হাতের বলটা আলতো করে মাটিতে ফেলে দিয়ে অনন্ত সরে গেল।
”কী হল, তুমি বল করবে না?” আনোখা ওকে জিজ্ঞেস করল।
অনন্ত মাথা নাড়ল। তার মনে পড়ল বাবার একটা কথা : ক্রিকেট খেলাটা হল টাইট রোপ ওয়াকিং, পড়ে গেলে অবধারিত মৃত্যু। এখন তাকে দড়ির উপর দিয়ে হাঁটতে হচ্ছে।
”কাঁধে একটা খচখচ ব্যথা লাগছে। বরং ক্যাচ প্র্যাকটিস করি।”
আনোখা মুচকি হেসে বলল, ”এখানে মিছিমিছিই তোমাকে ডেকে এনেছে।”
”তাই মনে হচ্ছে।”
”মনে হচ্ছে নয়, যা বলছি শুনে নাও। টিম হয়েই আছে, তুমি তাতে নেই। আমার জোনের সিলেক্টর আজ সকালেই আমাকে বলে দিয়েছে।”
আনোখার কথা মিলে গেল। অনন্ত দ্বাদশব্যক্তি পর্যন্তও নয়, তিনজন অতিরিক্তের অন্যতম মাত্র। বোলানের অনুপস্থিতিতে মিন্টার। টস জিতে ব্যাট নেয়। প্রথম ছয় ওভারেই আনোখা তিনটি উইকেট নিয়ে অস্ট্রেলিয়াকে ঝাঁকিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু তারপর দিনের শেষে তারা ৩৭০ রানে পৌঁছয় আর একটিও উইকেট না হারিয়ে। পরদিন সকালেই বিল টুমি আর চার্লস কনরাড নিজেদের ডাবল সেঞ্চুরি পূর্ণ করে নেয়। তিন উইকেটে ৪৬০ রানে ইনিংস ছেড়ে দিয়ে লাঞ্চের আগে অস্ট্রেলিয়া একটা উইকেট পেয়ে যায় এবং সেটি উসমানির। সামিয়ানার তলায় চেয়ারে বসেছিল অনন্ত। তার পাশ দিয়েই উসমানি ফিরে আসার সময় পলকের জন্য দু’জনের চোখাচোখি হল। একই সঙ্গে দু’জনে চোখ সরিয়ে নিল। উসমানি ইয়র্কড হয়েছে একটিও রান না করে।
তিন ঘণ্টায় ১১৪ রানে পঁচিশের কম বয়সীরা প্রথম ইনিংস শেষ করে। চায়নাম্যান বোলার লেসলি ছ’টা আর অফ—স্পিনার ম্যাড্রফ চারটে উইকেট নিয়েছে। ওরা এখনও একটাও টেস্ট খেলেনি। অনন্ত অবাক হল, ব্যাটিং প্র্যাকটিস নেবার বদলে মিন্টারের ফলো অন করাবার সিদ্ধান্ত নেওয়ায়। একটা টেস্টম্যাচের আগে সাধারণত এই সুযোগটা সবাই নেয়। কিন্তু পরদিন সকালে সে খবরের কাগজে মিন্টারের ইন্টারভিউ থেকে জানল তাঁর দুজন সম্ভাবনাময় তরুণ স্পিনার যাতে তাড়াতাড়ি টেস্টদলে আসতে পারে, তাই ওদের আরও বেশি অভিজ্ঞতা ও সাফল্য পাইয়ে উৎসাহিত করার জন্য ব্যাট করেননি। এই সিরিজেই ওদের তিনি টেস্ট খেলাতে চান। কাগজটা আনোখাকে দিয়ে সে বলল, ”এটা পড়ো।”
আনোখা পড়ে বলল, ”আর তোমাকে এরা কী ভাবে ট্রিট করল? সেন, তুমি হেট করো। শুধু ব্যাটম্যানদেরই নয় এদেরও হেট করো। তা হলে তুমি টগবগ করে ফুটবে। বদলা নেবার জন্য অপেক্ষা করো, তারপর সুযোগ এলে এদের ছিঁড়ে ফালিফালি করে দাও।”
”হ্যাঁ, এবার থেকে ঘৃণাই করব।”
