ড্রেসিংরুমে তরুণ বলল, ”আর ইনিংস ডিফিট দিতে পারবে না, ড্র হচ্ছে। সবাই ধরে খেললে কাল টি পর্যন্ত আমরা চালিয়ে যাব।”
১৯ রানে পিছিয়ে থেকে পূর্বাঞ্চল দ্বিতীয় ইনিংস খেলতে নামল চা—এর পর। অ্যামরোজ আর আরউইন দুটো ঘূর্ণি ঝড় হয়ে দেড়ঘণ্টায় পূর্বাঞ্চলকে ওলটপালট করে দিল। অনন্ত যখন ব্যাট করতে গেল তখন আরউইন একাই ৩১ রানে প্রথম পাঁচটা উইকেটই নিয়েছে। অ্যামরোজ আট ওভারে ১২ রান দিয়ে উইকেট পায়নি। ম্যাড্রফের দুই ওভারই মেডেন পেয়েছে।
প্রথম বলটাই বাউন্সার। অনন্ত হুক করল এবং ওভার বাউন্ডারি।
”ছক্কা…ছক্কা…উই ওয়ান্ট সিক্সার।” মাঠের একধারে শুরু হল, তারপর ছড়িয়ে পড়ল নামতা পড়ার সুরে—”উই ওয়ান্ট সিক্সার…উই ওয়ান্ট সিক্সার।”
গরম হয়ে উঠল অনন্তর মাথা। ওরা খুশি হবে, ওদের খুশি করে দেব। আরউইন তার ওপর রেগে আছে। আবার একটা বাউন্সার দেবে, দেবেই। অনন্ত তৈরি হল হুক করার জন্য। মন্থর, সোজা ফুলটস। ব্যাট চালাবার পর উইকেটে বল লাগার শব্দ শুনেই অনন্ত আর মুখ ঘুরিয়ে পিছনে তাকায়নি। কানে এল দুর্বোধ্য ভাষায় আরউইন কী যেন বলে হেসে উঠল। অনন্তর চোয়াল ধীরেধীরে শক্ত হয়ে উঠল ফিরে আসার সময়। এমন বেয়াকুফি জীবনে আর সে করবে না।
আট উইকেটে পূর্বাঞ্চলের ৭১ রান। অনন্ত গুম হয়ে গেল। মাঠে কোনও দিকে তাকাল না, কারও সঙ্গে কথা বলল না। শরীর গরম লাগছে। ঘরে এসেই শুয়ে পড়ল। মাথার মধ্যে বারবার প্রতিধ্বনিত হচ্ছে আরউইনের হাসিটা।
তৃতীয় দিনে পূর্বাঞ্চলের দ্বিতীয় ইনিংস শেষ হয়ে গেল ১০৩ রানে। অস্ট্রেলিয়ার ৮৫ রান দরকার ম্যাচ জিততে। তাদের হাতে দুশো রান তোলার মতো সময় রয়েছে।
ফিল্ড করতে নামছে পূর্বাঞ্চল। সবার শেষে অনন্ত। কানে এল একটা কথা: ”বড় জোর কুড়ি ওভার। এখন তো ওয়ান ডে ম্যাচের মেজাজে ওরা ব্যাট করবে।”
ভ্রমরাকে দেখতে পেল। দু’হাত মুঠো করে ঝাঁকিয়ে ইশারায় লড়াই করতে বলছে। অস্ট্রেলিয়ার ছ’জন রেগুলার টেস্ট ব্যাটসম্যানের কাছে মাত্র ৮৫ রান তো একটিপ নস্যি। কী লড়াই সে করবে? তবু ভাল লাগল ভ্রমরার আগ্রহভরা উৎকণ্ঠা দেখে। অনন্ত হাসল এবং চোখ সরিয়ে নিতে গিয়েই তার পা থেমে গেল।
জীবন! পাঞ্জাবির ডানহাতা গোটানো। নকল হাতটা যেখানে থাকার কথা সেখানে নেই। কনুইয়ের থেকে ইঞ্চি—পাঁচেক নীচেই হাতটা সরু হয়ে যেখানে শেষ হয়েছে সেখানে শক্ত একটা হাড়ের আভাস। জীবন তার দিকে তাকিয়ে।
পলকের জন্য অনন্ত চোখে অন্ধকার দেখল। চোখ থেকে মুছে গেল এই কিনান স্টেডিয়াম আর কয়েক হাজার দর্শক। টিম মাঠে নেমে গেছে। অনন্ত দৌড়ল।
তার প্রথম দুই ওভারে ২৪ রান নিল দুই ব্যাটসম্যান। আবোলতাবোল বল ফেলে পূর্বাঞ্চলকে সে একটু দ্রুতই পরাজয়ের দিকে ঠেলে দিয়েছে। আর বল করতে না দিয়ে রাহুল আনল সতিন্দরকে। স্বচ্ছন্দে দুটো—তিনটে রান ওভারে উঠছে। নিস্তরঙ্গ সাগরে তরতরিয়ে চলেছে অস্ট্রেলিয়ার জয়ের তরণী।
‘অন্তু তোমার কি নিজেকে খারাপ লাগছে?’
