অনন্ত নির্নিমেষে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, ”আশ্চর্য, তোমার মধ্যে আমি বাবাকে দেখত পাচ্ছি!”
.
কানপুরে দ্বিতীয় টেস্ট ম্যাচে ভারত ইনিংস ও ৪১ রানে হারল। মন্থর উইকেট, বাউন্সও সমান ছিল। অস্ট্রেলিয়া দিল্লি টেস্টের দলটিকেই খেলিয়েছে, শুধু প্রিধামের জায়গায় এসেছে আরউইন। ভারতের ভোজানির জায়গায় খেলেছে বেঙ্কটরঙ্গন।
বোলান টস জিতে দ্বিধা করেনি ব্যাটিং সিদ্ধান্ত নিতে। ম্যাচের প্রথম ওভার থেকে তারা ভারতীয় বোলিংয়ের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। প্রথম দিনে তিন উইকেটে ৩১৮। রজার্স ১২১, বোলান ১০১, আরউইন ৭৯ নট আউট। দুয়ার দুটো, ফরজন্দের একটি উইকেট।
দ্বিতীয় দিন চায়ের সময় অস্ট্রেলিয়া আট উইকেটে ৫৩১ রানে ইনিংস ছেড়ে দেয়। আরউইন ১৮৮ রান আউট। ব্রাইট ৫১ অপরাজিত থাকে। কাপুর একটি, ধারাদ্ধার দুটি ও পুষ্করনা একটি উইকেট আজ পায়। শেষ দেড়—ঘণ্টায় ভারত চার উইকেট হারিয়ে তোলে ৫৬ রান।
তৃতীয় দিনে লাঞ্চের মধ্যে ভারতের প্রথম ইনিংস ১১২ রানে শেষ হয়ে যায়। সর্বোচ্চচ রান ভার্দের ৩৫। লটন অ্যামরোজ আর ব্রাইট, এই তিন প্রেসার উইকেটগুলো ভাগ করে নিয়েছে। ফলো অন করার পর ভারত দিনের শেষে দুই উইকেটে ১৭৬। উসমানি আগের ম্যাচের ফর্মেরই জের টেনে ৮৭ নট আউট, ভার্দেও অপরাজিত ৪২ রানে।
চতুর্থ দিনে তিরিশ বল খেলে উসমানি তার দ্বিতীয় টেস্টেই সেঞ্চুরি পেল লটনকে হুক করে বাউন্ডারিতে পাঠিয়ে। টিভি ক্লোজআপে দেখা গেল, মুখে একবার তৃপ্তির ছায়া ফুটে উঠেই, এটা খুব বড় ব্যাপার নয় এমন ধরনের নৈর্ব্যক্তিক গাম্ভীর্য ছড়িয়ে পড়ল। ভার্দে এগিয়ে এসে ওর পিঠ চাপড়াতেই ঠোঁট মুচড়ে একটু হাসল। লটনের পরের বলেই উসমানি ইয়র্কড। ফিরে আসার সময় ওর মুখে নিজের অক্ষমতার জন্য যেন ও নিজেকেই ঘৃণা করছে, এমন একটা যন্ত্রণায় মোচড়ান রাগ ফুটে উঠে টিভি স্ক্রিনকেও গরম করে দিল।
অনন্ত ”আহ” বলে চেঁচিয়ে উঠেছিল, যখন উসমানির ব্যাটের তলা দিয়ে বলটা গলে যায়। তার মনে হয়েছিল সেঞ্চুরি পাওয়ার মুখে মনোনিবেশে চিড় ধরে যাওয়ার জন্য নয়, উসমানি আসলে এই ধরনের বল খেলতেই পারে না। বহু ভাল ব্যাটসম্যানেরই অভাবিত ছোটখাটো ব্যাটিং দুর্বলতা থাকে। বোধহয় অস্ট্রেলিয়ানরা উসমানির বর্মের এই ছেঁদাটা আবিষ্কার করে ফেলেছে। অনুশীলন করে এই ত্রুটিটা কাটিয়ে ওঠা যায়। এটা অনুমান—ক্ষমতা আর রিফ্লেক্সের ব্যাপার। এমন ধরনের বলে ওর প্র্যাকটিস নেওয়া উচিত।
