ভ্রমরা নমস্কার করে বলল, ”দেখেই বুঝেছি। বাবা ওঁর চওড়া কপালের কথা বলেছিলেন।”
”মা’র জ্বর হয়েছে, ঘরে শুয়ে আছে।”
ঘরে ঢুকতে ঢুকতে অনন্ত বলল, ”মা, এই দ্যাখো কে এসেছে।”
তনিমা হাতের বইটা মুড়ে পাশ ফিরে তাকিয়েই উঠে বসলেন।
”জামশেদপুরে এদের বাড়িতেই আমি গেছলাম। এ হল ভ্রমরা।”
তনিমা উঠে বসতেই ভ্রমরা প্রণাম করল।
”বোসো মা, …তোমাদের সবার কথাই অন্তুর কাছে শুনেছি। তোমার বাবাকে আমি অবশ্য দেখিনি, তবে ওঁর মুখে শুনেছি। তোমার নাম কে রেখেছেন? শুনেই বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসের নায়িকাদের কথা মনে পড়ে যায়।”
”দাদামশাই রেখেছেন, তবে বঙ্কিমচন্দ্রের ভ্রমর, আর আমি ভ্রমরা। আমার মায়ের নাম মৃণাল।”
”অন্তু, চায়ের কথা পিসিকে বল।”
”শুধু চা কিন্তু। না না, সৌজন্য—টোজন্য নয়, দু’ঘণ্টা আগে সেজোমাসির বাড়িতে ভাত খেয়েছি। উনি ডাক্তার, এই স্টেশনের কাছে ওঁর নার্সিংহোম। মনে হল, কাছাকাছিই যখন এসেছি তখন খোঁজ করে দেখি।”
”খুব কি খোঁজাখুঁজি করতে হল? আমাদের বাড়িটা যখন কেনা হয় তখন জায়গাটা খুব নির্জন, ফাঁকা—ফাঁকা ছিল। গত দু’বছরে কী অসম্ভব রেটে যে বাড়ি উঠে গেল!”
ওরা বাইরে এসে বসলেন। চা খেতে—খেতে নানান কথা হতে লাগল। তনিমা একসময় জিজ্ঞেস করলেন, ”লেখাপড়া শিখে তারপর কী করবে?”
”ব্যবসা।”
একই সঙ্গে মা ও ছেলের ভ্রূ উঠে গেল কপালের দিকে।
”কীরকম ব্যবসা, শাড়ির? আজকাল তো দেখি শিক্ষিত সম্পন্ন বাড়ির বউয়েরা বাড়ি—বাড়ি গিয়ে তাঁতের শাড়ি বিক্রি করছেন। ভালই এটা।”
তনিমা তারপর যোগ করলেন, ”আমিও তো টিউশনি করি। একই ব্যাপার।”
”আমি ভাবছি বিজ্ঞাপনের একটা কাগজ করব। প্রথমে চার পাতার। বালিগঞ্জ, গড়িয়াহাট, কালীঘাট, ভবানীপুর ওই সব অঞ্চলের ব্যবসায়ীদের বিজ্ঞাপন থাকবে। আর কাগজটা বিনি পয়সায়, ধরুন প্রথমে পাঁচ হাজার ওই সব অঞ্চলেরই বাড়িতে বিলি করব। বিজ্ঞাপন ছাড়াও তাতে থাকবে ওই অঞ্চলের নানা ঘটনার, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের, নানান স্কুলের আর স্থানীয় নামকরা লোকদের সম্পর্কে খবরাখবর।”
”বিনি পয়সায়! তা হলে খরচ উঠবে কী করে?” অনন্ত অবাক হয়ে জানতে চাইল। সে বুঝতে পারছে না এভাবে ব্যবসা করা সম্ভব কি না, তাও একটি মেয়ের পক্ষে!
