হাইপার ডাইভ দেওয়ার দুই সপ্তাহ পর রোবির যন্ত্রণায় টুকি এবং ঝায়ের জীবন যখন মোটামুটি অসহ্য হয়ে উঠল তখন হঠাৎ করে তাদের জীবনে খানিকটা উত্তেজনা দেখা দিল। ঘুম থেকে উঠে তারা আবিষ্কার করল এই নক্ষত্রপুঞ্জের সবচেয়ে হিংস্র এবং সবচেয়ে যুদ্ধবাজ বিদ্রোহী দলটি তাদের মহাকাশযানটিকে দখল করে বিচিত্র একটি গ্রহে নামিয়ে ফেলেছে।
টুকি, ঝা এবং রোবিকে মহাকাশযান থেকে নামিয়ে বিদ্রোহী দল তাদের আস্তানায় নিয়ে যেতে থাকে। যারা তাদেরকে টেনে হিচড়ে নামিয়েছে তারা সবাই খুব উগ্র প্রকৃতির মানুষ, টুকি এবং ঝাকে গলাধাক্কা দিয়ে নামিয়ে নিতে নিতে তাদের সম্পর্কে নানা ধরনের অসম্মানজনক কথা বলতে লাগল। টুকি এবং ঝা অবশ্যি বিশেষ কিছু মনে করল না, তাদের জীবনে তারা অসংখ্যবার এরকম পরিবেশে পড়েছে। রোবি অবশ্য সারাক্ষণ তাদের জ্বালাতন করতে লাগল, পিছু পিছু হাটতে হাটতে জিজ্ঞেস করল, আপনারা কী ভয় পাচ্ছেন?
টুকি মুখ শক্ত করে বলল, পেলে পেয়েছি, তাতে তোমার বাবার কী?
না, আমি শুনেছি মানুষ খুব ভয় পেলে জামা কাপড়ে নাকি পেচ্ছাব করে দেয়। আপনারা কী পেচ্ছাব করে দিয়েছেন?
ঝা দাঁত কিড়মিড় করে বলল, না, করি নি।
কেমন করে জানেন করেন নি? হয়তো নিজের অজান্তে করে দিয়েছেন। আমি শুনেছি মানুষ নিজের অজান্তে পেচ্ছাব করে দেয়। ব্লাডার বলে একটা জিনিস থাকে, কিডনি থেকে ফিল্টার হয়ে পেচ্ছাব সেখানে এসে জমা হয়, সেটাকে যেটা কন্ট্রোল করে–
চুপ কর হতভাগা–ফিউজড বাল্ব, প্যাচ কাটা স্কু–
ঝায়ের ধমক খেয়েও রোবি নিবৃত্ত হল না, ফিসফিস করে বলল, মানুষ ভয় পেলে তাদেরকে নাকি খুব বিচিত্র দেখায়। আপনাদেরকেও বিচিত্র দেখাচ্ছে। কি মনে হয় এখন আপনাদের কি গুলি করে মারবে? তাহলে ভয় পেয়ে নিশ্চয়ই কাপড়ে পেচ্ছাব করে দেবেন। আচ্ছা, পেচ্ছাব জিনিসটা কী? তার পি. এইচ. কত? স্পেসেফিক গ্র্যাভিটি? ক্যামিকেল কম্পােজিশান? রংটা কী?
পেছন থেকে রোবির পিছনে কষে একটা লাথি মারার ইচ্ছা ঝাকে অনেক কষ্ট করে সংবরণ করতে হল।
টুকি এবং ঝাকে বিদ্রোহী দলের নেতার সামনে এনে প্রায় ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে দেয়া হল। নেতা মানুষটির বয়স খুব বেশি নয়, মাথায় বড় চুল এবং লম্বা লম্বা গোঁফ, গায়ের রং ফ্যাকাশে, চোখ দুটি ঢুলু ঢুলু এবং টকটকে লাল। ঢিলেঢালা আলখাল্লার মতো একটা ক্যাটক্যাটে হলুদ রংয়ের কাপড় পরে আছে। ঢুলু ঢুলু চোখে টুকি এবং ঝাকে এক নজর দেখে বলল, এরাই তারা?
রাগী রাগী চেহারার একজন মোটা গলায় বলল, জী হুঁজুর! তারপর সে টুকি এবং ঝায়ের পিছনে গুতো দিয়ে বলল, আমাদের নেতাকে অভিবাদন কর–
টুকি শুকনো মুখে বলল, অভিবাদন কেমন করে করে?
