দিল্লি এবং কানপুরে হারার পর ঘনিয়ে এল সেই সময়। হায়দরাবাদ আর জামশেদপুরের খেলার ফল বোর্ডকে সাহসী করে তুলল। দেশজুড়ে সাধারণ লোকের ধিক্কার আর খবরের কাগজের সমালোচনা ক্রমশ ছড়িয়ে গিয়ে বোর্ডকেই চাপের মধ্যে ফেলল, এখনই একটা ব্যবস্থা নেবার জন্য। এই চাপটাই বোর্ড—প্রেসিডেন্ট চাইছিলেন।
কলকাতায় তৃতীয় টেস্ট—ম্যাচের দিন সকালে ড্রেসিং—রুমে অধিনায়ক মকরন্দ ভার্দেকে চিঠি দিয়ে জানানো হল, বোর্ডের কার্যকরী সমিতি বিশেষ সভায় সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ভারতীয় দলের কোনও সদস্যই খবরের কাগজে এই সিরিজ চলাকালে লিখতে পারবে না।
চিঠি পড়েই ভার্দে রাগে ফেটে পড়েছিল। ইন্টারন্যাশনাল ফিচার্সের সঙ্গে তার চুক্তি, প্রতিদিনের খেলা সম্পর্কে লেখার জন্য পাঁচ হাজার টাকা পাবে। একটা টেস্ট—ম্যাচে পঁচিশ হাজার টাকা। এত টাকা তাকে ছাড়তে হবে?
”খেলার পর প্রেস—কনফারেন্সে কি আমাকে ক্রিকেটে অজ্ঞ, নির্বোধ জার্নালিস্টদের প্রশ্নের জবাব দিতে হবে এবার থেকে? আমি এক হাজার কথা বলে একটা সূক্ষ্ম ব্যাপার ব্যাখ্যা করে বলব, আর ওরা সেটা দশ লাইন লিখবে, কেউ—কেউ তাও লিখবে না, কেউ—কেউ উলটো জিনিসই লিখে বসবে। পঞ্চাশটা কাগজে ভুল জিনিস বেরনোর থেকে, দেশের সাত—আটটা কাগজে আমার কলাম বেরোলে তাতে আরও বেশি কাজের কাজ হবে। বোলান যেসব কথাবার্তা বলে আম্পায়ারদের উপর, ইন্ডিয়ান বোর্ডের উপর প্রেসার তৈরি করছে, মাঠে যেভাবে আজেবাজে অ্যাপিল করছে, দাবি জানিয়ে তেড়ে যাচ্ছে আম্পায়ারদের দিকে, এসব কথা তো দেশের লোককে জানাতে হবে। ওদের মিথ্যের মুখোশ খুলে না দিলে প্রেসার তো আমাদের উপরই পড়বে।”
কথাগুলো সে বলেছিল কয়েকজন সাংবাদিকের সামনে। তারাও ঘসঘস করে সব টুকে নেয়। তাদেরই একজন ভার্দের কথাগুলো বোর্ড—সচিব হরিহরণের কাছে তুলতেই তিনি বললেন, ”কথাগুলো তো ভালই। কিন্তু দেখুন, টেস্ট—ম্যাচের মতো উচ্চ পর্যায়ের ক্রিকেটে যারা পৌঁছেছে তারা কেউই ছেলেমানুষ নয়, প্রত্যেকেই পরিণত বোধবুদ্ধিসম্পন্ন। খবরের কাগজে লেখা পড়েই তারা প্রভাবিত হয় না। কিন্তু এসব কথা ছাড়াও বলছি, ন্যাশনাল প্রেস ভার্দের বক্তব্য যদি বাদছাদ দেয়ও বা মূল পয়েন্ট বুঝতে না পারে, তা হলে সে লিখিত বিবৃতি দিক। সি এ বি বলেছে, আমরা স্টেনোগ্রাফার দিচ্ছি, ভার্দে ডিকটেশন দিক। সেটা টাইপ করে, জেরক্স করে সাংবাদিকদের মধ্যে বিলি করে দেওয়া হবে। সারা দেশকে জানাতে মাত্র কয়েকটা কাগজে কলাম লেখার থেকে, এটাই কি ভাল পন্থা নয়? তা ছাড়া অধিনায়ক হয়ে সে কি নিজের খেলোয়াড়দের যথার্থ সমালোচনা করতে পারবে? যদি করে তা হলে সেটা অনৈতিক হবে, আর তাতে টিমের মধ্যে ক্ষোভও তৈরি হবে। যদি না করে তা হলে লেখার কী দরকার?”
