তারাপদ বলল, “তা কেন ভাবছেন?”
“ভাবছি এই জন্যে যে, বিশু সাধুবাবার কথায় ভুলে না হয় কুঠিবাড়িতে গেল, কিন্তু সেই সময় অমূল্যর শালা চরণ তার লোক নিয়ে সেখানে হাজির থাকবে কেন? কেন চরণরা গিয়েছিল? কে তাদের নিয়ে গিয়েছিল?”
চন্দন কান চুলকোতে-চুলকোতে বলল, “আপনি কি বলতে চান, ওই সাধুবাবাই বিশুকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে নিয়ে গিয়ে অমূল্যর শালার হাতে তুলে দিয়েছিল?”
মাথা নাড়লেন কিকিরা।”না, অতটা বলতে পারছি না। তা যদি হত, তবে বিশুকে চরণদের হাতে তুলে দিয়ে সাধুবাবু পালাত। কিন্তু তা তো হয়নি। উলখে সাধুবাবার সঙ্গে চরণদের কথা-কাটাকাটি হয়েছে। সাধুবাবাকে গুলি করা হয়েছে।”
“গুলি খেয়ে সাধুবাবা পালিয়েছে, তারাপদ বলল, “ম্যাজিক দেখিয়ে উধাও।”
কিকিরা বললেন, “গুলি খেয়েছে কি না, তা বলতে পারব না; তবে বিশুর মুখে আমি যা শুনেছি, তাতে বুঝতে পারলাম, চরণদের সঙ্গে সাধুবাবার কথা কাটাকাটি আর ঝগড়া থেকে বিশু বুঝতে পারছিল, চরণরা সাধুবাবার কাছে কিছু জানতে চাইছিল; সাধুবাবা বলছিল না।”
“সেই রাগেই কি বন্দুক চালায় চরণরা?”
“তাই তো মনে হয়।”
সামান্য চুপচাপ থেকে তারাপদ চন্দনকে বলল, “আমার মাথায় কিছু ঢুকছে না, চাঁদু। সাধুবাবাও একটা মিষ্ট্রি। বিশুকে কেনই বা ডেকে নিয়ে যাবে, আর কেনই বা উধাও হয়ে যাবে। লোকটার কোনো ট্রেসই আর পাওয়া গেল না।”
কিকিরা বললেন, “আমার কাছে এখন দুটো প্রশ্নই আসল।”
“প্রশ্ন দুটো কী?” চন্দন বলল।
“ওই সাধুবাবা লোকটি কে? কেন সে হঠাৎ এসে হাজির হয়েছিল এখানে। মজার ব্যাপার কী জানো, সাধুবাবা এখানে আসার সময় থেকেই ওই কুঠিবাড়ি নিয়ে গণ্ডগোল কেন?”
“আর আপনার দ্বিতীয় প্রশ্ন?”
“দ্বিতীয় প্রশ্ন, কী জন্যে সাধুবাবা বিশুকে নিয়ে কুঠিবাড়িতে গিয়েছিল। কেন বলেছিল বিশুকে যে, কুঠিবাড়িতে গেলে তার ভাল হবে। আর কেনই বা চরণ সাধুবাবার সঙ্গে ঝগড়া চেঁচামেচি করছিল? কী জানতে চাইছিল? কেন তারা সাধুবাবার পিছু ধরেছিল?”
তারাপদ বলল, “আপনি বলতে চাইছেন, সাধুবাবাই সব গণ্ডগোলের মূল?”
