”দাদা, একটা জিনিস টিভিতে লক্ষ করেছেন কি উইকেটগুলো কী ভাবে থ্রো করে গেল? এই ভাবে ম্যাচ হারা?”
”এবার বোর্ডের উচিত পুরো টিমটাকে বাতিল করা, একেবারে ফ্রেশ ব্লাড আনা। এরা তো হারছেই, ওরাও নয় হারবে, একই ব্যাপার। তবু আবর্জনাগুলো তো বিদেয় হবে। আমাদের ছেলেদের সামনে কী দৃষ্টান্ত ওরা রাখছে বলুন?”
”বোর্ড বোধহয় এবার কিছু একটা করবে।”
”ছাই করবে মশাই, এরাই কলকাতায় থার্ড টেস্টে খেলবে। আজ রাতেই টিম অ্যানাউন্সড হবে। মিলিয়ে নেবেন যা বললাম।”
”কাপুরকে বসিয়ে অনন্ত সেনকে কলকাতায় খেলানো উচিত। ছেলেটা খারাপ ব্যাটও করে না।”
”আরে দাদা, খেলাবার ইচ্ছে থাকলে এই আন্ডার টোয়েন্টিফাইভের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার ম্যাচেই ওকে খেলাত। জামশেদপুরে এখন ইস্ট জোনের সঙ্গে ম্যাচটায় যদি ও কিছু করে, তা হলে একটা চান্স আছে।”
কথাটা যিনি বললেন, বছর পঁয়ত্রিশের একজন, বোধহয় অফিস থেকে ফিরছেন। আগে হয়তো মাঠে যেতেন এখন কাগজ পড়ে খেলার খবর রাখেন। অনন্তর এটা মনে হল এইজন্যই যে, লোকটির সঙ্গে তার চোখাচোখি হল এবং তাকে চিনতে পারল না। বস্তুত বাসের কেউই তাকে চিনল না। তবে মনে—মনে সে বলল, ‘জামসেদপুরের ম্যাচটায় আমি নিজেকে চেনাব।’
.
।। সাত ।।
জামশেদপুরে টাটা গেস্ট—হাউসে রাখা হয়েছে পূর্বাঞ্চল দলকে। একতলায় একটা ঘরে অনন্ত আর উইকেটকিপার তরুণ মল্লিক।
”অন্তু, আমি বেরোচ্ছি। খোঁজ করলে বলিস ন’টার মধ্যেই ফিরব।”
বালিশে ঠেস দিয়ে পা ছড়িয়ে অনন্ত হাওড়া স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে কেনা ইংরেজি একটা খেলার সাপ্তাহিক পড়ছিল। দ্বিতীয় টেস্টম্যাচের অনেক ছবি আর খেলার রিপোর্ট রয়েছে।
”খেয়েদেয়ে ফিরবে?”
”দিদির বাড়ি গেলে কি কেউ না খেয়ে ফেরে?”
তরুণ বেরিয়ে যাচ্ছে, তখন অনন্ত ডাকল, ”তরুণদা, উইকেট তো দেখলে, কী মনে হল?”
”এখন কিছু ঘাস রয়েছে, কিন্তু কাল মাঠে গিয়ে দেখবি চেঁছে ন্যাড়া করে দিয়েছে। ফাস্ট বোলারদের, মানে ভিজিটিং টিমের ফাস্ট বোলারদের ভয়ে তিরিশ বছর ধরে আমাদের দেশে এটাই চলে আসছে। এখানেও তাই হবে। কাল সকালে ঘণ্টাখানেক একটু লাইফ থাকবে তারপর পেসার, স্পিনার কেউই হেলপ পাবে না। আমার কাজটা একটু কমল।”
”কেন?”
”বলই তো পাব না। ওরা কি একটাও বল ছেড়ে দেবে ভেবেছিস?”
