ভবানীকেও দেখল তারাপদ। সাধারণ চেহারা। তবে চালাক-চতুর বলেই মনে হয়। চন্দন বিশুকে দেখছিল। ফকিরকে বলল, “এখানে দেখা হবে না। আপনি ওকে নিয়ে পাশের ঘরে চলুন।” বলেই একটু থেমে হঠাৎ বলল, “আচ্ছা, ওকে কি কোনো ঘুমের ওষুধ খাওয়ানো হয়?”
“হ্যাঁ। ডাক্তারবাবু যা দিয়েছে, তাই খায়।”
“কবার খায়?”
“দু-তিন বার বোধহয়।”
“এতবার?…আশ্চর্য! চলুন–পাশের ঘরে যাই।”
চন্দন উঠল।
ফকির বিশুকে নিয়ে পাশের ঘরে চলে গেলেন।
কিকিরা ভবানীর সঙ্গে কথা বলতে লাগলেন। তারাপদ একটা সিগারেট ধরাল। ধরিয়ে বিশুর কথা ভাবতে লাগল।
হঠাৎ কিকিরার একটা কথা কানে গেল। কিকিরা ভবানীকে বলছেন “তুমি এখন এখানেই থাকবে কিছুদিন, না ফিরবে?”
ভবানী বলল, “কালীপুজো পর্যন্ত থাকব।”
তারাপদ অন্যমনস্কভাবে ভবানীর দিকে তাকাল। কেন তাকাল সে, বুঝতে পারল না। চোখের দিকে তাকাল। কটা চোখ। জোড়া ভুরু। তারাপদর কেমন অস্বস্তি হচ্ছিল।
ভবানী উঠে দাঁড়াল।”আমি যাই, মামা। বড়মামুর দেরি হবে।”
“যাবে? এসো!”
ভবানী চলে গেল।
তারাপদ দরজার দিকে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ। তারপর উঠে নিঃশব্দে দরজার কাছে গেল। মুখ বাড়িয়ে দেখল বাইরেটা।
ফিরে এসে নিচু গলায় বলল, “কিকিরা, ভবানী বাইরে দাঁড়িয়ে আছে।”
কিকিরা বললেন, “তুমি বোসো।”
ফকির আর বিশু আরও খানিকটা পরে এ-ঘরে এল। চন্দনও পেছনে-পেছনে।. ফকির অবশ্য আর বসলেন না, বললেন, “কিঙ্কর, আমরা যাই। সকালে দেখা হবে। …ভাল কথা, কাল একবার অমূল্যদের বাড়ি যাব। খুড়িমাকে প্রণাম করে আসা হয়নি বিজয়ার পর। যাব তো, কিন্তু…তুমি কী বলো?”
কিকিরা একটু ভেবে বললেন, “নিশ্চয় যাবে। একশো বার যাবে। আমি বলি কি, তুমিও একদিন অমূল্যকে কোনো ছুতোয় এ-বাড়িতে ডেকে আনো।”
“ওকে ডেকে আনব? কেন?”
“সে না হয় পরে বলব। ভেবে দেখো ডাকতে পারবে কি না? এখন। যাও–ছেলেটাকে আর দাঁড় করিয়ে রেখো না।”
“আচ্ছা, চলি।” ফকির তিনজনের দিকে তাকিয়ে ম্লান হাসলেন। তারপর ছেলেকে নিয়ে চলে গেলেন।
সামান্য চুপচাপ। চন্দন চেয়ার টেনে নিয়ে বসল।
কিকিরা বললেন, “বিশুকে কেমন দেখলে, চন্দন?”
চন্দন তারাপদর কাছ থেকে সিগারেট চেয়ে নিয়ে ধরাল, বলল, “আপা। যেমন বলেছিলেন, তেমন তো মনে হল না।”।
কিকিরা আর তারাপদ দুজনেই যেন অবাক হয়ে চন্দনের দিকে তাকালেন।
চন্দন নিজের থেকেই বলল, “আমার মনে হল, এমনিতে ওর কোনো অসুখ নেই। তবে খানিকটা নাভার্স হয়ে রয়েছে। আর-একটা জিনিস দেখলাম, ওকে ঘুমের ওষুধ একটু বেশিই খাওয়ানো হয়েছে। দেখলেন না, কেমন ঝিমোনো ভাব!”
কী ভেবে কিকিরা বললেন, “শরীর-মনের কোনো ক্ষতি হয়েছে?”
“না। তা আমার মনে হল না।”
“সেরে যাবে?”