ভার্দে আউট হল ৯২ রানে। কাপুর মিড উইকেটে বল ঠেলে অর্ধেক পিচ পর্যন্ত ছুটে গিয়েও ফিরে আসে। ভার্দে তখন মাঝপথে। ফিরে যাওয়ার চেষ্টায় মরিয়া হয়ে সে বোলার প্রান্তের ক্রিজে ঝাঁপিয়েও পড়ে। কিন্তু তার আগেই উইকেট ভেঙে যায় সরাসরি ছোঁড়া বলে। প্রায় দশ সেকেন্ড সে কাপুরের দিকে তাকিয়ে থেকেছিল। আর তার মধ্য দিয়েই অনন্তর মনে হল, ভার্দে তার বইয়ে কাপুর সম্পর্কে মন্তব্য করার খেসারতই যেন দিল। রানটা স্বচ্ছন্দে সম্পূর্ণ করা যেত, যদি কাপুর ফিরে না আসত। কাপুর এরপর এলোপাথাড়ি ব্যাট চালিয়ে ২৫ বলে ৩৬ রান করে ফিরে যায়। তারপর থেকেই আসা আর যাওয়া শুরু হল। ব্যাটসম্যানদের মেরুদণ্ড যেন পিঠ থেকে খুলে নেওয়া হয়েছে। ব্যাটিংয়ে শৃঙ্খলা নেই, কোনওক্রমে ফিরে যেতে পারলেই যেন বাঁচে! ৩৭৮ রানে দিনের শেষ ওভারে ভারত ভেঙে পড়ল।
ট্রাউজার্সের ট্রায়ালের তারিখ আজই। সন্ধ্যাবেলায় অনন্ত বেরোল শ্যামবাজারে দর্জির দোকানে যাবার জন্য। বাসে আজকের টেস্ট খেলাটি নিয়ে কথাবার্তা হচ্ছে। সে কান পেতে শুনল।
”এই তো বাবুদের খেলার ছিরি! রান করার বদলে শুধু টাকা করার ধান্দা।”
”কত করে পায় বলুন তো?”
”টেস্ট ম্যাচ পিছু চোদ্দ হাজার টাকা, তার মানে দৈনিক আঠাশ শো, বুঝলেন? এই গরিব দেশে এক—একটা জিরোর দাম চোদ্দ হাজার আর এরাই নাকি হিরো। আপনার আমার পরিশ্রমের পয়সাই এদের ব্যাঙ্কে জমা হচ্ছে। বিনিময়ে ওরা দিচ্ছে শুধু লজ্জা আর অপমান।”
”আরে মশাই, এত সাহস এদের, বোর্ড যে চুক্তির ফর্ম দিল, তাতে ইচ্ছেমতো চুক্তি কেটে সই করল। ভেবেছে কী?”
”করবে না কেন। ওরা তো জানে, ওদের বাদ দেওয়ার ক্ষমতা বোর্ডের নেই, দেশে আর প্লেয়ার নেই, টিম হবে কী করে? তাই সাহস পেয়েছে।”
”বাজে কথা রাখুন। দেশে আর প্লেয়ার নেই! দলবাজি করে, পলিটিক্স করে চললে প্লেয়ার পাবে কোত্থেকে? অনেক ভাল—ভাল প্লেয়ার চান্সই পায় না শুধু খুঁটির জোর নেই বলে। এই তো বেঙ্গলে একটা ছেলে রয়েছে কী যেন নাম…”
অনন্ত কাঠ হয়ে রইল নামটা শোনার জন্য। রড—ধরা দুটো হাতের মধ্যে মুখটা চেপে সে অপেক্ষা করতে লাগল।
”অনন্ত সেন।”
অল্পবয়সী কেউ বাসের এক কোণ থেকে চেঁচিয়ে বলল, ”এই দমদমেরই ছেলে। দুর্দান্ত ফাস্ট বোলার, ভারতে এখন ওর ধারেকাছে আসার মতো কেউ নেই। কী স্পিড, কী সুইং, কী কন্ট্রোল, লেংথ আর ডিরেকশনের তো জবাব নেই।”
”হ্যাঁ হ্যাঁ, এই ছেলেটার কথাই বলছি। ভাবুন তো, অল্পবয়সে এখন যদি না চান্স পায়, তা হলে পরে পেয়ে কী খেলা দেখাবে? সুঁটে ব্যানার্জির কথা মনে আছে? কেরিয়ারের একেবারে শেষে একটি মাত্র টেস্ট খেলতে পেলেন। বাঙালি বলেই তো ওকে কোণঠাসা করে রাখা হয়েছিল, আর এত বছর পরও তাই চলছে।”
