তারাপদ আর সহ্য করতে পারল না। রাগে, ক্ষোভে সে কাঁপতে লাগল। চিৎকার করে বলল, “এ সমস্তই তা হলে ধোঁকাবাজি? ব্লাফ?”
“সমস্তই।”
“আমার বাবাকে ভুজঙ্গ ভাঁওতা দিয়েছিল? আর বেচারি বাবা সেই ধোঁকাবাজিতে বিশ্বাস করে পাগল হয়ে গেল?”
“আমি তাই মনে করি। শুধু আমি কেন, আপনাদের সাধুমামা–মানে সাধনদাও তা জানে। সে এর সাক্ষী ।”
তারাপদ কেমন এক শব্দ করে উঠল। তারপর মুখ নিচু করে যেন মাথার চুল ছিঁড়তে লাগল নিজেরই। সে কেঁদে ফেলেছিল।
চন্দন চুপ। কিকিরাও চুপ। তারাপদকে সান্ত্বনা দিতেও পারছিলেন না।
কিছু পরে চন্দন চাপা গলায় বলল, “আপনি যা বললেন তা কি সবই সত্যি?”
কিকিরা বললেন, “সমস্তই সত্যিই। ঘণ্টা বাজানোই বলুন আর মোমের ছাঁচের কথাই বলুন, এর কোনোটাই আত্মা এসে করে দিয়ে যায় না। সবটাই ধোঁকা, চালাকি, হাত সাফাই । জাদুর রাজা হুডিনির নাম শুনেছেন? তিনি নিজে এইসব লোক-ঠকানো খেলা ধরে দিয়ে গেছেন। তাঁর বইয়ে যেমন-যেমন আছে, আমি ঠিক সেই-সেইভাবে ঘণ্টা বাজিয়েছি, রবারের দস্তানা থাকলে হাতের ছাঁচও গড়ে দেখিয়ে দিতাম।”
তারাপদ মুখ তুলল। তার মুখ কেমন যেন খেপার মতন দেখাচ্ছে, চোখের জলে গাল ভেজা। তারাপদ বলল, “ঠিক আছে, ভুজঙ্গকে আমি দেখছি। “
কিকিরা হাত তুলে বললেন, “না না, ওভাবে দেখা নয়। আমি বলে দেব কী ভাবে আপনারা তাকে দেখবেন। ভুজঙ্গ বড় চালাক, ভীষণ শয়তান। তা ছাড়া এটা কলকাতা নয়। এখানে ভুজঙ্গর অনেক শক্তি। তার সঙ্গে সোজাসুজি লড়া চলবে না। অন্য পথ আছে। চলুন–আপনাদের একটু এগিয়ে দিই। এগিয়ে দিতে দিতে বলব।“ কিকিরা উঠে দাঁড়ালেন।
.
বারো
সন্ধের পর পর তারাপদ ভুজঙ্গভূষণের আত্মা-নামানোর সেই রহস্যময় ঘরে এসে বসল। আজ সে একা, চন্দন নেই। চন্দন আসবে না।
দুপুরটা যে কেমন করে কেটেছে, তারাপদ নিজেই শুধু জানে, আর জানে চন্দন। উত্তেজনায় যেন ফেটে পড়েছিল মাঝে মাঝে; দুঃখে ঘৃণায় এক এক সময় সে খেপার মতন কাণ্ড করছিল। চন্দন তাকে অনেক কষ্টে সামলেছে। বলেছে, “ওরকম করিস না তারা, ভুজঙ্গর কোনো চেলা যদি একবার বুঝতে পারে আমরা ভুজঙ্গর সিক্রেট জানতে পেরেছি তা হলে তুইও গেলি, আমিও গেলাম। নিজেকে কন্ট্রোল কর। তোকে এখন অ্যাক্টিং করতে হবে, কিকিরা যেভাবে শিখিয়ে দিয়েছেন।”
চন্দন অনেক বুদ্ধিমান। তারাপদর ওই ছটফটে ভাবটাকে সে বুদ্ধি করে কাজে লাগাল। কম্বল মুড়ি দিয়ে বিছানায় শুয়ে থাকতে বলল বন্ধুকে। তারপর মৃত্যুঞ্জয়কে ডেকে পাঠাল। তারাপদকে বলল, “ভুজঙ্গর সঙ্গে আর একবার দেখা করতে চাস তুই; একলা। শেষবারের মতন তোর মা-বাবার কাছে দুটো কথা জানতে চাস। বুঝলি?”