অনন্ত কথাটা বলল বটে, কিন্তু মনের অন্তস্থলে তেমন সাড়া পেল না। সে শিশু বয়স থেকে ঘৃণা করতে অভ্যস্ত নয়। বাবা তাকে এই জিনিসটি থেকে দূরে সরিয়ে রেখে শুধু ভালবাসতে শিখিয়ে গেছেন। বলতেন, ট্যালেন্ট, পরিশ্রম আর সাফল্যের জন্য ক্ষুধা, এই তিনটেই বড় হবার দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। অনন্তর মনে হল, বাবাই ঠিক। শুধু ঘৃণা দিয়ে কিছুক্ষণ সাফল্য পাওয়া যায়, পাঁচ ওভার, কি দশ ওভার! কিন্তু একজনের গোটা কেরিয়ার ঘৃণার উপর নির্ভর করে চলতে পারে না।
সে ঠিক করল কলকাতায় ফিরে আরও বেশি খাটবে।
তৃতীয় দিন বিনা উইকেটে সাত রান নিয়ে উসমানি আর শাম্মি সারিন শুরু করল। লাঞ্চের আগের ওভারে সারিন ম্যাড্রফের বলে স্টাম্পড হল ৩৮ রান করে। উসমানির তখন আঠারো। এক উইকেটে ৬৪ রান। চায়ের সময় পঁচিশের কম বয়সীদের চার উইকেটে ১২০। চায়ের পর তিন ওভারেই লেসলি সাত বলের ব্যবধানে চারটি উইকেট পায়। উসমানির তখন ৬৮ রান। হাতে দু’টি উইকেট, খেলতে বাকি অন্তত ২৫ ওভার। লেগ স্পিনার জ্যোতি পটেলকে নিয়ে সে তখন ধৈর্যের লড়াই শুরু করল। এগারো নম্বরে ব্যাট করবে আনোখা। অনন্ত তাকে প্লেয়ারস এনক্লোজারে প্যাড পরে চেয়ারে বসে থাকতে না দেখে অবাক হল। এখনই তো পটেল আউট হয়ে ফিরবে আর আনোখাকে নামতে হবে, অথচ ও তৈরি নেই!
অনন্ত উঠে ড্রেসিং রুমে গিয়ে দেখল, লম্বা মাসাজ টেবলে প্যাড পরে তৈরি হওয়া আনোখা চিত হয়ে শুয়ে। বুকে জড়ো করা দুই মুঠি। চোখ বন্ধ।
”দেশি!” অনন্ত ডাকল।
আনোখা চোখ খুলল, ”আউট হয়েছে?”
”না। কিন্তু তুমি এখানে, এভাবে শুয়ে কেন?”
”মাঠের দিকে আর তাকাতে পারছিলাম না। এত টেনশন, তাই পালিয়ে এসেছি।”
”হেট করো, নিজেকে তাতিয়ে তোলো।”
”সেন আমি ব্যাটসম্যানদের হেট করি কিন্তু বোলারদের করি না।”
কথাটা শুনে আর আনোখার করুণ মুখের দিকে তাকিয়ে অনন্তর হাসি পেল। কিন্তু এখন সেটা খুব বেমানান হবে ভেবে মুখ গম্ভীর করে বলল, ”এখন থেকে তা হলে বোলারদেরও হেট করতে শুরু করো। একা—একা থেকো না, টেনশন তাতে আরও বাড়বে। বাইরে এসো।”
বাইরে তখন হাজারকুড়ি লোক দমবন্ধ করে দেখছে, পটেলকে আড়াল করে উসমানি লেগস্পিন, গুগলি আর অফ—স্পিনের সঙ্গে অসাধারণ ফুট—ওয়ার্ক, বিচারবোধ আর টেকনিক সম্বল করে যুদ্ধ করে যাচ্ছে। আম্পায়ররা যখন বেল তুলে নিলেন, পটেল তখন দুই রানে আর উসমানির ৯১। ম্যাচ বাঁচিয়ে দু’জন ফিরে এল।
অনন্ত এগিয়ে গেল। উসমানির ব্যাট তুলে অভিনন্দন নিতে—নিতে এগিয়ে আসছে। চোখাচোখি হল।
”তুমি বড় খেলোয়াড়।” অনন্ত বলল।
”ধন্যবাদ, তবে এখনও ইয়র্কার সামলাতে পারি না।” উসমানি বলল মুখে উচ্ছ্বাস না ফুটিয়ে।
