”তোর যা কিছু সব গুছিয়ে ভরে নিয়েছি, তবু একবার দেখে নে আর ম্যানেজারের সঙ্গে দেখা করে বলে আয়, যাচ্ছি। এখনই খেয়ে বেরোলে সাতটা, সাড়ে সাতটা নাগাদ পৌঁছে যাব।”
প্রায় একঘণ্টা গাড়ি চালাবার পর জীবন বলল, ”আমি এখনও বিশ্বাস করে উঠতে পারছি না।”
অনন্তর মুখে হাসি ফুটল, ”আমিও না।”
”ম্যাচটাকে ওরা গুরুত্ব দেয়নি। গ্রিন টপ দেখেও বোলান খেলাল না লটন আর ব্রাইটকে। বোধহয় ভেবেছিল, দুটো স্পিনার এবারও বাজি মেরে দেবে।”
”কিন্তু লেসলি আর ম্যাড্রফকে বাদ দিলে অস্ট্রেলিয়া পুরো সেকেন্ড টেস্টের টিমটাকেই নামিয়েছে।”
”তাই তো বিশ্বাস করতে পারছি না। পুরো টেস্ট ব্যাটিং লাইন—আপকে তুই উড়িয়ে দিলি কী করে?”
অনন্ত হাসল। তাকে ক্লান্ত, শুকনো দেখাচ্ছে। বলল, ”তাই তো, কী করে ওড়ালাম! আচ্ছা ভেবে দেখি।”
অনন্ত চোখ বুজে মাথাটা পিছনে হেলিয়ে দিল।
।। নয় ।।
বোলান টসে রাহুল শর্মাকে হারিয়ে ফিল্ড করাটাই পছন্দ করেছিল। অ্যামরোজ আর স্টিল বোলিং ওপেন করে। অ্যামরোজ প্রথম চার ওভারেই দু’জনকে ড্রেসিংরুমে পাঠিয়ে দেয়। এল বি ডবলু দুজনেই। প্যাভিলিয়নটা স্কোয়ার লেগের দিকে। সেখানে থেকে বলের মুভমেন্ট বোঝা না গেলেও, অনন্ত বলের বাউন্স আর পিচ থেকে বলের গতি বুঝতে পারছিল। ফিসফিস করে পাশে—বসা তরুণ মল্লিককে সে বলে, ”কী বুঝছ তরুণদা, তোমার কাজ কমল না বাড়ল? ন্যাড়া কোথায়, এতো দিব্যি মাথাভর্তি চুলেভরা উইকেট!”
”তাই তো রে! দুদিনেই তো ম্যাচ শেষ হয়ে যাবে। সাত বছর রঞ্জি খেলছি, এমন উইকেট কখনও দেখিনি। ইনিংসেই হারব।”
”জিততেও তো পারি।”
তরুণ ভ্রূ তুলে অনন্তর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে ঠোঁটের কোণ মুচড়ে।
”তুই তো সাতে ব্যাট করবি, প্যাড পরে নে।”
”তৃতীয় উইকেটে ৪৫, চতুর্থ উইকেটে ৪০ রান তুলে পূর্বাঞ্চল চায়ের সময় ছয় উইকেটে ১২১। অনন্তর তখন দুই। মাঠ থেকে ফেরার সময় চোখে পড়ল কমপ্লিমেন্টারি এনক্লোজার থেকে বেরিয়ে আসছে ভ্রমরা। তাকে দেখে মাথাটা হেলাল। অনন্ত দাঁড়িয়ে পড়ল ফেন্সিংয়ের ধারে।
.
”তা হলে চেষ্টা করে খেলা দেখতে এলেন?”