“না-সারার কী আছে, কিকিরা? একটা আচমকা শক হয়ত পেয়েছে। কিন্তু সেটা মানুষ নিজের থেকেই ধীরে-ধীরে সামলে নেয়। বিশু, পাগলও হয়নি, উন্মাদও নয়। ভাববার মতন কিছু দেখলাম না। বরং বলতে পারেন, ওকে নিজের থেকে ধাক্কাটা সামলাতে না দিয়ে গাদাগুচ্ছের ওষুধ খাইয়ে আর চারপাশ থেকে বেঁধে রেখে “সিক করে দেওয়া হয়েছে।”
কিকিরা যেন খুশি হলেন। বললেন, “তুমি যা বলছ, তা যেন সত্যি হয়।”
চন্দন ঠাট্টা করে বলল, “আমি ঘোড়ার ডাক্তার নই, কিকিরা স্যার।”
তারাপদ জোরে হেসে উঠল।
কিকিরাও পালটা ঠাট্টা করে বললেন, “অবোলা জীবের ডাক্তারি করা আরও কঠিন হে স্যান্ডেলউড়। পেটে ব্যথা হলেও সে বলতে পারবে না, মাথা ধরলেও নয়। বুঝলে?”
আরও দু চারটে হাসি-তামাশার কথা হল। তারপর কিকিরা বললেন, “এবার কাজের কথা হোক, কী বলো তারাপদ?”
মাথা নাড়ল তারাপদ।
একটু চুপচাপ বসে থেকে কিকিরা বললেন, “চন্দন, তুমি তো মোটামুটি সবই শুনেছ। ঘোড়া-সাহেবের কুঠিটাই যা তোমার দেখা হয়নি। তা সেটাও কাল-পরশু দেখিয়ে আনব। এখন কাজের কথা শুরু করি।”
চন্দন আর তারাপদ তাকিয়ে থাকল। কিকিরার দিকে।
কিকিরা বললেন, “আমি অনেক ভেবেচিন্তে দেখেছি, ঘোড়া-সাহেবের কুঠি নিয়ে যে ঝাট বেধেছে, সেটা নেহাত ওই বাড়িটা নিয়ে নয়। তোমরা বলবে, কেন–বাড়ি নিয়ে নয় কেন? তার জবাবে আমি তারাপদর কথাটাই বলব, বাড়ি নিয়ে ঝঞ্ঝাট হলে সেটা আইন-আদালত করে ফয়সালা হতে পারত। তা কেন হচ্ছে না? কেন অমূল্য আর ফকির দু’জনেই ওই বাড়ির ওপর ঝুঁকে পড়েছে? ঠিক কি না বলো? তা ছাড়া, ঘোড়া-সাহেবের কুঠি এতকাল পড়ে থাকল–কেউ তা নিয়ে মাথা ঘামাল না, হঠাৎ আজ মাস-দুই ধরে দু-তরফের টনক ওঠার কারণ কী?”
চন্দন বলল, “ফকিরবাবু আপনাকে কী বলছেন?”
“কিছুই তো বলছে না। ওর কথাবার্তা থেকে বরং মনে হয়, বিশুকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে কুঠিতে নিয়ে গিয়ে অমূল্যরা একটা ভয়ঙ্কর কিছু করবার মতলব এঁটেছিল। পারেনি। এখন ফকিরের রোখ চেপে গিয়েছে।”
তারাপদ বলল, “ভয়ঙ্কর কী করত, কিকিরা?”
“লুকিয়ে রাখতে পারত, গুম করত, মেরে ফেলতেও পারত।”
“কেন? নিজের ভাইপোকে কেউ মেরে ফেলে?”
“টাকা-পয়সা-সম্পত্তির লোভে খুন-খারাপি তো হয়েই থাকে।”
চন্দন বলল, “তা ঠিক। কথায় বলে, অর্থই অনর্থের মূল। রাজবাড়ির সেই কেস না, কিকিরা? কিন্তু আমি ভাবছি, বিশু একজন অচেনা সাধুবাবার কথায় বিশ্বাস করে তার পেছন-পেছন কুঠিবাড়িতে গেল কেন?”
কিকিরা হাতের আঙুল মটকাতে-মটকাতে বললেন, “তুমি ঠিকই ভাবছ। নেহাত কৌতূহলের জন্যে যেতে পারে, কিংবা ভয়ে। আমি ভাবছি এ-ছাড়া অন্য কোনো কারণ থাকতে পারে কি না?”
