চোর, নাকি সত্যি কথাটি বলে দেবেন বিজ্ঞানী রিচি এবং ফ্রাউল।
টুকি একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, সত্যি কথাটাই হচ্ছে আমরা চোর।
বেশ। তাই যদি মনে করেন তাহলে তাই হোক। দলপতির চোখমুখ হঠাৎ কেমন জানি থমথমে হয়ে যায়, গম্ভীর গলায় বলে, যদি আপনারা সেই বিখ্যাত খ্যাতিমান অস্ত্রবিজ্ঞানী না হয়ে থাকেন, আপনাদেরকে আমার কোন প্রয়োজন নেই।
ঝা এক গাল হেসে বলল, তাহলে আমরা যেতে পারি?
উহুঁ। দলপতি মাথা নেড়ে বলল, আমি বলেছি আপনাদের প্রয়োজন নেই। কিন্তু আপনাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের প্রয়োজন নেই সেটা তো বলি নি। ফেডারেশানের সাথে আমাদের বার বছর থেকে যুদ্ধ চলছে। আমাদের লোকজন আহত হচ্ছে। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নষ্ট হচ্ছে—আমাদের তাজা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দরকার। আপনাদের কিডনি, লিভার, প্যাংক্ৰিয়াস, ইন্টেস্টাইন, হার্ট, লাংস, আংগুল, হাত, পা, চোখ, কান দরকার।
ঝা মুখ হা করে বলল, সবই তো দরকার। তাহলে বাকি থাকল কী?
একজন হি হি করে হেসে বলল, চুল।
টাক মাথা একজন এগিয়ে এসে বলল, আমার চুলও দরকার।
তার কথা শেষ হবার আগেই একজন মানুষ ন্যাংচাতে ন্যাংচাতে এগিয়ে এসে বলল, স্কাউটশীপ যুদ্ধে আমার ডান পাটা গেছে। আমি শুকনো মানুষটার পাটা চাই।
চোখে ব্যান্ডেজ বাঁধা একজন এগিয়ে এসে বলল, আমি একটা চোখ চাই।
বুক থেকে কিছু টিউব বের হয়ে একটা যন্ত্রের সাথে লাগানো আছে সেরকম একজন বলল, আমাকে একটা হার্ট দিলেই চলবে।
আগুনে পোড়া ঝলসে যাওয়া একজন মানুষ চেঁচিয়ে বলল, আমার দরকার চামড়া। মোটাটার চামড়া, ভাল ইলাস্টিক মনে হচ্ছে।
দেখতে দেখতে অসংখ্য কানা, খোড়া, পোড়া, কাটা, ফাটা, ঝলসানো মানুষ। টুকি এবং ঝাকে ঘিরে ফেলল। তারা সবাই টুকি এবং ঝায়ের শরীরের কিছু না কিছু চাচ্ছে।
দলপতি হাত তুলে সবাইকে থামিয়ে দিয়ে বলল, তোমাদের যা প্রয়োজন সব পাবে। অস্ত্রোপাচারকারী রবোটকে ডাক, নিয়ে যাক এক্ষুনি। কাটাকুটি করে ভাগাভাগি করে নাও, যাও।
দলপতির কথা শেষ করে উঠে দাঁড়ানোর সাথে সাথে মানুষগুলো আনন্দে চিৎকার করে উঠে টুকি এবং ঝাকে খামচা খামচি করতে থাকে। সবাই মিলে যখন দুজনকে ধরে টানাটানি করছে ঠিক তখন তারা হঠাৎ করে সত্যিকার বিপদটা টের পেল। প্রথমে টুকি নিজেকে সামলে নিয়ে গলা উঁচিয়ে বলল, আমরা আসলে বিজ্ঞানী রিচি আর ফ্রাউল। এতক্ষণ মিছে কথা বলছিলাম।
কানা খোড়া এবং ঝলসানো মানুষ তাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সরবরাহ হাতছাড়া হয়ে যাবে ভেবে টুকির কথাকে চাপা দিয়ে হৈ হুঁল্লোর করে টানাটানি করতে থাকে। টুকির সাথে গলা মিলিয়ে ঝাও তখন গলা উঁচিয়ে বলল, আমরা অস্ত্র বিজ্ঞানী। অস্ত্রবিজ্ঞানী।
