খেলার দ্বিতীয় দিনে ভারতের ইনিংস আর মাত্র দশ রান তুলেই ২৪১ রানে শেষ হয়ে গেল। তার আগে টেস্ট ক্রিকেটে ব্রাইটের দুশো উইকেট পূর্ণ হয়। এটা তার ৪৬—তম ম্যাচ। অস্ট্রেলিয়ার ৩২ রানে কাপুর এল বি ডব্লু করল রজার্সকে। বোলানকে অসাধারণ আউট সুইঙ্গারে ক্যাচ তোলাল উইকেটের পিছনে। গুপ্তা প্রথম স্লিপের সামনে ঝাঁপিয়ে ধরল। দুয়া আর ফরজন্দ একটি করে এবং দ্বিতীয় স্পেলে কাপুর আবার অস্ট্রেলিয়াকে ধাক্কা দিল। শর্ট ফাইন লেগে আরউইনের ক্যাচ তার বলে ধরল উসমানি। মাত্র ১৭ বলের ব্যবধানে কাপুর এক রান ব্যয় করে তিনজনকে এক ঝটকায় সরিয়ে দিয়েছে। অস্ট্রেলিয়া পাঁচ উইকেটে ৮৮। ভারত প্রত্যাঘাত করেছে। গতকাল ভারতেরও ঠিক এই অবস্থা হয়েছিল।
ইডেনে ৮০—৯০ হাজার লোক উদ্দীপ্ত হয়ে এবার গলা খুলেছে। বিশাল গামলার মতো স্টেডিয়ামে সেই আওয়াজ সহ্য করে মাথা ঠিক রাখা অত্যন্ত কঠিন ব্যাপার। অবশিষ্ট একমাত্র স্বীকৃত ব্যাটসম্যান মিন্টার কিন্তু সেই কঠিন কাজটা মাথা ঠিক রেখে করে যেতে লাগল। তাকে সাহায্য দিল লটন। দিনের শেষ ওভারে ধারাদ্ধারের বলে লটন এল বি ডবলু হল ৫৪ রান করে। সিরিজে এটা তার দ্বিতীয় পঞ্চাশ।
ভার্দে তার সীমিত বোলিং পুঁজি নিয়ে লটনকে বেঁধে ফেলায় ব্যর্থ হল। দু’ঘণ্টায় সে ৮৭ রান জুড়ে দিল ষষ্ঠ উইকেটে। ম্যাচ এখানেই ঘুরে গেল। মিন্টার ক্রিজে ৫৫ রান নিয়ে রয়ে গেল ধৈর্যের প্রতীক হয়ে। দ্বিতীয় দিনের শেষে অস্ট্রেলিয়ার ছয় উইকেটে ১৭৯ রান। যুদ্ধরেখা এখন পরিষ্কারভাবে টানা হয়ে গেছে।
তৃতীয় দিনে ভারতের বিপর্যয় নেমে এল। স্পিনাররা বল করতে লাগল উদ্ভাবনীক্ষমতা ও কল্পনাশক্তি ড্রেসিং রুমে রেখে এসে। গা—ছাড়া ফিল্ডিং। ম্যাচটা ক্রমশ ভারতের মুঠো থেকে বেরিয়ে যেতে লাগল।
দুটি উইকেট ২১৩ রানের মাথায় হারালেও মিন্টার টেস্ট ম্যাচে তার দশম সেঞ্চুরিটি সংগ্রহ করল। প্রায় পাঁচশো মিনিট ব্যাট করে শেষ পর্যন্ত অপরাজিত রয়ে গেল ১৭০ রানে। আর ব্রাইট তার প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে সর্বোচ্চচ ৬৮ রান করে গেল। নবম উইকেটে সে আর মিন্টার ১৬১ রান তুলল। ২১৩—৮ যখন, ব্রাইট ক্রিজে আসে। ভারত তখনই অস্ট্রেলিয়ার ইনিংস শেষ করার সুযোগ পেয়েছিল। কিন্তু ব্রাইটের ব্যাটিংক্ষমতা বা মানসিক কাঠিন্যকে হিসেবে রাখেনি। বিস্ময়করভাবে পুনরুদ্ধার করা অস্ট্রেলিয়ার ইনিংস ৩৮১ রানে শেষ হল। কাপুর ৯১ রান দিয়ে চারটি উইকেট পেল ৩৫ ওভার বল করে। ধারাদ্ধার ৮০ রানে তিনটি।
