কিকিরা জগন্নাথের হাত ধরে চাপ দিলেন। অর্থাৎ বোঝাতে চাইলেন-”ভয়। পেয়োনা, কথা বলো।
“জগন্নাথ না? কথা বলছ না কেন?” শুদ্ধানন্দর গলা। গম্ভীর।
“আজ্ঞে হ্যাঁ, আমি জগন্নাথ।“
“অতুল দত্তর ছেলে?”
“হ্যাঁ।”
“মায়ের নাম সুরমা দত্ত।”
“আজ্ঞে।”
“এতদিন আসোনি কেন?” জগন্নাথ জবাব দিল না।
“তোমার মা যে কতবার আমার ষঃ চেতনায় এসে দেখা করে গেলেন! মায়ের জন্যে তোমার কষ্ট হয় না?”
“খুব হয়।”
“তা হলে আসোনি কেন?”
জগন্নাথ কথা বলল না।
“তোমার মা এই নশ্বর জগৎ ছেড়ে চলে গেছেন। তাঁর কায়া-শরীর আর নেই। কিন্তু উনি তো মা জননী। আমরা মা বলি কাকে? যিনি আমাদের জন্ম দেন তিনিই শুধু মা নন, যিনি মায়া, মমতা, প্রাণ দিয়ে আমাদের লালন করেন, পালন করেন, আমাদের দুঃখে-বিপদে ঘিরে রাখেন, তিনিই মা। মায়ের বড় কেউ নেই জগন্নাথ। সংসারে মা ভিন্ন আর কেউ উপাস্য নন।” শুদ্ধানন্দ একটু থামলেন। তাঁর গলার স্বরটি ভরাট গম্ভীর শোনাচ্ছিল। ক’ মুহূর্ত পরে বললেন, “তুমি তোমার মাকে ভুলে গেছ, তিনি তো ভোলেননি।”
“মাকে আমি ভুলিনি,” জগন্নাথ বলল।
“তা হলে তুমি আছিলে না কেন?”
“আজ্ঞে, আমার নানান দুশ্চিন্তা, তার ওপর ঠিক বুঝতে পারছিলাম না–মায়ের সঙ্গে আপনার…”
শুদ্ধানন্দ হেসে উঠলেন। জোরে। হাসিটা গা ছমছমে।
“তোমার মাকে যদি এখানে দেখতে পাও, তাঁর গলা শুনতে পাও–কেমন লাগবে জগন্নাথ?”
জগন্নাথের গলা কাঠ, দম বন্ধ হয়ে আসছে। বিহ্বল। ভয়ে কাঁপছিল।
কিকিরা জগন্নাথের হাঁটুর কাছটায় খোঁচা মারলেন। নিশ্বাসের সুরে বললেন, “বলো, হ্যাঁ দেখতে চাই।”
জগন্নাথ চুপ।
“দেখতে চাও না? শুদ্ধানন্দ বললেন, “মায়ের সূক্ষ্ম আত্মার রূপটি তুমি দেখতে চাও না? তাঁর গলা আর শুনতে চাও না?”
জগন্নাথ যেন হঠাৎ কেঁদে ফেলল, “চাই।”
“বেশ। আমি তোমায় দেখাব। তবে আত্মা রক্তমাংসের বস্তু নয়, তার স্পষ্ট। অবয়ব নেই। ছায়ার চেয়েও সূক্ষ্ম, অ-স্পর্শ যোগ্য। তুমি শুধু মাকে দেখবে। তাঁর কথাও শুনবে। মানুষ আর আত্মালোকের মধ্যে যে যোজন ব্যবধান, তাতে আত্মার আসা-যাওয়ার বড় কষ্ট হয়। সব সময় তাঁরা আসেন না। তুমি তাঁকে ধ্যান করো–তাঁর কথা একমনে ভাবো।” বলে শুদ্ধানন্দ মন্ত্রপাঠ শুরু করে দিলেন। ফ্রি হোঃ হ, ভূত প্রেত ইমা ক্রোং যং যে,ভূতাঃ ভবি..”