“নিশ্চয়।”
চন্দন বলল, “সাধুবাবার হাওয়া হয়ে যাবার ব্যাপারটা..?”।
“ওটা স্রেফ চালাকি! এক ধরনের ম্যাজিক। সেই ঘর, জানলা, সিঁড়ি তোমায় দেখাব। দেখলেই বুঝতে পারবে। আমিও ওখান থেকে ভ্যানিশ হতে পারি। ওটা কিছু নয়। তবে হ্যাঁ, কুঠিবাড়ির একটা ঘরে “ডবল উইনডো’ আছে এটা সাধুবাবা কেমন করে জানল? আর কেনই বা সে ওই ঘরটাই বেছে নিয়েছিল, নিয়ে বিশুকে নিয়ে গিয়েছিল?” বলে একটু থেমে আবার বললেন কিকিরা, “প্রথমে আমার মনে হয়েছিল, ম্যাজিকে যেরকম ভ্যানিশিং ট্রিক দেখানো হয়–এখানেও তাই হয়েছে। জানলাটা দেখার পর বুঝতে পারছি–ওটা একটু অন্যরকম। সাধুবাবা সব জেনেই ঘর বেছেছিল। মানে জানলার ব্যাপারটা সে জানত।”
চন্দন আর তারাপদ পরস্পরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল।
চন্দন বলল, “তারা বলছিল, ওই ঘরে কেউ একজন এখন থাকে।”
“থাকার চিহ্ন দেখেছি। লোক দেখিনি। হয়ত কেউ একজন ঘরে থাকত, পাহারা দিত। খুব সম্ভব সাধুবাবারই আস্তানায় ছিল ওটা। কিন্তু কেন? ওই ঘরে কী আছে?”
কেউ কোনো কথা বলল না।
অনেকক্ষণ পরে চন্দন বলল, “সাধুবাবাকে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না?”
কিকিরা বললেন, “চেষ্টা করছি। লোক লাগিয়েছি।” বলে তারাপদর দিকে তাকালেন। বললেন, “তোমায় একটা কথা বলা হয়নি, তারাপদ। লোচন আজ বিকেলে বলছিল, যে শশিপদকে আবার তার গ্রামে দেখা গিয়েছে।”
“শশিপদ কে?” চন্দন জিজ্ঞেস করল।
“সাপের ওঝা, কিকিরা যেন কেমন করে হাসলেন, “ওই ওঝাটিকে ধরতে হবে হে। নকুলকে আমি বলেছি। …নাও, ওঠো রাত হল। আর নয়।”
.
০৯.
পরের দিন সন্ধের মুখে লোচন এসে কানে-কানে কথা বলার মতন করে কিছু বলল কিকিরাকে। কিকিরা তারাপদদের সঙ্গে কথাবার্তা বলছিলেন। খানিকটা আগে চন্দন আর তারাপদকে নিয়ে ঘোড়া-সাহেবের কুঠি ঘুরে এসেছেন। ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন খানিকটা। লোচনের কথায় ব্যর্থ হয়ে বললেন, “কই, কোথায়? তাকে নিয়ে এসো।”
লোচন মাথা নেড়ে বলল, “ইখানে আসবেক নাই, বাবু। খেপাকে নকুল ধরে রেখেছে।”
কিকিরা বললেন, “বেশ, চলো৷” বলে তারাপদর দিকে তাকালেন, “তোমার শশিপদ। চলো, দেখে আসবে চলো।”
বাড়ির বাইরে ঠাকুর-দালানের পেছন দিকে একটা ঘরে নকুল শশিপদকে ধরে বেঁধে বসিয়ে রেখেছে। ঘরে আলো নেই। চারদিকে গাছপালা, ডোবা; মস্ত একটা তেঁতুল গাছ সামনে।
কিকিরা আসতেই নকুল দরজার কাছ থেকে সরে দাঁড়াল।
”পেলে কোথায়, নকুল?” কিকিরা জিজ্ঞেস করলেন।
“কাছকেই ছিল। সাহানা ঠাকুরের বাড়ির কাছে খেপা ঘুরঘুর করছিল।” কিকিরা ঘরের মধ্যে তাকালেন। অন্ধকার। ঘুপচি ঘর। বাইরে চাঁদের আলোয় চারদিক ভেসে যাচ্ছে। কাল কোজাগরী পূর্ণিমা।
কিকিরা বললেন, “অন্ধকারে তো ঠাওর করতে পারছি না। বাইরে আনো হে, নকুল। শশি-ওঝাকে দেখি।”
“আজ্ঞা, যদি ছুট দেয়?”
“দেবে না। তুমি আছ না?” বলে কিকিরা শশিপদকে বাইরে ডাকলেন।
শশিপদ বাইরে এল। বাইরে এসে দেখল সবাইকে। তারাপদকেও। তারপর হাত জোড় করে নমস্কার করল।
কিকিরা চাঁদের আলোয় যতটা পারেন খুঁটিয়ে দেখলেন শশিপদকে। তারপর বললেন, “দাওয়ায় দু-দণ্ড বসা যাক, শশিপদ; কী বলো?”
