”ঘনিষ্ঠ বললে কমই বলা হবে।”
এরপর অনন্ত ধীরে ধীরে বলে গেল জীবনের কথা। স্কুটার দুর্ঘটনা, হাত কেটে বাদ দেওয়া থেকে গতকাল খেলার শেষ বল হওয়ার পর যখন পূর্বাঞ্চল টিম মাঠ থেকে বেরিয়ে আসছে, তখন জীবনের সঙ্গে দেখা হওয়া পর্যন্ত, তাদের বন্ধুত্বের কিছু কিছু কথা, কিছু কিছু ঘটনা। ওরা দু’জন গভীরভাবে শুনছিল।
”আহা বেচারি!” মৃণাল দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ”টেস্ট খেলার স্বপ্ন কীভাবে চুরমার হয়ে গেল।”
”আমাকে যেভাবে আগলে আগলে চলে, মাঝে—মাঝে আমার হাসি পায়, রাগও ধরে। যেখানেই যাই না কেন ঠিক খোঁজ রাখে, কখন খাচ্ছি, কখন ঘুমোচ্ছি, প্র্যাকটিস ঠিক মতো করছি কি না। এমনকী কার—কার সঙ্গে কথা বলি, তারও খবর রাখে। এই তো সেদিন…” বলতে গিয়েও অনন্ত থেমে গেল।
ওরা দু’জন উৎসুক চোখে তাকিয়ে জীবনের কথা শোনার জন্য। ভ্রমরা তার ঘরে আসার জন্য জীবন তাকে ধমকেছে, এটা তো কিছুতেই এদের বলা যাবে না! অনন্তকে রক্ষা করতেই যেন হইচই করে চার—পাঁচটি ছেলে বাড়িতে ঢুকল। তাদের নেতৃত্বে গুনগুন। অনন্ত লক্ষ করল ওদের হাতে স্কুলের নোটবই, নয়তো সাদা কাগজ, একজনেরই শুধু অটোগ্রাফ বই।
অনন্ত মুখ টিপে হেসে ভ্রমরাকে বলল, ”সই নিতে এসেছে।”
”দিন।”
”কিন্তু আমি কি হিরো?”
ব্যাপারটা বুঝতে না পেরে মৃণাল জিজ্ঞাসু চোখে দুজনের মুখের দিকে তাকালেন।
”উনি আমাকে একটু চিমটি কাটলেন।” ভ্রমরা ছদ্ম গাম্ভীর্য নিয়ে মাকে বলল। ”গুনগুন ওঁর অটোগ্রাফ চেয়েছিল, আমি বারণ করেছিলাম। নিজে হিরো হয়ে অটোগ্রাফ দেবে, কিন্তু নেবে না বলেছিলাম। সেই কথাটাই উনি ফিরিয়ে দিলেন।”
”কিন্তু আমি কি হিরো।”
”পঁচাশি রান করলে অস্ট্রেলিয়া জিতবে এমন অবস্থায় আটটা উইকেট নিয়ে যে লোকটা ওদের মুখের গ্রাস কেড়ে নিল, বোধহয় তাকে হিরো বলা যায়, কি মা?”
”ভ্রমরা, বলছিস কী তুই।”
”অ্যাই, সবাই এগিয়ে এসো।” হাত নেড়ে ভ্রমরা ছেলেদের ডাকল। ”হিরো মশাইয়ের হাত নিশপিশ করছে সই দেবার জন্য।”
অনন্ত সই দিল, বাংলায়। একজন অনুরোধ করল চারটে সইয়ের জন্য। বন্ধুদের উপহার দেবে। ওরা সই নিয়ে দাঁড়িয়ে, বোধহয় কথা বলতে চায়।
”কিছু বলবে?” অনন্ত জিজ্ঞাসা করল।
”আচ্ছা আঙ্কল আপনি শুধু একটা ছয় মারলেন কেন?”
”আর ছয় মারার বলই পেলাম না, পরের বলেই যে স্টাম্পড হয়ে গেলাম।”
”আপনি ভগবানকে ডাকছিলেন, যখন সকালে উইকেট পাচ্ছিলেন না?”
”না।”
”আপনি রোজ প্র্যাকটিস করেন?”
”রোজ কি সম্ভব। তবে রোজ ব্যায়াম করি, দৌড়ই।”
”তা হলে ফাস্ট বোলার হতে পারব, যদি আমিও রোজ ব্যায়াম করি, দৌড়ই?”
”ছেলেটির আগ্রহভরা, আকুল মুখ অনন্তকে মমতায় জড়িয়ে ফেলল। ”তুমি বুঝি ফাস্ট বোলার হতে চাও?”