মাটিতে মাথা ঠেকাও। বেকুব কোথাকার।
টুকি এবং ঝা মাটিতে মাথা ঠেকাতে যাচ্ছিল তখন বিদ্রোহী দলের নেতাটি গুরুগম্ভীর গলায় বলল, তুমি বেকুব কাকে বলছ? এই দুজন হচ্ছেন পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ যুদ্ধ পরিচালনাকারী অস্ত্রবিজ্ঞানী রিকি এবং ফ্রাউল।
টুকি এবং ঝা চমকে উঠলো, তারা নিচু শ্রেণীর চোর, বিজ্ঞানী রিচি-ফ্রাউল নয় কিন্তু সেটা এখন বলা ঠিক হবে কী না বোঝা যাচ্ছে না।
দলের নেতা তার লম্বা গোঁফে হাত বুলিয়ে ঢুলু ঢুলু চোখকে যেটুকু সম্ভব খুলে বলল, এই দুজন অস্ত্রবিজ্ঞানীকে গোপনে আমাদের এম সেভেন্টিওয়ান এলাকায় পাঠানো হয়েছে। আমরা তাদের ধরে ফেলেছি, এখন তাদেরকে কত দামে গ্যালাক্টিক হাই কমাণ্ডের কছে বিক্রি করতে পারব চিন্তা করে দেখেছ কেউ?
যে মানুষটি টুকি এবং ঝাকে মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে অভিবাদন করার জন্যে পীড়াপিড়ি করছিল, সে এবারে খুব কাচুমাচু হয়ে পড়ল। মাথা নিচু করে বলল, বুঝতে পারি নাই স্যার—একেবারে চোরের মত চেহারা ছবি–
চুপ কর বেয়াদপ। এক্ষুনি বিজ্ঞানী রিচি আর ফ্রাউলের পায়ে চুমু খেয়ে ক্ষমা চাও।
যারা টুকি এবং ঝাকে মহাকাশযান থেকে ধরে এনেছে তাদের অনেকেই এবার উবু হয়ে টুকি এবং ঝায়ের পায়ে চুমু খাবার চেষ্টা করতে লাগল। ঝা মোটামুটি হতবাক হয়ে ব্যাপারটা দেখছিল টুকি ততক্ষণে খানিকটা আন্দাজ করতে পেরেছে। বৃষ্টির রাতে আশ্রয় নেবার জন্যে মহাকাশযানে উঠে বুড়োমতন যে দুজন বদরাগী মানুষকে বৃষ্টির মাঝে বাইরে ফেলে এসেছিল তারাই নিশ্চয় বিজ্ঞানী রিচি আর ফ্রাউল। তারা সেই মহাকাশযানটিতে করে এসেছে বলে তাদেরকেই মনে করছে অস্ত্রবিজ্ঞানী রিচি আর ফ্রাউল। এই রকম মাথা গরম বিদ্রোহী দলকে সত্যি কথাটা তাড়াতাড়ি বলে দেওয়া ভাল। এটি গোপন রাখার চেষ্টা করেও খুব লাভ হবে বলে মনে হয় না। টুকি কেশে গলা পরিষ্কার করে বলল, এখানে একটা ভুল বোঝাবুঝি হচ্ছে। আমরা আসলে বিজ্ঞানী রিচি আর ফ্রাউল নই। আমার নাম হচ্ছে টুকি আর এ হচ্ছে ঝা।
বিদ্রোহী দলের নেতা হা হা করে হেসে উঠে বলল, আমি ঠিক এরকম একটা উত্তরের জন্যে অপেক্ষা করছিলাম মহামান্য অস্ত্রবিজ্ঞানী রিচি এবং ফ্রাউল। এর আগেরবার আমরা যখন গ্যালাক্টিক এম্বেসডরকে ধরেছিলাম তিনিও প্রথমে কিছুতেই স্বীকার করতে চাচ্ছিলেন না। শেষে আমরা যখন একটা একটা করে তার নাকের লোম ছিড়তে শুরু করলাম–
নাকের নোম?
হ্যাঁ! তখন সব স্বীকার করে ফেললেন। আপনারা অবশ্যি জ্ঞানী মানুষ, আপনাদের উপর নিচু স্তরের অত্যাচার করতে ইচ্ছে করে না। কিন্তু দরকার পড়লে আর কী করব?
