প্রথমে লাফিয়ে উঠল তরুণ। উন্মত্তের মতো সে ছুটে গিয়ে অনন্তকে জড়িয়ে মাটি থেকে তুলে নিল।
”হ্যাটট্রিক, হ্যাটট্রিক….আমরা জিতব। আমার মন বলছে জিতব।”
আকাশ ভাঙা চিৎকার তখন স্টেডিয়ামে। সবাই তাকে জড়িয়ে ধরতে চাইছে। অনন্তর চোখে বোবা চাহনি। কিছুই তার চেতনায় ছাপ ফেলছে না।
বোলানেরই নির্দেশে বোধহয়, অনন্তকে পিটিয়ে ছত্রাকার করে দেবার জন্য পরের ব্যাটসম্যান ব্যাট চালিয়ে ফেলল। পরপর দুটো বাউন্ডারি নিল মিড উইকেট থেকে। চতুর্থ বলেও হাঁকড়াল। ব্যাটের কিনারে লেগে বলটা উঁচু হয়ে উঠল মিড অফে। ওখানে লোক নেই। অবিশ্বাস্যভাবে ফলো থ্রু থেকে দেহ ঘুরিয়ে নিয়ে অনন্ত ক্যাচ নিতে দৌড়ল। বল জমিতে পড়ার তিন—চার ইঞ্চি আগে সে ঝাঁপিয়ে ডান হাতে ধরে নিল।
”বাবা আমি চেষ্টা করছি।” বলটা আকাশের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে অনন্ত মনে মনে বলল।
এই ওভারের শেষ বল। জোরে ফরোয়ার্ড পুশ করেছে ব্যাটসম্যান। অনন্তর পাশ দিয়ে বলটা গেল। ফিল্ডার নেই। অনন্তই দৌড়ল। কভারে একজনই ফিল্ডার সেও দৌড়ল।
ওরা এক রান নিল। দ্বিতীয় রানের জন্য দৌড়বে কি না, ইতস্তত করল বোলার প্রান্তের ব্যাটসম্যানটি। দোনোমনো করে অবশেষে বেরোল। তখন অনন্ত বল তুলে নিয়েছে। প্রায় ৪৫ গজ থেকে তাঁর ছোঁড়া বল উইকেটকিপারের হাতে যখন পৌঁছল, ব্যাটসম্যানটির তখনও দু’গজ বাকি ক্রিজে পৌঁছতে।
স্টেডিয়াম প্রায় দু’মিনিট ধরে উল্লাস উদ্গীরণ করেই হঠাৎ শান্ত হয়ে গেল। একটা অবিশ্বাস্য, অপ্রত্যাশিতের আভাস যেন ভেসে এসেছে মাঠে। শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। প্রতিটি মানুষ এখন শুনতে পাচ্ছে নিজের বুকের ধকধকানি। অস্ট্রেলিয়ার ৩৪ রান দরকার, হাতে পাঁচ উইকেট।
নিরঞ্জনের ওভার। দুটো স্ট্রোক থেকে একটা চার, একটা তিন রান হল।
আবার অনন্ত। পরপর তিনটে বল ট্রিমার, উইকেট ঘেঁষে বেরিয়ে গেল। চতুর্থটা ব্যাটের কানায় লেগে স্লিপের মধ্য দিয়ে এক রান। রাহুল আক্রমণাত্মক ফিল্ড সাজিয়েছে। থার্ডম্যান বাউন্ডারিতে লোক রাখেনি। দ্বিতীয় স্লিপ থেকে বরুয়া ছুটে গিয়ে বাউন্ডারি লাইনে বল থামাল। তিনরান। পরের দুটো বল আটকে দিল ব্যাটসম্যান।
নিরঞ্জনের ওভার। দুই ব্যাটসম্যানই স্থির করে ফেলেছে, অনন্তকে সামাল দিয়ে অন্য বোলারের কাছ থেকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব জয়ের জন্য রান তুলবে। ভাল লেংথ আর ডিরেকশন রেখে নিরঞ্জন বল করছে। ব্যাটসম্যান রান করার সুযোগ পাচ্ছে না, তাই অধৈর্য হয়েই গুড লেংথ বল ফ্লিক করতে গিয়ে ফসকাল। এল বি ডবলু আবেদন জানাল আটজন ফিল্ডার। আম্পায়ার আঙুল তুললেন। ব্যাটসম্যান খুবই অবাক হবার ভান করে ব্যাট তুলে বোঝাতে চাইল, বলটা প্রথমে সে ব্যাটে খেলেছে। কিন্তু আম্পায়ার অটল রইলেন তাঁর সিদ্ধান্তে। এইসব অভিনয় দেখায় তিনি অভ্যস্ত।