১৪, ২৯, ২৯, ৩৩,—ভারতের প্রথম চারজন দ্বিতীয় ইনিংসের এই রানের মাথায় ফিরে এল। ধ্বংসটা শুরু করেছে অ্যামরোজ। তিনজন নিছক গতিতেই বোল্ড হয়েছে। পিল্লাইয়ের এলোপাথাড়ি ব্যাট থেকে ২০ রান এসেছে। পুষ্করনা ম্যাচে দ্বিতীয়বার শূন্য করে ‘চশমা’ পরল। তৃতীয় দিনের শেষে ভারতের অবস্থা চার উইকেটে ৩৬। ম্যাচ এবং সিরিজও অস্ট্রেলিয়া গুটিয়ে ফেলেছে, এখন তা বলা যায়। তারা ১০৪ রানে এগিয়ে পুরো দ্বিতীয় ইনিংস হাতে নিয়ে। ভারতের সম্বল শুধু ছয়টি উইকেট।
প্রতিটি কাগজেই এই ধারণাটাই ম্যাচ রিপোর্টে বলা হল, খেলা চতুর্থ দিনেই শেষ হবে, যদি না ভূমিকম্প হয়, গঙ্গায় বান এসে চৌরঙ্গি পর্যন্ত ভাসিয়ে দেয়, কিংবা আমেরিকা বা রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষায় কোনও হিসেবের ভুলে একটা যদি পথ হারিয়ে ইডেনে চলে আসে!
।। এগারো ।।
তনিমার জ্বর—জ্বর মতো হয়েছে। ম্যাচের বিরতি—দিনে অনন্ত বাড়ি থেকে বেরোল না। দুপুর গড়াতেই সে বাইরের চাতালে এসে বেতের চেয়ারে বসে একটা টুলে পা তুলে দিয়ে ‘মহাস্থবির জাতক’ উপন্যাসটা পড়ায় মগ্ন হয়ে গেছল। পারিপার্শ্বিক সম্পর্কে হুঁশ ছিল না।
একসময় ফুলি এসে টুলে উঠে তার পায়ে মাথা ঘষতে শুরু করায়, সে বার দুই ”উঁ উঁ, কী হচ্ছে, সুড়সুড়ি লাগছে, এখন আদর করতে পারব না….যাও, ডিস্টার্ব কোরো না।” বলল, তারপর বই বন্ধ করে ফুলিকে কোলে তুলে নেবার জন্য হাত বাড়িয়ে সামনে ঝুঁকেই সে স্তম্ভিত হয়ে গেল। বন্ধ গেটের সামনেই একটা সাইকেল রিকশায় বসে ভ্রমরা!
তাড়াতাড়ি উঠতে গিয়ে পা লেগে টুলটা এবং ফুলি পড়ে গেল। সে দৌড়ে গেল গেটের দিকে।
”আপনি যে কত বিখ্যাত লোক আজ তার প্রমাণ পেলাম। সেই দমদম রোডে যেই বলেছি অনন্ত সেনের বাড়িটা…অমনি সাত—আটজন বলে উঠল, এই তো এই তো সোজা গিয়ে মিষ্টির দোকানের বাঁ দিকে, তারপর টিউবওয়েলের ডান দিকে, তারপর দুটো মোড়, শিবমন্দির ঘুরে…উফফ। আচ্ছা, কতদূর পর্যন্ত আপনি বিখ্যাত?”
”দমদম ইস্টিশনে যে—কোনও রিকশাওয়ালাকে ওঁর নাম বলবেন, আপনাকে ওঁর বাড়ি পৌঁছে দেবে।” মাঝবয়সী রিকশাওয়ালার গলায় প্রচ্ছন্ন গর্ব ফুটে উঠল।
”ভেতরে আসুন।” বিস্ময় ভেদ করে কোনওক্রমে অনন্তর মুখ থেকে দুটি শব্দ বেরোল।
”টেস্ট—ম্যাচ চলছে, এখন বাড়িতে থাকবেন কি থাকবেন না, এই ভাবতে ভাবতে আসছিলাম। …কী অবস্থা হয়েছে বলুন তো ইন্ডিয়া টিমের।”
”হ্যাঁ, কেমন যেন একটা গর্তের মধ্যে পড়ে গেছে।”
চাতাল পেরিয়ে বাড়ির মধ্যে তারা ঢুকল। দালানে অরুণ সেনের ছবিটায় চোখ পড়তেই ভ্রমরা দাঁড়িয়ে গেল।
”আমার বাবা।”
