খাবারের টেবলে অনন্তর পাশে বসল সিদ্ধার্থ। ওর সঙ্গে এখনও পর্যন্ত কোনও কথাই হয়নি। বলা উচিত, এই ভেবে অনন্ত শুরু করল।
”তুমি ক্রিকেট খেলো?”
”হুঁ।”
”গুনগুন তো ক্রিকেটের পোকা। শুধু কি খেলা নাকি! এখানে—ওখানে দেওয়ালে ছবি আঁটা আর খেলার বই নিয়ে পড়া, এ ছাড়া ওর আর কোনও কাজ নেই।” মৃণাল রান্না—করা খাবারের বাটিগুলো টেবলে সাজাতে—সাজাতে স্নেহ—ভরা অনুযোগ করলেন।
”স্কুলে ক্রিকেট কুইজ কম্পিটিশনে ফার্স্ট হয়েছে।” সিদ্ধেশ্বর জানালেন। সিদ্ধার্থ লাজুক মুখটা নামিয়ে রাখল।
”তাই নাকি!”
”রাতে কী খাও, ভাত না রুটি?” মৃণাল জিজ্ঞাসা করলেন।
”রুটি। আচ্ছা গুনগুন, না না, সিদ্ধার্থ, আমি তোমায় প্রশ্ন করব, দেখি কেমন পারো। করব?”
সিদ্ধার্থ সন্দিগ্ধ চোখে একবার তাকিয়ে মাথা নাড়ল।
”আচ্ছা বলো, দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে ভারত কখনও টেস্টম্যাচ খেলেনি। কিন্তু একজন ভারতীয় একটা টেস্ট খেলছেন, কে তিনি?”
সিদ্ধার্থর চোখ ঝলসে উঠল। গম্ভীর হয়ে বলল, ”দলিপ সিংজি। ইংল্যান্ডের হয়ে সাউথ আফ্রিকার বিরুদ্ধে খেলেছেন। সালটা মনে নেই।”
”উনিশশো ঊনত্রিশ সালে। আচ্ছা এবার বলো, হাই—ফাইভ কাকে বলা হয়?”
কিছুক্ষণ ভেবে সিদ্ধার্থ মাথা নাড়ল। জানে না।
”ওয়েস্ট ইন্ডিয়ানদের নিশ্চয় টিভি—তে দেখেছ উইকেট পেলেই ওরা ছুটে গিয়ে কেমন হাত তুলে পরস্পরের তালুতে চাপড় দেয়। একেই বলে হাই—ফাইভ। কথাটা এসেছে আমেরিকান বাস্কেটবল থেকে।”
ফুলকপির ডালনাটা অনন্তর খুব ভাল লাগছে। সে হাতা দিয়ে আরও খানিকটা প্লেটে তুলে নিয়ে আবার বলল, ”আচ্ছা বলো, ট্রিমার কাকে বলে?”
সিদ্ধার্থ এবারও মাথা নাড়ল।
”অত্যন্ত ভাল একটা ফাস্ট বলকে ট্রিমার বলা হয়, বিশেষ করে যেটা একচুলের জন্য স্টাম্প মিস করেছে।”
”অনন্ত তুমি তো ফাস্ট বোলারই?” সিদ্ধেশ্বর বললেন।
”হ্যাঁ।”
”তোমার কাছ থেকে তা হলে ট্রিমার দেখা যাবে।”
”চেষ্টা করব। আপনি কাল মাঠে যাচ্ছেন?”
”না। কাল সকালেই কলকাতায় যেতে হবে। মাঠে যাবে গুনগুন। ট্যুর ফিকশ্চার কাগজে বেরনো মাত্রই টিকিটের কথা বলে রেখেছে।”
”আপনারা?”
”অতক্ষণ মাঠে বসে থাকতে ভাল লাগে না। কই চিকেন নিলে না যে?”
”না কাকিমা, কপিটা এত সুন্দর রান্না হয়েছে, এটা দিয়েই খাওয়া সারব। নিরামিষ আমার ভাল লাগে।” এই বলে সে ভ্রমরার দিকে তাকাল।
”বাবার কমপ্লিমেন্টারিটা রয়েছে। তবে এখনও ঠিক করিনি, মাঠে গিয়ে দেখব না টিভি—তে দেখব।”
”আর একটা বলুন না।” সিদ্ধার্থ মিনতি জানাল। স্কুলে তাক লাগিয়ে দেবার জন্য সে কুইজ সংগ্রহ করতে চায়।
অনন্ত কয়েক মুহূর্ত ভেবে নিয়ে বলল, ”আনলাকি থার্টিনের মতোই অপয়া হিসেবে ক্রিকেটে ১১১ সংখ্যাটাকে নেলসন বলা হয়। নেলসন কেন?”
