.
কলকাতায় পরদিন সে ফিরল সন্ধ্যার ফ্লাইটে। এয়ারপোর্টে গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছিল জীবন। গাড়ি যশোর রোডে পড়ে নাগের বাজারের দিকে এগোতেই জীবন বলল, ”তোকে খেলাল না কেন?”
”বলতে পারব না। এই নিয়ে আমি কাউকে জিজ্ঞাসা করিনি, করে কী লাভ?”
”লাভ—লোকসানের কথা নয়, তবু কারণটা জেনে রাখা ভাল।”
”ইস্ট জোনের সিলেক্টার ওখানে ছিল না। আমার হয়ে কে তা হলে সিলেকশন মিটিংয়ে বলবে? যেসব সিলেকটরেরা ছিল, তারা তো নিজের—নিজের জোনের ছেলেদের টিমে ঢোকাতেই ব্যস্ত। আমার হয়ে কে আর বলবে।”
”হরিহরণ কি ওখানে ছিল?”
”আসবে শুনেছিলাম, কিন্তু আসেনি। উনিই তো আমাকে নিয়ে গেলেন জরুরি ফোন করে।”
”গ্রুপবাজি। সিলেকশন কমিটির চেয়ারম্যান হরিহরণের বিরোধী গ্রুপের, নর্থ আর সেন্ট্রাল জোনও তাই। যদি একটা কিছু ওলটপালট হয়, আর তুই যদি টেস্ট টিমে আসতে চাস, তা হলে ইস্ট জোনের সঙ্গে খেলাটায় তোকে দেখাতেই হবে।”
”কী দেখাতে হবে!”
”তোকে আর ইগনোর করা সম্ভব নয়।”
অনন্ত চুপ করে রইল। কিছুক্ষণ পর জীবন জানতে চাইল, ”লেসলি আর ম্যাড্রফ কেমন বোলার?”
”ভালই। রঞ্জি ট্রফিতে অনেক উইকেট পাবে। কিন্তু এখনও টেস্ট ক্লাস নয়।”
”সে কী! তা হলে এতগুলো উইকেট নিল কী করে?”
”আমাদের ব্যাটসম্যানরাও কি টেস্ট ক্লাসের? একমাত্র উসমানি ছাড়া? ফার্স্ট ইনিংসে ইয়র্কড হয়েছে পেসে। অ্যামরোজের ইনসুইং বলটা ডিপ করল হঠাৎ। কিন্তু সেকেন্ড ইনিংসে কী খেলাটাই না খেলল। স্পিনার দুটো তো বল ফেলার জায়গাই খুঁজে পাচ্ছিল না। এখনও খুব কাঁচা। ভার্দে কি পিল্লাই কি ভোজানির পাল্লায় পড়লে বলের সুতো খুলে দেবে। অথচ কী যে একটা আতঙ্ক আমাদের ব্যাটসম্যানদের মনে ঢুকে গেল আর কাঁপতে—কাঁপতে সবাই লেসলি আর ম্যাড্রফকে উইকেটগুলো দিয়ে দিল। দুটো বিদেশী স্পিনার এসে ভারতের মাটি কাঁপিয়ে দিল, এমন ব্যাপার গত দশ বছরে ঘটেছে বলে শুনেছিস?”
”দুজনকে এই সিরিজেই খেলাবে বোধহয়।”
”মনে হয় না। বোলান অত কাঁচা লোক নয়। এই ধরনের ম্যাচে এক ঝুড়ি উইকেট পেলেই যে টেস্ট খেলার যোগ্য হয়ে গেছে…” অনন্ত কথাটা শেষ না করে চেঁচিয়ে উঠল, ”এই এই এই!”
গাড়ির সামনে এসে পড়েছে এক বৃদ্ধা। ব্রেক কষে জীবন গাড়িটা থামিয়েছে তার এক সেন্টিমিটার আগে। ঘাবড়ে দিশেহারা হয়ে যাওয়া বৃদ্ধা দ্রুত রাস্তাটা পার হল অপর দিক থেকে আসা একটা ট্যাক্সিকে ব্রেক কষিয়ে।
জীবন হেসে উঠল। অনন্ত ভ্রূ কুঁচকে তাকাল ওর মুখের দিকে।
”হাসলি কেন?”
