”একটা বাংলা খবরের কাগজে আপনার সম্পর্কে লেখা হয়েছে। গুনগুন সেটা পড়েছে। এই যে আমার ভাই, ইনিই গুনগুন।”
”মোটেই আমার নাম গুনগুন নয়। আমার নাম সিদ্ধার্থ।” ছেলেটি বিরক্তিভরে শুধরে দিল।
”ইন্টারভিউয়ে আপনি বাবার সম্পর্কে বলেছেন, অনেক কথা, খুবই ফ্যাসিনেটিং। গুনগুন ওটা পড়েই…” ভ্রমরা আড়চোখে ভাইয়ের মুখ দেখে নিল। ”সিদ্ধার্থ ওটা পড়েই বাবাকে বলল, তোমার বন্ধুর ছেলে এখানে খেলতে আসছে। বাবা বললেন, এলে ওকে একবার নিয়ে আসিস তো, অরুণের ছেলে কেমন হয়েছে দেখার জন্য কৌতূহল হচ্ছে।”
শোনামাত্রই অনন্তর বুক ঢিবঢিব করে উঠল। দেখা মানেই তো বাবার সঙ্গে তুলনা করবেন, অবশ্য মনে মনেই। আর নিশ্চয়ই বলবেন, ”নাহ বাপের নখের যুগ্যিও নয়।”
হঠাৎ ঘরের দরজাটা খুলে গেল। নিরঞ্জন ঘরে ঢুকে ওদের দেখেই, ”ওহ, সরি।” বলেই ঘর থেকে দ্রুত বেরিয়ে গেল।
অনন্ত অপ্রতিভ বোধ করল এইভাবে নিরঞ্জনের বেরিয়ে যাওয়ায়। নিশ্চয় ও ভেবে নিয়েছে কোনও ফ্যান বা বান্ধবীর সঙ্গে কথা বলছি, তাই এই সময় ঘরে থাকা উচিত নয়। কিন্তু সে এমন কিছু নামী নয় যে তার ভক্ত তৈরি হবে।
”বাবা আপনাকে একবার যেতে বলেছেন, মাও বলেছেন।”
”কিন্তু…” অনন্ত দ্বিধায় পড়ল। ভ্রমরা তার থেকে বছর তিনচারের ছোটই হবে। শালোয়ার—কামিজের উপর জড়ানো রোঁয়া তোলা পশমের চাদর। গায়ের রং উজ্জ্বল শ্যাম, মাঝারি উচ্চতা, মুখের গড়ন পানের মতো এবং শক্তসবল। চোখ দুটি ঝকঝকে ও চঞ্চল। চুল ছেলেদের মতো ছাঁটা। টিকলো নাক, মোটা ভ্রূ, হাতে ঘড়ি ছাড়া কোনও গহনা নেই। প্রসাধনের চিহ্ন নেই কোথাও। খুবই ঘরোয়া এবং মার্জিত ওর ব্যবহার।
”কিন্তু কী? যেতে কোনও অসুবিধা আছে? অবশ্য কাল খেলা শুরু হচ্ছে সেজন্য হয়তো…” ভ্রমরা থেমে গেল। অনন্ত জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল।
”শুনেছি খেলার আগে কনসেনট্রেট করার জন্য প্লেয়াররা নাকি নির্জনতা চায়?”
অনন্ত হেসে উঠল।
”বরং গল্পগুজব হইচই পেলে বেঁচে যাই। টেনশনটা থেকে নিজেকে বার করার জন্য অনেকক্ষণ চেষ্টা করছি, আর আপনি তখনই কিনা এঞ্জেলের মতোই বাড়িতে যাবার প্রস্তাবটা নিয়ে এলেন। কিন্তু কথাটা হল, ম্যানেজারের একটা পারমিশন নেওয়া উচিত।
বেড—কভার সরিয়ে অনন্ত খাট থেকে নামল। ভ্রমরা তাড়াতাড়ি খেলার ম্যাগাজিনটা তুলে মাথা ঝুঁকিয়ে পাতা ওলটাতে শুরু করল। অনন্ত জিনসটা নিয়ে ওদের পিছনে গিয়ে চট করে পরে ফেলে, আয়নায় একবার মুখটা দেখে নিল।
”আমি আসছি।”
দোতলায় ম্যানেজার ভবেন মহান্তি তাঁর ঘরে কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলছিলেন। কথার টুকরো কানে যেতেই অনন্ত বুঝল কমপ্লিমেন্টারি টিকিটের জন্য ধরাধরি চলছে। ভবেনদা মৃদুভাষী, ভালমানুষ। অনুমতি দিয়ে বললেন, ”শুধু মনে রেখো, কাল হান্ড্রেড পারসেন্ট ফিট অবস্থায় মাঠে নামতে হবে।”
”নামব। কিন্তু প্লেয়াররা কি তাদের গেস্টদের খেলা দেখাতে পারবে না?”