আর ২৪ রান, রয়েছে চারটে উইকেট। কী একটা ত্রাস এবার অস্ট্রেলীয়দের কলিজাকে চেপে ধরেছে, যার ফলে পরের ব্যাটসম্যানরা ধৈর্য এবং বিচারবোধ হারিয়ে ফেলল। অনন্ত এখন তাদের কাছে যমদূত। তার প্রতিটি বল এখন মৃত্যুর শমন। অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং সর চেঁছে তুলে নিয়েছে পূর্বাঞ্চল, এখন শুধু পড়ে আছে তলানি। উত্তেজনায় স্টেডিয়াম এখন দুলছে।
খেলা আচমকাই শেষ হয়ে গেল। আট নম্বরে গোল্ডি নেমেছে। অনন্তর পরের ওভারে সে লং—অনে দুটো ওভার বাউন্ডারি মেরে বারো রান তুলতেই রাহুল সেখানে একজনকে পাঠাল। এগিয়ে গিয়ে অনন্তকে বলল, ”ইয়র্কার দাও, বোল আ স্লোয়ার ওয়ান।”
অনন্ত ঠিক তাই দিল। ইয়র্কারটা গোল্ডির দুটো স্টাম্প শুইয়ে, হঠাৎ মন্থর বলে লেভিনকে মিড—অনে ক্যাচ তুলিয়ে অস্ট্রেলিয়াকে জয়—পরাজয়ের মধ্যবিন্দুতে এনে দিল। দশ নম্বরে এল লেসলি এবং ওভারের শেষ বলে পরিষ্কার বোল্ড হল বলের গতিতে। শেষ উইকেট এবং বারো রান বাকি।
এই সময় স্নায়ু ঠিক রেখে অবিচল থেকে বল করা আর ব্যাট করা, দুটোই কঠিন। ফেলপস আর নিরঞ্জন। স্নায়ুযুদ্ধে কে জেতে? গ্যালারি ও প্যাভিলিয়নে অনেকের স্নায়ুই ছিঁড়ে গেছে। মুখ নামিয়ে মাঠ থেকে অনেকে চোখ সরিয়ে রেখেছে, উত্তেজনায় হাঁফাচ্ছে। বিরাজ করছে নৈঃশব্দ্য।
নিরঞ্জনই জিতল। ফেলপস শুধু দুটি রান নিতে পেরেছে। ডিপ মিড উইকেট থেকে দশ রান বাকি। এবার পরের ওভার।
‘অন্তু আকাশে প্রাসাদ তুমি বানিয়েছ। এই ম্যাচ থেকেই তুমি টেস্ট ম্যাচে পা রাখবে। যে স্বপ্ন দেখে আসছ, এবার তা সফল হতে চলেছে। প্রাসাদটা আকাশ থেকে পড়ে যাবে, যদি না ওর তলায় ভিত তৈরি করে দাও। অন্তু যাও, ওই উইকেটটা নিলেই ভিত তৈরি হয়ে যাবে, যাও।’
বলটাকে বুকের কাছে দেখেই ম্যাড্রফ ব্যাট তুলে ঠেকাল। ব্যাট থেকে বলটা আলতোভাবে উঁচু হয়ে অনন্তর বুকের কাছে নেমে এল। বাকি কাজটায় সে ত্রুটি রাখেনি। অস্ট্রেলিয়া নয় রানে হারল।
।। দশ ।।
দিল্লিতে প্রথম টেস্ট—ম্যাচে প্রথম দিনের খেলা হওয়ার পর অনন্তদের বাড়িতে জীবন এসেছিল। আনন্দবাজারে প্রকাশিত স্টাফ রিপোর্টারের লেখাটা নিয়ে কথা প্রসঙ্গে অনন্ত বলেছিল, ”মনে হয় বোর্ড কিছু একটা করবে।”
জীবন বলেছিল, ”আজ ইন্ডিয়া টিমের যা পারফরমেন্স, তাতে প্লেয়ারদের গায়ে হাত দিতে বোর্ড সাহস পাবে না। না হারলে কোনও অ্যাকশনই নিতে পারবে না। হয়তো সময়ের অপেক্ষায় বোর্ড রয়েছে। আর সেই সময়টা বোধহয় ঘনিয়ে আসছে।”