”হ্যাঁ আপনার মতো।”
”তা হলে রোজ ব্যায়াম করো, দৌড়ও, বল করো। নিশ্চয় হবে।”
”আপনি রবারের বলে খেলেছেন?”
”যখন তোমাদের মতো ছোট ছিলাম, খেলেছি।”
”আপনাকে বাবা বকতেন খেলার জন্য?”
”না?”
”আপনি টেস্টম্যাচ খেলবেন?”
”খেলাটা তো আমার ইচ্ছায় হবে না। যদি টিমে নেয় তা হলে খেলব।”
”আপনার বাড়িতে কে—কে আছেন?”
”আমি আর মা। বাবা মারা গেছেন।”
”আর নয়।” মৃণাল দু’হাত তুলে ওদের থামালেন। ”এবার তোমরা এসো। ওকে এখনই কলকাতা যেতে হবে।”
অনন্ত ঘড়ি দেখল। উঠে দাঁড়াল,
”জীবন বোধহয় এসে গেছে। একসঙ্গে খাবার কথা। আমি এখন আসি।” অনন্ত প্রণাম করল।
”কী ভাল যে লাগল বাবা। বড় হও, অনেক বড় হও। দেশের মুখ উজ্জ্বল করো। এখানে এলেই কিন্তু চলে আসবে।”
”একটু দাঁড়ান, গাড়িটা বার করি, পৌঁছে দিয়ে আসি।
”আমিও যাব।” গুনগুন লাফিয়ে উঠল।
গেস্টহাউসের কাছাকাছি এসে, দূর থেকে জীবনের প্রিমিয়ারটাকে রাস্তার একধারে দেখেই অনন্ত ব্যস্ত হয়ে বলল, ”এখানে, এখানেই থামব।”
”সে কী, দরজা পর্যন্ত যাব না?” ভ্রমরা একটু অবাক হয়েই গাড়ি থামাল।
অনন্ত ওকে বলবে কী করে যে, জীবন যদি দেখতে পায় একটি মেয়ে গাড়ি চালিয়ে তাকে পৌঁছে দিচ্ছে, তা হলে প্রচণ্ড ধমক খেতে হবে। কে জানে হয়তো গাড়িতেই জীবন বসে রয়েছে।
”আমার রোজ জগ করা অভ্যেস, না করলে খিদেটা ঠিকমতো হয় না। আজ করা হয়নি, তাই একটু জগ করেই যাব।” অনন্ত ডিসেম্বরেও ঘেমে উঠল।
গাড়ি থেকে নেমে সে হাত নেড়ে বিদায় জানাতেই ভ্রমরা বলল, ”শুনুন।”
অনন্ত গাড়ির সামনে দিয়ে ঘুরে এল। ভ্রমরা একটা চামড়া—মোড়া সুন্দর ডায়েরি জানলা দিয়ে এগিয়ে ধরে বলল, ”একটা অটোগ্রাফ, আমার জন্য।”
”অ্যাঁ!”
কলম এগিয়ে ধরে ভ্রমরা বলল কলকাতায় আমারও তো বন্ধুবান্ধব আছে। তাদের দেখাতে হবে না?”
সই করার আগে কী ভেবে অনন্ত পাতাগুলো ওলটালো, মুক্তোর মতো হাতের লেখা ইংরেজি ও বাংলায়।
”উঁহু, দেখবেন না। পার্সোনাল কথাবার্তা আছে।”
”না না, দেখিনি।”
”দু’ছত্র কিছু লিখেও দেবেন, আর ঠিকানাটাও।”
”কী লিখব?”
”যা মনে আসে।”
ডায়েরিটা ফেরত দিয়েই অনন্ত প্রায় পালাবার মতোই জগ করতে—করতে গেস্টহাউসের দিকে ছুটল। কী লিখেছে দেখার জন্য ভ্রমরা ডায়েরি খুলল : ”আমার সব ম্যাচে আপনি মাঠে থাকুন।”
”কী লিখেছে দিদি?” গুনগুন ঘাড়ের কাছে ঝুঁকে পড়ল। ডায়েরি বন্ধ করে ভ্রমরা এঞ্জিন চালু করতে করতে বলল, ”কিছু না।”
অনন্তর বিছানায় জীবন শুয়ে ছিল। অন্য খাটে তরুণ তখনও ঘুমোচ্ছে। অনন্ত কাল রাত দশটার মধ্যেই ঘরে ফিরে এসেছে, সে জানে না কত রাত পর্যন্ত বিজয়োৎসব চলেছে।