”জীবনটা কী অদ্ভুত! বুড়ির ছিটকে—যাওয়ারই কথা, কিন্তু তার বদলে কেমন দৌড়ে গেল। যার যেমন হওয়ার কথা সে তেমন হল না।”
অনন্তর কেন জানি মনে হল, জীবন যেন নিজের সম্পর্কেই কথাটা বলল। ওর প্রচণ্ড আকাঙ্ক্ষা ছিল টেস্ট ম্যাচ খেলার। কিন্তু সেটা আর কোনওদিনই সম্ভব হবে না। না হওয়ার জন্য দায়ী, একমাত্র দায়ী তো অনন্তই। সে এটা চিরকাল মনে রাখবে আর জীবনও তা নিশ্চয় কোনদিন ভুলতে পারবে না। কথাটা ভাবতে ভাবতে অনন্ত গুম হয়ে গেল।
নাগের বাজার মোড় থেকে গাড়িটা ডান দিকে দমদম রোডে বাঁক নেবার পর জীবন বলল, ”কী ভাবছিস? এত মনমরা দেখাচ্ছে কেন?”
”তুই আমাকে বোধহয় কোনওদিনই ক্ষমা করতে পারবি না।” আচমকাই অনন্তর মুখ থেকে কথাটা বেরিয়ে এল।
”কী বললি?”
”আমি জানি তুই যা হতে চেয়েছিলি আমার জন্যই তা হল না।”
কর্কশ ব্রেকের শব্দ আর ঝাঁকুনি দিয়ে গাড়ি থেমে যেতেই অনন্ত সভয়ে সামনের প্রায়—অন্ধকার রাস্তায় তাকাল। আবার কেউ কি চাপা যাচ্ছিল না কি! কিছু দেখতে না পেয়ে মুখ ঘুরিয়ে জীবনের দিকে তাকাতেই দেখল সে ডান হাতটা তুলে রয়েছে।
”আবার বল।” ঠাণ্ডা ইস্পাতের মতো কঠিন আর শান্ত স্বর জীবনের গলায়। ”আর একবার বল, তা হলেই দেখবি এই হাতটার কেরামতি। একটা ঘা যদি তোর মাথায় দি, তা হলে খুলি ফেটে যাবে।”
কথাটা বলে জীবন গাড়ির ইগনিশান চাবি ঘোরাল। পথে কেউ আর একটি কথাও বলেনি।
রাতে খাওয়ার সময় অনন্ত তার মাকে বলল, ”জীবন আমার ওপর রাগ করেছে। হঠাৎই আমি পথে আসার সময় একটা কথা বলে ফেলেছি।” দু’জনের মধ্যে যেসব কথা হয়েছে মাকে জানিয়ে সে বলল, ”আমি কিছুতেই ভুলতে পারছি না মা, ভুলতে পারবও না। আমার মনে হয় জীবনের পক্ষেও তা ভোলা সম্ভব নয়।”
”হ্যাঁ, সম্ভব নয়।” তনিমা একটু বিচলিত হয়ে বললেন। ”কিন্তু জীবন খুব বিচক্ষণ ছেলে, হৃদয়বান। সে এটা বোঝে দুর্ঘটনা যে কোনও সময় যে কোনও মানুষের জীবনে ঘটতে পারে। এটা ইচ্ছাকৃত কেউ ঘটায় না। তবু বিবেকে একটা খচখচানি থেকে যায়। কিছু করার নেই। ও তোকে ভাইয়ের মতো ভালবাসে।”
”জানো মা, সেদিন আমি ওঁর থ্যাঁতলানো ডান হাতটা দেখে চেঁচিয়ে বলেছিলাম, ‘তুই টেস্ট খেলবি, আমি তোকে খেলাব।’ কথাটা মনে পড়লেই বড় কষ্ট হয়। মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে গেলে কী ধরনের অবাস্তব কথাই যে বলতে পারে! অথচ ও আমাকে টেস্ট টিমে দেখার জন্য এতদূর পর্যন্তও কামনা করতে পারে যে, ইন্ডিয়া হেরে যাক!”
”অন্তু তুই যদি অপরাধবোধ থেকে মুক্তি পেতে চাস, তা হলে জীবনের সাধ—ইচ্ছা পূরণ কর ওকে শান্তি দে, ওর বেদনা মুছিয়ে দে।”
”কী ভাবে?”
তনিমা মুখ ফিরিয়ে দেওয়ালে স্বামীর ছবিটার দিকে তাকিয়ে অস্ফুটে বললেন, ”উনি বলে দিতে পারতেন কী ভাবে।” তারপর কয়েক সেকেন্ড নীরব থেকে, ”জীবনই অনন্তর মধ্য দিয়ে খেলবে টেস্ট ম্যাচ। এটাই হবে তোর প্রায়শ্চিত্ত। তুই যদি জিতিস, তোর মধ্য দিয়ে জীবনও জিতবে। অন্তু, তোর বাবা বলতেন, দেহের থেকেও মন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মনের পূর্ণতা দেহের অপূর্ণতাকে ঢেকে দেয়।”