তারাপদ সবই বুঝল। ভুজঙ্গর ওই ঘরে বসে আজ তাকে সত্যিই অনেক কিছু করতে হবে। কিকিরা বলে দিয়েছেন, বুঝিয়ে দিয়েছেন।
মৃত্যুঞ্জয় এল, চন্দনই কথা বলল বেশি, তারাপদ কেমন ভেঙে পড়েছে, কী ভীষণ কান্নাকাটি করছে–এই সব বুঝিয়ে বলল, আজ আর-একবার সে ভুজঙ্গভূষণের সঙ্গে দেখা করতে চায়।
তারাপদ প্রায় কিছুই বলল না, বড় বড় নিশ্বাস ফেলতে লাগল। তার চোখমুখ দেখে মৃত্যুঞ্জয় কী ভাবল কে জানে, ভুজঙ্গভূষণকে তারাপদর কথা বলতে গেল। খানিকটা পরেই আবার ফিরে এল, বলল, “হ্যাঁদেখা হবে।”
সেই দেখা করতেই তারাপদ এখন সন্ধেবেলায় ভুজঙ্গভূষণের রহস্যময় ঘরে এসে বসেছে। একলা।
তারাপদ চুপচাপ বসেই থাকল। আজ ক’দিন আসা-যাওয়া করতে করতে এই ঘর তারাপদর চেনা হয়ে গেছে। অভ্যেসও হয়ে এসেছে অনেকটা। আগের মতন অতটা গা-ছমছম করে না। তবু এই ঘরের একটা ভৌতিক পরিবেশ রয়েছে, মন যেন অন্যরকম হয়ে যায়, বুকের মধ্যে শিরশিরে ভাব হয়।
তারাপদ এপাশ ওপাশ তাকাতে লাগল। এত অস্পষ্ট, প্রায়-ঘুটঘুঁটে ঘরে কোনো কিছুই ভাল করে দেখা যায় না। এই ঘর যেমন ছিল সেই রকমই রয়েছে। সেই একই মিটমিটে আলো, সেই ধূপধুনোর গন্ধ, সেই ভুজঙ্গভূষণের সিংহাসন, সেই বেড়াল ।
ছোট টেবিলের ওপর বসানো কালো বেড়ালটাকে দেখল তারাপদ। এই বেড়াল তাদের খুব অবাক করেছিল, ভয়ও পাইয়ে দিয়েছিল। আজ তারাপদ কালো বেড়ালটাকে দেখল। তার ভয় হল না। কেনই বা হবে? এটাও তো চালাকি, কিংবা মানুষকে বোকা বানিয়ে দেবার ফন্দি। চন্দন কিকিরাকে জিজ্ঞেস করেছিল, কেমন করে বেড়ালটা ঘুরে যায়?
কিকিরা হেসে হেসে বলেছিলেন, ঘড়ির কাঁটা যেভাবে ঘোরে। ঘড়িতে দুটো কাঁটা থাকে, ছোট কাঁটা আর বড় কাঁটা, যদি একটা থাকত কী হত? একটাই ঘুরত। খুব পুরনো আমলের বড় বড় দেওয়াল-ঘড়ি কিংবা দেরাজের ওপর রাখা ঘড়ি দেখেছেন স্যার? এক একটা ঘড়ি থাকত যার মধ্যে ঘণ্টার কাঁটার ওপর ছোট্ট রঙিন পাখি বসানো থাকত মেটালের। ঘণ্টার সঙ্গে সঙ্গে সেটাও ঘুরত। এটাও সেই রকম, তফাতের মধ্যে কী জানেন, ঘড়ির যন্ত্রপাতিগুলো নিচে আছে, আর ওপরে–কাঁটার বদলে একটা ফুঁকো বেড়াল, পেপার পাল্পের কিংবা হালকা কিছুর। ঠিক যেভাবে গ্রামোফোনের রেকর্ড ঘোরে–সেইভাবে বেড়ালটা ঘুরছে, তবে খুব ধীরে ধীরে–বোঝা যায় না। যদি একটা ওয়াল-ক্লক মাটিতে শুইয়ে রাখেন চিত করে তার কাঁটাও এইভাবে ঘুরবে।
তারাপদ কালো বেড়ালটার দিক থেকে চোখ সরিয়ে নেবার আগেই স্তোত্রপাঠ শুরু হল। যেমন রোজই হয়–সেইরকম। দামি লাউডস্পিকারটা যে কোথায়, বোঝা যায় না, কিন্তু বড় নিখুঁত। এই নিঃশব্দ ঘরে চমৎকার শোনায়, মন ধীরে ধীরে কেমন যেন হয়ে যায়।
