তারাপদদের অপেক্ষা করতে বলে লোকটি চলে গেল। দুই বন্ধু দাঁড়িয়ে থাকল চুপ করে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চারপাশ দেখতে লাগল। এক সময় নিশ্চয় বিস্তর পয়সা ছিল বাড়ির মালিকের, সাজিয়ে গুছিয়ে বাড়ি করেছিল, এখনো তার প্রমাণ চোখে পড়ে। মাথার ওপর শেকল দিয়ে ঝোলানো সাদা শেড় পরানো বড় বাতি জ্বলছে, আলোর রঙ বাদামী; এই ঢাকা জায়গা–অনেকটা যেন লবির মতন, দু পাশেই বড় বড় সেটি পাতা রয়েছে বসার জন্যে, এক কোণে হ্যাট স্ট্যান্ড, আয়না, দেওয়ালে গোটা দুয়েক বিশাল বিশাল ছবি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলের, একটা চমৎকার হরিণের মাথা।
সমস্ত বাড়ি কিন্তু কী চুপচাপ। দোতলা থেকে পাতলা স্বর ভেসে আসছিল সামান্য।
লোকটি ফিরে এল। এসে বলল, “আসুন আপনারা।”
খুবই আশ্চর্য, ডান বা বাঁ দিকের মুখোমুখি দুটো বাইরের ঘরের কোনোটাতেই ওদের নিয়ে গিয়ে বসাল না লোকটি। একটু ভেতর দিকের একটা ঘরে নিয়ে গিয়ে বসাল। তারাপদদের আর-একবার ভাল করে দেখে চলে গেল। .
সেকেলে কাঠের গদি-আঁটা চেয়ারে বসল তারাপদরা। এই ঘরটা সামান্য ছোট। ঘরের বারোআনা শুধু বইয়ে ভরতি। মোটা মোটা বই। বোধ হয় আইনের বই। একদিকে দেওয়ালে-গাঁথা সিন্দুক। লোহার একটা আলমারি অন্যদিকে। জানলা বরাবর বোধহয় দত্ত-মশাইয়ের বসার জায়গা, সিংহাসনের মতন চেয়ার, সামনে সেক্রেটারিয়েট টেবিল।
এই ঘরের গন্ধই যেন কেমন আলাদা। বইপত্রের জন্যেই বোধ হয় ধুলোধুলো গন্ধ লাগে নাকে। পায়ের তলায় জুট কার্পেট। দেওয়ালের দু-এক জায়গায় ছোপ লেগেছে। ঘরে মস্ত বড় একটা পোর্ট্রেট ঝোলানো, কোনো বৃদ্ধের, দত্ত-মশাইয়ের বাবা কিংবা ঠাকুরদার। এক দিকে নিচু টেবিলের ওপর একটা বেড়াল। জ্যান্ত নয়, মরা। কেমন করে তৈরি করেছে কে জানে! একেবারে জ্যান্ত বলে মনে হয়। গায়ের লোেম, চোখের মণি, কান, পায়ের থাবা সব যেন জীবন্ত। বেড়ালের গায়ের রঙ কুচকুচে কালো। চোখে খুব যে ভাল লাগে তা কিন্তু নয়।
তারাপদ আর চন্দন নিচু গলায় কথা বলছিল, পায়ের শব্দ শুনে চুপ করে গেল।
ছিপছিপে চেহারার এক ভদ্রলোক ঘরে এলেন। টকটকে গায়ের রঙ, মাথায় বেশ লম্বা, পরিষ্কার করে কামানো মুখ, মাথার চুল একেবারে সাদা ধবধবে, পরনে ধুতি, গায়ে পুরো হাতা পশমী গেঞ্জির ওপর দামি শাল। চোখে চশমা।
তারাপদরা উঠে দাঁড়াল। দাঁড়িয়ে জড়সড়ভাবে নমস্কার করত হাত তুলে।
ভদ্রলোক প্রতিনমস্কার করলেন। চশমার আড়াল থেকে দুজনকে লক্ষ করতে করতে নিজের জায়গায় গিয়ে বসলেন শেষে ।
চন্দন ইশারায় তারাপদকে চিঠিটা বের করতে বলল।
তারাপদ চিঠি বের করল।
চিঠি বের করে তারাপদ দু পা এগিয়ে সেক্রেটারিয়েট টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। “আজ সকালে আমি এই চিঠিটা পেয়েছি । আপনিই কি আমায় দেখা করতে বলেছিলেন?”