ভবেনদা বিব্রত হলেন। ঘরের লোকদের দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে বললেন, ”পরে কথা বোলো। এখন কোনও টিকিট আমার কাছে নেই।”
অনন্ত নীচে ঘরে এসে বলল, ”চলুন যাওয়া যাক। একটা কথা, আমি কিন্তু তাড়াতাড়ি ফিরতে চাই, ন’টার মধ্যে হলে ভাল হয়।”
”আমি পৌঁছে দিয়ে যাব।” ভ্রমরা উঠে দাঁড়াল। ”বাবাও বলেছিলেন, খেলার সময় আর্লি শুতে যাওয়া দরকার।”
বাইরে একটা ফিয়াট দাঁড়িয়ে। ড্রাইভারের পাশের সিটের দরজাটা খুলে ধরেছে ভ্রমরা। অনন্ত উঠে পড়ল, ভ্রমরা গাড়িটা ঘুরে গিয়ে ড্রাইভারের সিটে বসল। পিছনে উঠল সিদ্ধার্থ।
প্রণাম করে দাঁড়াতেই ভ্রমরার মা মৃণাল প্রথমেই বললেন, ”কী লম্বা!”
”বাবার মতোই।” সিদ্ধেশ্বর বললেন।
তিনি অনন্তকে দেখামাত্রই স্মৃতিভারে বিহ্বল হয়ে পড়েছিলেন, সেটা এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেননি। কলেজের দিনগুলোকে যেন ফিরে পেয়েছেন অনন্তকে উপলক্ষ করে। তিনি একাই কথা বলে যেতে লাগলেন। অরুণ সেনের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্বের নানান গল্প শুনতে—শুনতে অনন্ত হালকা বোধ করতে লাগল। সিদ্ধেশ্বরকে তার দিলখোলা, প্রাণবন্ত, ব্যক্তিত্ববান মনে হল আর মৃণালকে আটপৌরে, ঘরোয়া। সে কয়েক মিনিটেই স্বচ্ছন্দ হয়ে হয়ে পড়ল।
”বাবা একদিন বলেছিলেন, লাখ টাকা আমার দরকার নেই, কিন্তু আমার ভীষণ দরকার নিজেকে নিজের ভাল—লাগা।”
সিদ্ধেশ্বরের তাই শুনে উজ্জ্বল চোখে স্ত্রী, কন্যা ও পুত্রের দিকে তাকিয়ে চাপা গর্বভরে বললেন, ”শুনলে! যা বলতাম অরুণ সম্পর্কে এইবার মিলিয়ে নাও।”
”খুব শক্ত ব্যাপার।” ভ্রমরা বলল। ”নিজেকে ভাল—লাগা, নিজেকে শ্রদ্ধা—করা, অত্যন্ত ক্লিন না হলে তা করা সম্ভব নয়।”
”আদর্শের জিনিসমাত্রই উঁচুতে থাকে। পৌঁছানো অসম্ভব বলে মনে হয়। কিন্তু তাই বলে তো পিছিয়ে যাওয়া যায় না। চেষ্টা করতে হবে পৌঁছতে, আর সেটা একটা লড়াইয়ের মতোই ব্যাপার। নিজের সঙ্গে নিজের লড়াই, তাই না কাকাবাবু?” অনন্ত তাকাল সিদ্ধেশ্বরের দিকে।
”শুধু নিজের সঙ্গেই নয়, অন্যের সঙ্গে লড়ে এবং জিতে নিজেকে ভাল—লাগাতে হয়। তুমি যদি এই ম্যাচটায় দারুণ খেলতে পারো তা হলে দেখবে, তোমার বাবার কথাটাই সত্যি হয়ে উঠবে।”
”অনন্ত, তুমি কিন্তু খেয়ে যেও।” মৃণালের এই অনুরোধটা যে আসবে অনন্ত তা ধরেই নিয়েছিল। সে মাথা নেড়ে বলল, ”খুব অল্প কিন্তু।”