”ওই অঞ্চলে কত গহনার, জামা—কাপড়ের, জুতোর, ওষুধের দোকান, খাবারের দোকান, রেস্তোরাঁ, ডাক্তার, উকিল, নার্সিংহোম, বিউটি পার্লার, রিপেয়ারিং শপ, বাসনকোসনের দোকান আছে জানেন? তারাই বিজ্ঞাপন দেবে। সেই টাকাতেই এই ফ্রি—শিটার বা অ্যাডভার্টাইজার চলবে। আমেরিকায় এরকম কাগজ আছে। দিল্লিতেও একজন মহিলা করেছেন, আট পাতার কাগজ, দশ হাজার বিলি করেন। লাভও করছেন, কেননা বিজ্ঞাপনদাতারা বিজ্ঞাপন দিয়ে ভাল রেসপন্স পেয়েছে। দিল্লির মতো কলকাতাতেও এখন বিরাট কনজিউমার সোসাইটি গড়ে উঠছে। লোকে কেনাকাটা বাড়াচ্ছে। তাই তো ভেবেচিন্তে আমরা তিন বন্ধু মিলে ঠিক করেছি এইরকম একটা উদ্যোগে নামব। আর নেমে না পড়লে ব্যাপারটা তো ঠিক বোঝা যাবে না।”
”খুব খাটতে হবে তোমাদের।” তনিমা আর হালকাভাবে মেয়েটিকে দেখছেন না। ওর মধ্যে বুদ্ধি, কল্পনা আর সাহস দেখতে পেয়ে তিনি সমীহও করতে শুরু করেছেন। যথেষ্ট সম্পন্ন লোকের মেয়ে, ভাল পাত্রের সঙ্গে বিয়ে তো হতে পারে, লেখাপড়াতেও নিশ্চয় ভাল আর সুন্দরী না হলেও সুশ্রী। সংসার নিয়ে স্বচ্ছন্দে জীবন কাটিয়ে দিতে পারবে। কিন্তু নিশ্চিন্ত আরামের বদলে লড়াই করতে তৈরি হচ্ছে। তনিমার মনে হল, মেয়েটি প্রকৃতই আধুনিক।
”খাটতে তো হবেই। না খাটলে কি এসব জিনিস দাঁড়াতে পারে?” ভ্রমরা এমনভাবে বলল যেন সূর্য উঠলে রোদ তো হবেই ধরনের স্বতঃসিদ্ধ কথা। ”পাঁচ—ছ’ঘণ্টা রোজ ঘুরতে হবে আমাদের, হয়তো তারও বেশি।”
”তোমার বাবা—মা কী বলছেন?”
”বাবা তো শুনেই লাফিয়ে উঠেছেন।”
”অন্তুর বাবাও তাই করতেন। আমারও শুনে খুব ভাল লাগছে। উপায় থাকলে বলতাম আমাকে পার্টনার করে নাও।”
”আগে শুরু তো করি।” বলতে—বলতেই ভ্রমরা পা দুটো চেয়ারে তুলে ”হুসস, ভাগ ভাগ,” বলে উঠল।
ফুলি এসে ওর পায়ে মাথা ঘষেছিল। বেড়ালে ভ্রমরার অরুচি। অনন্ত কোলে তুলে নিল ফুলিকে। কথাবার্তা এরপর অবধারিতভাবেই টেস্ট—ম্যাচে এসে গেল।
”আপনি খেলা দেখতে গেছলেন নাকি!” অনন্ত জিজ্ঞেস করল।
”না। বসে—বসে অতক্ষণ টিভি দেখাও পোষায় না। তবে এটুকু জানি, কালই আমরা হারছি।”
তনিমা ফিকে হেসে বললেন, ”যদি তোমার মতো হত, তা হলে বোধহয় এই অবস্থায় পড়ত না।”
”আমার মতো নয়, ওঁর মতো যদি হত।” ভ্রমরা তাকাল অনন্তর দিকে। অনন্তর কান দুটো গরম হয়ে উঠল।
”কাকিমা, আপনি যদি সেদিন মাঠে থাকতেন তো বুঝতেন। কী প্রচণ্ড যে একটা ব্যাপার উনি করলেন। হাসতে হাসতে অস্ট্রেলিয়া যে ম্যাচটা জেতে, সেটা কীভাবে যে ছিনিয়ে আনলেন, ভাবলে শিউরে উঠতে হয়।”
তনিমা স্নিগ্ধ চোখে ছেলের দিকে তাকালেন। অনন্ত আমতা—আমতা করে কিছু একটা বলল, যেটা ফুলি ছাড়া আর কেউ বুঝতে পারল না। অনন্তর কোলে বসে চোখ বুজে সে ঘড়ঘড় শব্দ শুরু করল।
”মানুষকে খুব ইন্সপায়ার করে এইরকম পারফরমেন্স। কতদূর পর্যন্ত যে মানুষের ইচ্ছে আর ক্ষমতা যেতে পারে, এইসব ব্যাপার থেকে তা বোঝা যায়। তাই না কাকিমা?”
