”অস্ট্রেলিয়ান প্লেয়ারদের অটোগ্রাফ জোগাড় করে দেবেন?”
”গুনগুন!” ভ্রমরা কঠিন চাপা স্বরে ধমকে উঠল। ”তোমাকে বলেছি না, এটা একটা বাজে হবি। অন্যের অটোগ্রাফ নেওয়ার থেকে নিজে যাতে অটোগ্রাফ দিতে পারো সেই চেষ্টা করো। নিজে হিরো হয়ে ওঠার জন্য ঘাম ঝরাও।”
অনন্ত অবাক হয়ে যাচ্ছিল ভ্রমরার কথা শুনতে—শুনতে। অনেকটা যেন বাবার মতো কথা এই মেয়েটির মুখ থেকে বেরোচ্ছে! শ্রদ্ধা তো বটেই, সমীহও তার মনে জাগছে।
”আপনি কোথায় পড়েন?”
”যাদবপুরে, বি—এ। আমার মাসির বাড়ি হিন্দুস্থান পার্কে, তার কাছেই থাকি।”
”আমাদের বাড়ি দমদমে, একদিন আসুন না, মা’র খুব ভাল লাগবে আপনাকে।”
”কী করে জানলেন?”
অনন্ত চুপ করে রইল। শুধু মনে—মনে বলল, আমি তো মাকে জানি।
”যাব। খেলাটা হয়ে গেলে আর একবার আসুন না।”
”যাব।”
গেস্ট—হাউসের সামনে গাড়ি থামল। গাড়ি থেকে নেমে ঝুঁকে জানলায় মুখ এনে অনন্ত বলল, ”কাল প্রথম দিন মাঠে আসুন না।”
”চেষ্টা করব। …আচ্ছা যাব। গুড নাইট।”
”গুড নাইট। সিদ্ধার্থ তোমাকেও।”
গাড়ি ঘুরিয়ে ভ্রমরারা চলে গেল। যতক্ষণ দেখা যায় দেখে অনন্ত জগ করে তার ঘরের সামনে এসেই নিরঞ্জনের মুখোমুখি হল।
”তুই তখন ঘর থেকে ওভাবে বেরিয়ে গেলি কেন?”
”আমি ভাবলাম, তোর কোনও…, তাই আর ভিড় বাড়ালাম না।”
”বাবার বন্ধুর মেয়ে।”
”ইসস। মিসটেক করে ফেলেছি তো।”
অনন্ত দরজার হাতল ঘোরাল।
”খেতে যাবি না?”
”না, সেরে এসেছি।”
ঘরে ঢুকেই সে থমকে গেল। তার বিছানায় বসে রয়েছে জীবন।
”কোথায় গেছলি, এক ঘণ্টা বসে আছি।”
”তুই কোথায় এতদিন ডুব দিয়ে ছিলি? কাকিমা বললেন ব্যবসার কাজে বাঙ্গালোর গিয়েছিলি। ফিরেছিস তো সাতদিন আগে! এখানে কোথায় উঠেছিস? খেলার টিকিট?”
”আছে। আছে। জামশেদপুরে টিকিটের জন্য, থাকার জন্য আমায় ভাবতে হয় না। একটা কথা বলতে এলাম, উইকেটে ঘাস দেখেছিস তো? এই ঘাস থাকবে।”
”অ্যাঁ, তরুণদা যে বলল থাকবে না!”
”তরুণদা জানে না। ভেতরের খবর তোকে বলছি। বোর্ড থেকে স্ট্রিক্ট নির্দেশ এসেছে ঘাস ছাঁটা হবে না। তুই হেল্প পাবি।”
”লটন, ব্রাইট, অ্যামরোজরাও হেল্প পাবে।”
”পাবে। তাতে তোর কী? তুই নিজের কাজ গুছোবি। তোর উইকেট তোলার কথা, তুলবি।”
জীবন উঠে দাঁড়াল।
”চললি?”
”হ্যাঁ, আবার দেখা হবে কলকাতায়। এই ক’দিন আর আসব না। খেলা শেষ হলেই গাড়িতে ফিরে যাব।”
দরজার কাছে গিয়ে জীবন ফিরে তাকাল। ”তোর ঘরে একটা মেয়ে এসেছিল নাকি?”
”কে বলল, নিরঞ্জন?”
