সেই একই ঘর। কিকিরার শুধু মনে হল, আগের দিনের সঙ্গে আজ একটিমাত্র তফাত যেন রয়েছে। শুদ্ধানন্দ যেখানে বসেন, তাঁর সেই তন্ত্রমন্ত্রের আসনে–সেই মঞ্চমতন জায়গার ডান পাশে, ঘরের একেবারে কোণ ঘেঁষে একটা কিছু আছে। কাঠের খোপ মতন। কী আছে বোঝা যাচ্ছে না, তবে মনে হয় পাতলা কোনও পরদা ঝোলানো আছে। অন্ধকারে এতটা দূর থেকে কেমন করেই বা আর বেশি ঠাওর করা যায়!
আগের দিনের মতনই একফোঁটা লাল আলো জ্বলছিল একপাশে। জ্বলতে জ্বলতে নিভেও গেল, আবার জ্বলল, আবার নিভল। তারপর সেই পুজোর ঘণ্টা বাজতে লাগল। লাল আলোটা জ্বলল। শেষে শুদ্ধানন্দ দেখা দিলেন। অবিকল আগের মতনই, মন্ত্র আওড়াতে আওড়াতে–তে ভূতাঃ যে ভূতাঃ ভুবি সংস্থিতাঃ থেকে শুরু করে হ্রীং ক্রোং যং রং লং হৌং হঃ সঃ.ক্লীং রিং হিং পর্যন্ত টানা মন্ত্র।
বসলেন শুদ্ধানন্দ নিজের আসনে। দু পাশের ধুনোর পাত্রে কী যেন ছুঁড়ে দিলেন, দপ করে আগুনের শিখা জ্বলে উঠল। নিভে এল সামান্য পরে। লাল বাতিও আর জ্বলছিল না, তার বদলে অনেকটা তফাতে, আড়ালে রাখা ফিকে বেগুনি আলো, যা প্রায় কালো ছায়া ছড়িয়ে রেখেছে, আশেপাশে জ্বলতে লাগল।
শুদ্ধানন্দ আরও খানিকটা পরে কথা বললেন, “বিভুপদ?”
কিকিরা হাত জোড় করে বসে, ভয়-ভক্তি মেশানো গলায় বললেন, “মহারাজ!”
শুদ্ধানন্দ সামান্য অপেক্ষা করে বললেন, “পুরোপুরি হল না, বিভূপদ। তোমায় আগেই বলেছিলাম, তোমার বাবার আত্মা যে স্তরে আছেন, সেখান থেকে তাঁকে দু’-চারদিনের চেষ্টায় টেনে আনা মুশকিল।”
“হল না?” কিকিরা চশমাটা পালটে নিলেন সাবধানে।
“তুমি দুঃখ কোরো না।…প্রেতসিদ্ধ কখনও ব্যর্থ হয় না। একাদশ তন্ত্রসাধনায় আমার সিদ্ধি, আমি তোমায় একেবারে হতাশ করব না।”
“সিদ্ধমহারাজ আপনিই আমার একমাত্র ভরসা।”
শুদ্ধানন্দ হাসলেন। প্রায় অট্টহাসি। বললেন, “তোমার ভাইরা উইল জাল করেছে। যে জাল করেছে তার বাম দেহাংশে বড় তিল আছে, হাঁটার সময় তার শরীর একপাশে ঝুঁকে যায়, দক্ষিণ নৈঋত দিকে বাস,…তার বাম শয়ন, ক্ষুধা ভয়ঙ্কর।
কিকিরা অদ্ভুত এক শব্দ করে যেন ফুঁপিয়ে উঠলেন। মহারাজ, আমার মেজোভাই, মায়াপদ। …হাঁ মহারাজ তার অনেক তিল আছে গায়ে, সে বেঁকে-বেঁকে হাঁটে। বাঁ দিকে কাত হয়ে শোয়, রাক্ষসের মতন তার খাওয়া-দাওয়া।”
“খুবই শঠ, চতুর…”
“ঠিকই মহারাজ।”
“তার জন্যে তোমায় ভাবতে হবে না। দুষ্কর্মের প্রতিফল তাকে পেতে হবে। কিন্তু বিভুপদ, আসল উইল কোথায় লুকনো আছে সেটা জানতে হলে যে সময় লাগবে। তোমার পিতৃদেবের সঙ্গে সাক্ষাৎ না-হওয়া পর্যন্ত…”
“আমি রাজি মহারাজ। দু-দশদিন দেরি হোক, আমার ক্ষতি নেই। আমি আমার কাজ সেরে আবার ফিরে আসব কলকাতায়।”
“খুবই ভাল হয়। এর মধ্যে তোমার জন্যে আমি একটি কবচ করে রাখব। সেকবচের কথা কেউ জানে না, হিঙ্গুলহরিতি কবচ।”
“আপনি যা আজ্ঞা করবেন।”
“ব্যয় একটু বেশি হবে বিভুপদ, আঠারোশো থেকে দু হাজারের মতন।”
“আপনি চিন্তা করবেন না।”
“ঠিক আছে। এক পক্ষ সময় লাগবে।”
“ক্ষতি কিসের মহারাজ!…আপনার জন্য আজ আমি একটা মোস্ত্র এনেছিলাম।”
“মোহর!…আচ্ছা! তুমি যেখানে বসে আছ, তার নিচে রেখে দাও।”
“আপনি নেবেন না?”