‘হ্যাঁ বাবা। দু’ওভার বল করেই লং লেগ বাউন্ডারিতে নির্বাসিত হলে, কোনও বোলারেরই নিজেকে ভাল লাগে না।’
‘তা হলে নিজেকে যাতে ভাল লাগে তাই করছ না কেন? বল নাও, চেষ্টা করো আউট করতে। তোমাকে তো বলেইছি সাফল্যের জন্য প্রচণ্ড খিদে থাকা দরকার। সফল হবার জন্য আকাঙ্ক্ষা করো। যাও, আবার চেষ্টা করো। মাথা ঠাণ্ডা রাখো। যাও অন্তু, যাও। তুমি পারবে। শেষ বল না হওয়া পর্যন্ত হার মেনো না। এখনও ওদের ছেচল্লিশ রান দরকার। ওদের এই রান তুলতে দিও না। অন্তু তোমাকে এইভাবে মাঠের কিনারে দর্শক হয়ে থাকতে দেখে আমার কষ্ট হচ্ছে। অন্তু কষ্ট হচ্ছে আমার…।”
”রাহুলদা।”
লং লেগ থেকে ছুটে আসছে অনন্ত। অধিনায়ক রাহুল শর্মা নিজে বল করবে বলে তখন ফিল্ড সাজাচ্ছে। সে ভ্রূ কুঁচকে তাকাল পাগলের মতো ছুটে আসা অনন্তর দিকে।
”রাহুলদা, আমায় দিন বল। হেরে তো যাচ্ছিই, তবু একবার দুটো ওভার করতে দিন।”
অনন্ত জোড় হাতে মিনতি জানাল। কী ভাবে রাহুল বলল, ”হ্যাঁ হেরে গেছিই…আচ্ছা করো তুমি।” ওভারের পঞ্চম বলে দ্বিতীয় স্লিপে বরুয়ার কাছে রজার্সের নিচু ক্যাচ গেল। বাঁ দিকে ঝাঁপিয়ে বলটা মুঠোয় নিতে না পেরে সে ধাক্কা দিয়ে তুলে দিল। প্রথম স্লিপে রাহুল লুফে নিল। ওভারের ষষ্ঠ বল, প্রচণ্ড গতির ইয়র্কার আরউইনের মিডল স্টাম্পের গোড়ায় বিস্ফোরিত হল। নিয়মরক্ষার তালি বাজল স্টেডিয়ামে। আরউইন মাথা নামিয়ে ফিরে গেল।
নিরঞ্জন তিন রান দিল পরের ওভারে।
আবার অনন্ত। বোলানকে ঘিরে আটজন ফিল্ডার। অনন্ত উইকেট পেলে হ্যাট্রিক হবে। এইবার নিজেকে নিংড়ে সর্বশক্তি দিয়ে একটা সোজা বল। নিছক গতিতেই বোলানকে হারাতে হবে। অনন্ত ভাবতে ভাবতে বোলিং মার্কে ফিরছে।
‘অন্তু মাথা ঠাণ্ডা রাখো। জোরে বল দিতে গিয়ে স্টোকে লক্ষ্যভ্রষ্ট করো না। বোলান ঝানু ব্যাটসম্যান। বুদ্ধি খাটাও।’
বলটাকে যখন বুঝল অনন্তর স্বাভাবিক গতির থেকে অনেক কম এবং অফ স্টাম্পের বাইরে, বোলান পিছনের পা থেকে শরীরের ভর সামনের পায়ে এনে, সামান্য ঝুঁকে ডিফেন্সিভ ব্যাট ধরল। ছোট্ট অফ কাটারটা ব্যাট আর প্যাডের ফাঁক দিয়ে পথ বার করে নিল।