তরুণ ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার পর অনন্ত ম্যাগাজিনটা বন্ধ করে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে শুয়ে রইল। মনটা তরুণের কথায় দমে গেল। উইকেট দেখে তারও মনে হয়েছে বোলাররা সাহায্য পাবে না। তবু ভরসা পাবার জন্য তরুণকে জিজ্ঞাসা করেছিল যদি আশাপ্রদ কিছু শোনা যায়। কিন্তু শোনা গেল না।
দরজায় খুট খুট শব্দ হল। আবার কে এল? পাশের ঘরে রয়েছে ওড়িশার নিরঞ্জন লেঙ্কা আর স্বরাজ দাস কিছুক্ষণ আগে নিরঞ্জন এসেছিল বাড়ির তৈরি জিবেগজা নিয়ে। ভাল লেংথে মিডিয়াম পেসে দুটো সুইংই করায়। অনন্তর জুড়ি হয়ে বোলিং ওপেন করবে। তারপর উঁকি দিয়েছিল বলাই চন্দ, চিউইংগাম পাওয়া যাবে কি না খোঁজ নিতে।
”কাম ইন।” অনন্ত বিছানায় শোওয়া অবস্থাতেই চেঁচিয়ে বলল।
ধীরে—ধীরে, বেশ কুণ্ঠিতভাবেই দরজার পাল্লাটা খুলে যে ঢুকল, তাকে দেখেই অনন্ত ধড়মড়িয়ে উঠে বসল। একটি মেয়ে, তার পিছনে একটি বছর বারোর ছেলে।
অনন্তর পরনে একটা টি শার্ট আর শর্টস। মাসটা ডিসেম্বর হলেও ঘরের ভিতর দরজা—জানলা বন্ধ থাকায় ঠাণ্ডা প্রায় নেইই। তার প্রথমেই মনে হল, পা দু’টিতে আবরণ দেওয়া উচিত। পায়ের কাছে বেড—কভারটা পড়ে, সে টেনে পা ঢেকে ফেলল।
”আচ্ছা অনন্ত সেন কি এই ঘরে রয়েছেন?” ঋজু, স্বচ্ছন্দ, ঝরঝরে স্বর মেয়েটির। বলার এবং দাঁড়াবার ভঙ্গিতে জড়তা নেই।
”হ্যাঁ।” একটা শব্দ মুখ থেকে বার করতে গিয়েও অনন্ত প্রায় ঢোঁক গিলল। মা আর বয়স্ক কয়েকজন ছাড়া কখনও কোনও মেয়ের সঙ্গে সে কথা বলেনি, তার এই বাইশ বছর বয়স পর্যন্ত।
”বাইরে গেছেন কি?”
”না।” অনন্ত ঘাবড়ে গেছে। জামশেদপুরের মতো জায়গায়, হঠাৎ একটি অপরিচিত মেয়ে সন্ধ্যাবেলায় ঘরে এসে তার নাম বলে খোঁজ করবে, এটা কল্পনা করার সুযোগ তার জীবনে আসেনি। সুতরাং নার্ভাস সে হতেই পারে।
”উনি এখন কোথায় বলতে পারেন?”
”আ আ আমিই—”
”আপনি!” মেয়েটি হেসে ফেলেই গম্ভীর হল। ”আমাকে আপনি চিনবেন না, স্বাভাবিকই সেটা। কেননা আমাদের এই প্রথম দেখা। আমার নাম ভ্রমরা সমাজপতি। আমার বাবা সিদ্ধেশ্বর সমাজপতি, টেলকোয় আছেন। আপনার বাবা অরুণ সেনের কলেজের বন্ধু ছিলেন আমার বাবা।”
”হ্যাঁ হ্যাঁ, বাবার কাছে নাম শুনেছি। উনি তো পরে শিবপুর এঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হন। তারপর বিলেত যান। দাঁড়িয়ে কেন, বসুন।” অনন্ত তরুণের খাটটা দেখিয়ে দিল।
ওরা দুজন বসল। অনন্তর জড়তা এইবার কাটতে শুরু করেছে। কিন্তু নগ্ন পা দুটো বেডকভার থেকে বার করা উচিত হবে কি না বুঝতে পারছে না। ছেলেটি কৌতূহলভরে তাকে লক্ষ করছে।
”আপনার বাবার কথাও আমি বাবার কাছে শুনেছি। এমন দৃঢ়, সৎ আর প্রখর ইন্টলেক্টের মানুষ বাবা কখনও দ্যাখেননি। চাকরি যদি না ছাড়তেন, তা হলে এখন বছরে দু’ লক্ষ টাকা মাইনেতে থাকতেন।”
শুনে খুব ভাল লাগল অনন্তর। বুকের মধ্যে বাতাস জমে উঠে বুকটা যেন ফুলে উঠল। বাবার জন্য গর্ব করার সুযোগ সে পায় না। যাদের সঙ্গে তার মেলামেশা, একমাত্র জীবন ছাড়া, তারা কেউই বুঝবে না অরুণ সেন কী ধরনের মানুষ ছিলেন। হঠাৎ এখন একটি অপরিচিত মেয়ে, যে চোখেও দ্যাখেনি অরুণ সেনকে, শ্রদ্ধার সঙ্গে বাবার কথা বলায় অনন্ত মনে—মনে কৃতজ্ঞ হয়ে উঠল।