“নেব।” শুদ্ধানন্দ একটু হাসলেন, “এখন আমি পবিত্ৰাচারে রয়েছি। সাধনাসনে বসে আছি। আমায় কেউ স্পর্শ করতে পারবে না। কাছে আসাও বারণ।”
“আমি কি তবে যাব?…মোহর রেখে যাই।”
“এসো।”
দু মুহূর্ত পরে কিকিরা বললেন, “যদি অপরাধ না নেন তো একটা কথা বলি?”
“বলো।”
“একটি ছেলেকে দেখলাম। অপেক্ষা করছে।”
“হ্যাঁ, ওর আসার কথা।”
“কিন্তু মহারাজ, ছেলেটি বোধ হয় মৃগী রোগী।”
“মৃগী রোগী!”
“আমার কেমন সন্দেহ হল। ওর চোখ-মুখ কেমন যেন দেখাচ্ছিল। ঠোঁটের পাশে ফেনা-ফেনা ভাব।”
“বলো কী বিভুপদ!”
“আজ্ঞে, ও কেন এসেছে আমি জানি না, কিন্তু ওকে যেমন দেখলাম–এখানে এসে বসলে তো মূর্ছা যাবে।”
শুদ্ধানন্দ কেমন চুপ করে গেলেন।
কিকিরা বললেন, “ওকে বরং আপনি ফেরত পাঠিয়ে দিন আজ। এখানে এসে বসে একটা কিছু যদি হয় আপনি কী করবেন?”
চুপ করে থেকে শুদ্ধানন্দ বললেন, “তাই তো বিভুপদ! ফেরত পাঠালে আবার কবে আসবে …ওর আবার জরুরি দরকার।”
“আপনি যদি আজ্ঞা করেন আমি একটা কাজ করতে পারি।”
“কী?”
“আমি যদি ওকে সঙ্গে নিয়ে আসি! ওর পাশে থাকি। তাতে একটু সাহস পাবে। তা ছাড়া মৃগীদের আমি সামলাতে পারি। আমার পরিবারের ওই রোগটি আছে।”
শুদ্ধানন্দ কিছু ভাবলেন। বললেন, “বেশ, নিয়ে এসো।
কিকিরা বললেন, “আজ্ঞে, তাতে কোনো অসুবিধে যদি হয়…”
“না, অসুবিধে কিসের! সাবধানের মার নেই।”
কিকিরা উঠলেন।
.
জগন্নাথকে সঙ্গে নিয়ে কিকিরা এসে নিজেদের জায়গায় বসার সময় দেখা গেল, শুদ্ধানন্দ মন্ত্র আওড়াচ্ছেন।
মন্ত্র আওড়ানোর পর্বটা দীর্ঘ হল না এই যা রক্ষে।
ক’ মুহূর্ত পরে শুদ্ধানন্দ বললেন, “কে? জগন্নাথ এসেছে?”
জগন্নাথ ঘরের চেহারা আর ভুতুড়ে অন্ধকার দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছিল। সাড়া দিতে পারল না।
শুদ্ধানন্দর মাথার পেছন দিকে ত্রিশুলের মাথায় গাঁথা মরা কাকের চারপাশে সেই জোনাকির মতন আলো জ্বলল, নিভল। তারপর ওই আলোয় বিন্দুই অন্যদিকের ত্রিশুলের ওপর রাখা মাথার খুলির চোখের কোটরে জ্বলে উঠল বার কয়েক। নিভে গেল।