টেবলে সবাই কৌতূহলী চোখে অনন্তর দিকে তাকাল। সে জানতই প্রশ্নটার উত্তর সিদ্ধার্থ দিতে পারবে না। ভ্রমরার দিকে তাকিয়ে বলল, ”আপনি? ক্রিকেট না জানলেও এটা পারা যাবে।”
মুখটা লাল হয়ে গেল ভ্রমরার। মাথা নাড়ল।
”নেলসন হলেন বিখ্যাত ইংরেজ অ্যাডমিরাল নেলসন। ইংরেজদের মধ্যে একটা ধারণা চালু আছে যে, তাঁর একটা হাত, একটা পা আর একটা চোখ নষ্ট হয়ে গেছল। এক এক এক, নুলো, খোঁড়া, কানা—সুতরাং ১১১ সংখ্যাটা অপয়া। কোনও ব্যাটসম্যানের কিংবা দলের স্কোর ১১১ হলেই নেলসন হয়েছে বলা হয়। মজার কথা, নেলসন একটা চোখ আর একটা হাত হারিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু পা দুটো আস্তই ছিল।”
”আমি কি প্রশ্ন করতে পারি? ক্রিকেট না জানলেও পারা যাবে।”
ভ্রমরার কথার সুরেই অনন্ত বুঝল শোধ নিতে চাইছে এবং এমন প্রশ্ন করবে যার জবাব দেওয়া তার পক্ষে সম্ভব হবে না।
”বলুন।”
”কোন বছর থেকে ভারতে রবিবারটা ছুটির দিন হিসেবে চালু হয়েছে?”
”স্টাম্পড হয়ে গেছি।”
”আঠারোশো তেতাল্লিশ থেকে। আচ্ছা বলুন, আমেরিকার প্রেসিডেন্টের মাইনে কত?”
”বোল্ড আউট।”
”বছরে দু’ লক্ষ ডলার। এবার বলুন, স্যাটেলাইট থেকে ইন্ডিয়ান স্ট্যান্ডার্ড টাইম সিগন্যাল সার্ভিস ব্রডকাস্ট করে ভারত এ ব্যাপারে পৃথিবীতে দ্বিতীয় দেশ হিসাবে গণ্য হয়েছে। প্রথম দেশটা কে?”
”রান আউট হলাম।”
”আমেরিকা। ভারতের এই স্যাটেলাইটের নাম কী?”
”ব্যাট প্যাড ক্যাচ আউট।”
”ইনস্যাট ওয়ান বি। আচ্ছা আর একটা, এটা খেলারই প্রশ্ন, পারা উচিত।” ভ্রমরা খুব মন দিয়ে চাটনি মাখানো আঙুল চুষতে—চুষতে বলল, ”কোন খেলায় বিজয়ী দলকে সামনে না গিয়ে পিছনে যেতে হয়?”
অনন্ত ভাবতে শুরু করল এবং কূলকিনারা না পেয়ে ভ্রমরার দিকে তাকিয়ে বোকার মতো হাসল।
”এবার কী আউট?”
”টাইমড আউট। সত্যিই তো, পিছনে গেলে জিতবে এমন খেলা…!”
”রোইং আর টাগ অব ওয়ার।”
”আমি একটা গর্দভ।”
”আরও করব?”
”না না না, এবার ইনিংস ডিক্লেয়ার করুন, আর ফিল্ডিং খাটতে পারছি না।”
.
গাড়ি চালিয়ে ভ্রমরা পৌঁছে দিচ্ছিল অনন্তকে। পিছনে সিদ্ধার্থ।
”আপনি রেগে গেছলেন।”
”ওইটুকু ছেলে অত শক্ত—শক্ত প্রশ্নের কি উত্তর দিতে পারে? আর ‘ক্রিকেট না জানলেও পারা যাবে’ বললেন কেন? কোটি কোটি কুইজ প্রশ্ন হয়, সবাই কি উত্তর দিতে পারে?”
অনন্ত চুপ করে রইল। পিছন থেকে ঝুঁকে সিদ্ধার্থ বলল, ”আমাকে আরও গোটাকতক কুইজ দেবেন?”
”দোব। পরে।”