”লাঞ্চের সময় এসেছি, এখন চলে যাচ্ছি।”
”আমার আউটটা দেখেই বরং যান।”
ভ্রমরা তাই করল। অবশ্য সেজন্য তাকে প্রথম দিনের খেলা শেষ না হওয়া পর্যন্ত বসে থাকতে হল। চায়ের ঠিক একঘণ্টা পর পূর্বাঞ্চল—ইনিংস শেষ হল আরও ৮০ রান যোগ করে এবং তাতে অনন্তর রানই ৬৫। পাঁচটা ছয়, পাঁচটা চার, ৪১ বল পরিচ্ছন্ন ভাবে খেলে এবং শেষপর্যন্ত অপরাজিত ৬৭। পূর্বাঞ্চলের যে ২০১ রান উঠবে, কেউই তা আশা করেনি। যেমন কেউই ভাবেনি কুড়ি মিনিটের ব্যাটিংয়ে অস্ট্রেলিয়া ২৫ রানে রজার্স আর বোলানকে হারাবে, অনন্তর প্রথম বাইশ বলেই। রজার্স গালিতে, বোলান ডিপ স্কোয়ার লেগে ক্যাচ দিয়েছিল।
ভ্রমরাকে সে দেখতে পেয়েছিল এবং জীবনকেও। ভ্রমরা চেয়ার থেকে ওঠেনি, শুধু মাথাটা হেলায় আর জীবন গম্ভীর মুখে সেটাই লক্ষ করে যাচ্ছিল।
রাতে শোবার আগে তরুণ মুখে ক্রিম ঘষতে ঘষতে বলল, ”অন্তু অত উঁচুতে আর বাউন্সার তুলিসনি। দেখলি তো ব্যাটসম্যান মাথাও নামাল না, আমিও লাফিয়ে একটা তো ধরতেই পারলাম না, চারটে বাই হয়ে গেল। তোর একটা স্লোয়ার বাউন্সার আছে। খুব কাজে দেবে যদি মিশিয়ে দিতে পারিস।”
দ্বিতীয় দিন চাঞ্চল্যকরভাবে শুরু হয়। গতদিনের অনন্তর চতুর্থ ওভারটা শেষ হয়নি, দুটো বল বাকি ছিল। আরউইনের সঙ্গে মিন্টার ব্যাট করতে আসে এবং অনন্তর বল ফস্কে দ্বিতীয় বলে বোল্ড। তিন উইকেটে ২৫ থেকে, আরউইন, উডফোর্ড আর টুমি লাঞ্চে স্কোর নিয়ে গেল ১০৫—এ। উডফোর্ড রান আউট, টুমিকে তরুণ ধরল নিরঞ্জনের বলে। অনন্ত এগারো ওভার বল করে আর উইকেট পায়নি।
লাঞ্চের পর অস্ট্রেলিয়া রান সংগ্রহের গতি বাড়াল আর উইকেটও হারাতে শুরু করল। নিরঞ্জন আবার একটা পেল। রাহুল তার অফব্রেকে প্রিধামকে পেল প্রথম স্লিপে। চায়ের কুড়ি মিনিট আগে অনন্ত বল নিল তার তৃতীয় স্পেলে। তখন তার ফিগার ছিল ১৯—৪—৫১—৩। মাঠের উত্তর দিকে, অনন্ত যখন ওভার শুরু করার জন্য বোলিং মার্কে যেতে যেতে দলমা পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে ইয়র্কার না অফ কাটার দিয়ে শুরু করবে ভাবছে, মৃদুমন্দ বাতাস মুখে লাগছে, তখন হঠাৎ কে যেন চিৎকার করে বলল, ”অনন্ত সেন মুড়িয়ে দে ওদের।”
চমকে উঠেছিল অনন্ত। শামিয়ানার নীচে কাঠের গ্যালারি। ছায়ায় লোক চেনা যায় না মাঠ থেকে। গলার স্বরটা প্রায় বাবার মতো। বুকে ছলাৎ করে ওঠে, হৃৎপিণ্ডের গতি দ্রুত হয়, ঝাঁ ঝাঁ করে ওঠে মাথা। গোটা শরীরে নিমেষে গরম একটা ভাপ ছড়িয়ে গেল। চোখ জ্বালা করছে।
প্রচণ্ড গতির আউট—সুইঙ্গারটাকে পিছিয়ে খেলে আরউইন ব্যাটে পেল না। অফ স্ট্যাম্প ঘেঁষে গেল তরুণের হাতে। ৭৩ টেস্ট ম্যাচে প্রায় চারহাজার রান করা ও প্রায় তিনশো উইকেট পাওয়া আরউইন মাথা নামিয়ে বলের পিচের দিকে তাকিয়ে রইল। ক্লোজ ইন ফিল্ডাররা দু’হাত তুলে লাফিয়ে উঠেছিল। পরের বল একই ভঙ্গিতে ডেলিভারি করল অনন্ত। একই বল, একই জায়গায় পড়ল, কিন্তু মন্থর গতিতে। আরউইন আগের বলের মতোই পিছিয়ে গেল। বলটা আগের বলের মতোই বেরিয়ে গেল, শুধু যাবার সময় ফেলে দিয়ে গেল অফ স্টাম্পের বেলটা। ফিরে যাবার সময় আরউইন মুখ ঘুরিয়ে অনন্তর দিকে তাকাল। তার চোয়ালের পেশী শক্ত হয়ে গেছে। ওভারের চতুর্থ এবং শেষ বলে বাকি উইকেট দুটোও সে পেল, তরুণের গ্লাভসে এবং বোল্ড করে। ছয় উইকেটে ৫১ রান।