শুদ্ধানন্দর মন্ত্রপাঠের মাঝামাঝি সময় থেকে ঘর ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে এল। যে ফিকে বেগুনি রঙের বাতিটা তফাতে জ্বলছিল সেই বাতি নিভে গেল ধীরে ধীরে। ঘরের ধোঁয়া আরও বুঝি ঘন হল।
কিছুক্ষণ পরে শুদ্ধানন্দ নীরব। ঘরে কোনো শব্দ নেই। অদ্ভুত স্তব্ধতা। হঠাৎ দেখা গেল, সরু, খুব সরু কিছু একটা অন্ধকারের মধ্যে শুদ্ধানন্দের সামনে দিয়ে ছুটে গেল। একবার, দুবার, তিনবার। ঘড়ির কাঁটার মতন সরু লম্বা এই জিনিসটা বার-তিনেক ছুটে যাবার পর শেষে এক জায়গায় গিয়ে স্থির হল। পরে মিলিয়ে গেল। শুদ্ধানন্দর গলা শোনা গেল।
“আপনি কি এসেছেন?”
শব্দ হল খটখট।
“আপনার অনেক কষ্ট। মার্জনা করবেন।…আপনি আপনার ছেলে জগন্নাথকে কিছু বলতে চেয়েছিলেন। সে এসেছে। আপনি কি তাকে দয়া করে দেখা দেবেন একবার?”
প্রথমে কোনো শব্দ নেই। তারপর খটখট শব্দ হল।
শুদ্ধানন্দ বললেন, “জগন্নাথ, তোমার মা এসেছেন। দেখা দেবেন। মাত্র কয়েক মুহূর্তই তুমি তাঁকে দেখবে। দূর থেকে। তাঁর কথা শুনবে। তোমার মাকে ডাকো, তাঁকে প্রণাম জানাও।”
ধীরে-ধীরে কখন–কিকিরার বসার জায়গার একেবারে ডান পাশে ঘড়ির কাঁটার মতন সরু একটু আলো যেখানে গিয়ে থেমে গিয়েছিল সেখানে অতি ক্ষীণ আলো যেন দেখা গেল। ক্রমশ একটি মুখের আদল ভেসে উঠতে লাগল। অতি অস্পষ্ট। সাদাটে। পুরো শরীর নয়, বুক পর্যন্ত দেখা যাচ্ছিল।
কিকিরা সবই লক্ষ করছিলেন। তাঁর অনুমান মোটামুটি ঠিক। শুদ্ধানন্দর বসার উঁচু জায়গাটির হাত ছয়-সাত তফাতে বাক্স ধরনের একটা কী রয়েছে। লম্বাভাবে দাঁড় করানো। হয়ত কাঠের ওয়ার্ডরোব। বোধ হয় পেছন দিকে কিছু নেই, শুধু মাথার দিক, পায়ের দিক, দু’পাশে তক্তা আছে। সামনের দিকে কালো মিহি প্রদা। পরদার পেছনে সাদা এক মুখ। কালের আড়ালে মুখটি সাদা নয় খানিকটা সাদাটে দেখাচ্ছে।
শুদ্ধানন্দ বললেন, “জগন্নাথ, তোমার মা এসেছেন।”
জগন্নাথ ফুঁপিয়ে উঠল।
“কথা বলো! ওঁকে যেমন দেখছ, এইভাবেই তাঁকে দেখবে। সূক্ষ্ম আত্মার পক্ষে কায়ারূপ ধারণ সম্ভব নয়। কথা বলো?”
জগন্নাথ ফোঁপাতে-ফোঁপাতে বলল, “মা!”
সঙ্গে-সঙ্গে কোনো সাড়া নেই। সামান্য পরে ভাঙা অস্পষ্ট গলায় সাড়া এল।“জগু! কেমন আছ তুমি?”
“মা, আমরা বড় কষ্টে আছি।”
“বোন ভাল আছে?”
“আছে। তোমার জন্যে আমরা…”
“দুঃখ কোরো না, বাবা! মানুষের আয়ু! কে বলতে পারে কার কখন..”
“মা?”
“আমি এখানে বেশিক্ষণ থাকতে পারব না। বড় কষ্ট হচ্ছে। …শোনো, বাড়িতে একটা চাবি আছে। লোহার সেফের চাবি। আর একটা ছেঁড়া কাগজ। এই দুটো নিয়ে তুমি মথুরবাবুর সঙ্গে দেখা করবে। তোমার বাবা যা রেখে গেছেন–বোনের বিয়ে দিতে পারবে রাজকন্যের মতন। তোমারও থাকবে বাবা…”
“কোথায় আছে মা চাবি?”
“ঘরেই আছে।”
মাকে আর দেখতে পেল না জগন্নাথ। আবার সেই ঘুটঘুটে অন্ধকার। কিছুই চোখে পড়ে না।
শুদ্ধানন্দর গলা শোনা গেল।“তোমার মা চলে গিয়েছেন জগন্নাথ!”