”যেই বলুক, এসব কী? তোর তো এসব ব্যাপার কখনও ছিল না! তুই কি এখনই টেস্ট—প্লেয়ার হয়ে গেছিস, ভাবতে শুরু করেছিস? কাল তোর জীবনের সবথেকে ভাইটাল ম্যাচ। ট্রাই টু কনসেনট্রেট, আজেবাজে চিন্তা মন থেকে তাড়া, ট্রাই টু কনসেনট্রেট। একটিও কথা আর নয়, শুয়ে পড়।”
তীব্র চোখে তাকিয়ে, তীব্র স্বরে কথাগুলো বলেই জীবন ঘর থেকে বেরিয়ে শব্দ করে দরজা বন্ধ করল। অনন্তর মুখ ধীরে—ধীরে হাসিতে ভরে গেল। জীবন তা হলে রাগ—অভিমান কিছুই করেনি। আবার পুরনো ফর্মে ফিরে এসেছে। সেই জীবন, যে ঘিরে রেখেছে অনন্তকে।
ঘড়িতে দেখল সাড়ে ন’টা। তরুণদা এখনও ফেরেনি। অনন্ত আলো নিবিয়ে শুয়ে পড়ল। কনসেনট্রেট করতে হবে। ছাই হবে। সার—সার কথা আর মুখের মিছিল চলেছে। ‘কী লম্বা!’…’যা বলতাম অরুণ সম্পর্কে মিলিয়ে নাও’….’তুমি যদি এই ম্যাচটায় ভাল খেলতে পারো তা হলে দেখবে তোমার বাবার কথাটাই সত্যিই হয়ে উঠবে’…’চেষ্টা করব, আচ্ছা যাব, গুডনাইট।’
ঘুমে আচ্ছন্ন হতে—হতে অনন্ত টের পেল ভবেনদা দরজা খুলে ঢুকলেন। তার গায়ের কম্বলটা ঠিক করে দিলেন।
.
।। আট ।।
”আমরা ভেবেছিলাম তুমি কাল রাতে একবার আসবে।” মৃদু অনুযোগ করলেন মৃণাল। কণ্ঠস্বরে উচ্ছ্বসিত উত্তেজনা।
”অফিসিয়াল ডিনার ছিল, না গিয়ে উপায় নেই।” অনন্তর কুণ্ঠিত উত্তর।
”তা বটে। বিশেষ করে তোমার হাজিরাটা তো অবশ্যই…মাস্ট। ম্যান অব দ্য ম্যাচ, ডিনারে না থাকলে তো…।”
”শিবহীন যজ্ঞ।” ভ্রমরা বলল।
”সেই রকমই। শেষ দুটো ঘণ্টা তো দক্ষযজ্ঞই হল। টিভি থেকে পলকের জন্য চোখ সরাতে পারিনি, আর খালি মনে হচ্ছিল, ইসস খেলা দেখতে মাঠে গেলাম না কেন!” মৃণালের চোখ—মুখ ছেয়ে কয়েক সেকেন্ডের জন্য আপশোষ ঘনিয়ে উঠেই রৌদ্রের মতো ঝলমল করে উঠল আনন্দ।
”সিদ্ধার্থ কোথায়?” অনন্ত জানতে চাইল।
”তুমি আসবে জানলে ও আজ বাড়ি থেকে বেরোতোই না। আসবে এখনই, বন্ধুদের কাছে গেছে। কাল যদি ওকে দেখতে—অন্তুদা, অন্তুদা আর অন্তুদা, যেন ওর পার্সোনাল প্রপার্টি।”
ফোন বেজে উঠল। ঘরের কোণে দেওয়াল—তাকে রাখা টেলিফোন। ভ্রমরা উঠে গেল।
”তুই কোথা থেকে বলছিস?”….হ্যাঁ আমাদের এখানেই তো রয়েছে…আচ্ছা আচ্ছা থাকতে বলব।”
ফোন রেখে এসে ভ্রমরা হাসতে হাসতে বলল, ”গুনগুন। আপনার খোঁজে গেস্টহাউসে গেছে। এখনই আসবে আপনাকে অপেক্ষা করতে বলল।”
”কিন্তু আমি তো একটু পরেই কলকাতা রওনা হব, আমার এক বন্ধুর মোটরে। কাল খেলা শেষ হতেই ও চলে যাবে বলেছিল। কিন্তু…।” কথা শেষ না করে অনন্ত হাসল।
”সে কী, তুমি এখনই চলে যাবে নাকি! দুপুরে এখানে খেয়ে যাবে না?”
”না কাকিমা, ওর সঙ্গে আমাকে ফিরতেই হবে।”
”মৃণাল পীড়াপীড়ি করলেন না। শুধু বললেন, ”খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু?”