ভার্দে বলল, বোর্ডের নির্দেশ তার পক্ষে মানা সম্ভব নয়।
দলের চারজন ক্রিকেটার চারটি কাগজের সঙ্গে মৌখিক চুক্তি করেছে। প্রতিদিনের খেলার উপর তারা বলবে, কেননা তারা লিখতে পারে না। সেটাই তাদের নামে বেরোবে। এ জন্য প্রতিদিন খেলোয়াড়দের জনপ্রিয়তা অনুযায়ী পাঁচশো থেকে দু’হাজার টাকা তারা পাবে। এরাও ভার্দেকে সমর্থন জানিয়ে খবরের কাগজে মন্তব্য করল। একটা থমথমে আবহাওয়া খেলার আগে ভারতীয় ড্রেসিং—রুমে তৈরি হয়ে গেল। তার মধ্য থেকে বেরিয়ে মাঠে গিয়ে টস করল ভার্দে এবং বোলানকে হারিয়ে ব্যাটিং—সিদ্ধান্ত নিল।
প্রথম বলেই মাঠের ৮৫ হাজার দর্শক চমকে গেলেন। লটনের বিরাট আউট সুইঙ্গারে হেলাফেলা করে গ্লান্স করতে গিয়ে পিল্লাই উইকেটকিপারকে ক্যাচ দিয়ে ফিরে এল। তারপর ভার্দে, উসমানি, নবরকেও লটন আর ব্রাইট ফেরত পাঠাল। লাঞ্চে চার উইকেটে ৪৫। তারপর ৬৩—৬। কাপুর এসে শত্রু—শিবিরে ঠেলে নিয়ে গেল যুদ্ধটা। ব্রাইটের দুই ওভারে সে ২৪ রান নিল। ৮৫ বলে সে ৪৪ করল, আটটা চার মেরে। গুপ্তা করল ৬৯, বেঙ্গটরঙ্গন ৪৯। দিনের শেষে ভারতের আট উইকেটে ২৩১।
খেলা ভাঙার প্রায় এক ঘণ্টা পর জীবনের গাড়িতে অনন্ত ফিরছিল। খেলা নিয়ে তাদের মধ্যে কথাবার্তা হতে—হতে জীবন বলল, ”তোকে দ্বিতীয় টেস্টের পর বলেছিলাম, ওরা কোনও টেস্টই এই সিরিজে জিততে পারবে না। কথাটা মিলিয়ে নিস। গোটা টিমটাই মেন্টালি ডিস্টার্বড, টিম স্পিরিট বলে কোনও জিনিসই নেই। কী করে দুটো পয়সা হাতানো যায় শুধুই সেই ধান্দায় ব্যস্ত। একেবারে ভিখিরি ক্লাসের! নারানদা জানালেন, ”রেস্ট ডে—তে সি এ বি প্রেসিডেন্টের ঘরে বোর্ডের কর্তারা বসবে।”
”ও তো হামেশাই বসে।”
”এবার বসবে বাঙ্গালোরে ফোর্থ টেস্টের জন্য নামের লিস্ট নিয়ে। ফিফথ ডে টি—এর সময়ই টিমের নাম ঘোষণা করবে।”
”ওরা লিস্ট নিয়ে বসবে মানে?” অনন্ত অবাক কৌতূহলে তাকাল। ”ওরা কি সিলেক্টর?”
”সিলেক্টরদের বাবা ওরা। সিলেকশন মিটিং একটা হবে বটে, তাতে ওদের দেওয়া লিস্ট নিয়েই সিলেক্টাররা আলোচনার মহড়া দেবে।” জীবন আড়চোখে অনন্তর মুখের দিকে তাকিয়ে দেখল। তারপরই কথা ঘুরিয়ে দিতে বলল, ”কাকিমাকে বলিস তো, অনেকদিন ওঁর হাতের আলুর দম খাইনি। কাল নিয়ে আসবি।”
”তুই কালও কষা মাংস আনবি?”
”কাল নিরামিষ। আবার পরশু আমিষ। তোদের ওখানে সেই দোকানটার কাঁচাগোল্লা পাস কিনা দেখিস তো।”