ভদ্রলোক চিঠির জন্যে হাত বাড়ালেন। দেখলেন। বললেন, “হ্যাঁ, আমারই নাম মৃণালকান্তি দত্ত। বসুন আপনি।”
তারাপদ আবার দু পা পিছিয়ে এসে চন্দনের পাশে বসল।
মৃণাল দত্ত কিছুক্ষণ সরাসরি তারাপদদের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। তারপর হঠাৎ বললেন, “আপনার নামই তারাপদ?”
তারাপদ একটু কেমন ধাঁধায় পড়ে গেল। এ আবার কেমন প্রশ্ন? সামান্য যেন রাগই হল। ভাবল, বলে–আজ্ঞে আমি তো তাই জানি।…
কিন্তু মৃণাল দত্তের সামনে দাঁড়িয়ে সে-কথা বলতে তার সাহস হল না। ভদ্রলোকের চেহারায় শুধু ব্যক্তিত্বই নেই, দেখলেই বোঝা যায়, অসম্ভব সাবধানী, চালাক এবং বুদ্ধিমান উনি।
তারাপদ নিজের নাম বলল, আবার, পদবী সমেত। বটুকবাবুর মেসের ঠিকানাও।
“আপনার পিতার নাম?”
তারাপদ তার বাবার নাম বলল। তাতেও রেহাই নেই, মার নামও বলতে হল। বাবার নাম, মার নামের পর তাদের পৈতৃক দেশবাড়ি ভিটেমাটির কথাও।
তারাপদ বলল, “আমি এ-সব চোখে দেখিনি। ছেলেবেলায় একবার দেশের বাড়িতে গিয়েছিলাম, তখন আমার চার-পাঁচ বছর বয়েস, আমার কিচ্ছু মনে নেই। শুধু একটা তেঁতুল গাছের কথা মনে আছে, খুব বড় তেঁতুল গাছ, গাছটায় নাকি ভূত থাকত…..” তারাপদ একটু হাসল।
এমন সময় বাহারি ট্রের ওপর সুন্দর কাপে করে চা আনল সেই বুড়ো লোকটি। তারাপদদের দিল।
মৃণাল দত্ত বললেন, “চা খাও–”, বলেই তাঁর কী খেয়াল হল, সামান্য হালকা গলায় বললেন, “তোমাদের তুমি বলছি, কিছু মনে করো না, বয়েস তোমাদের অনেক কম।”
চা পেয়ে তারাপদরা বেঁচে গেল । একে এই বিশ্রী অবস্থা, তার ওপর শীত, হাত-পা রীতিমত ঠাণ্ডা হয়ে আসার জোগাড়।
“ওই ছেলেটি তোমার বন্ধু?” মৃণাল দত্ত চন্দনকে দেখিয়ে তারাপদকে জিজ্ঞেস করলেন।
“আমার পুরনো বন্ধু । ওর নাম চন্দন। ডাক্তারি পাশ করেছে সবে।”
মৃণাল দত্ত চন্দনকে দু চারটে কথা জিজ্ঞেস করলেন, পুরো নাম কী চন্দনের, কোথায় থাকে, বাড়ি কোথায়, বাবা কী করেন, কোথায় থাকেন–এই সব ।
শেষে মৃণাল দত্ত তারাপদর দিকে তাকিয়ে বললেন, “তোমায় এবার কটা কথা জিজ্ঞেস করব। ঠিকঠিক জবাব দিও। তোমার বন্ধু এখন এখানে থাকতে পারে–পরে তাকে একটু উঠে যেতে হবে।”
তারাপদ একবার চন্দনের মুখের দিকে তাকাল। তারপর মৃণালবাবুর দিকে চোখ ফিরিয়ে বলল, “চাঁদু আমার পুরনো বন্ধু। ওর কাছে আমার কিছু গোপন করার নেই। ও আমার সবই জানে।”
