অনন্ত লাইন দিয়ে বোর্ডিং পাস এবং সুটকেস জমা দেওয়ার কুপনটা সংগ্রহ করার কিছুক্ষণ পরই লাউডস্পিকারে ঘোষণা হল, হায়দরাবাদের যাত্রীরা সিকিউরিটি চেকের জন্য এগোন। পুরুষ ও মেয়েদের জন্য মাত্র একটি করে দরজা। সেখানেও লাইন পড়ে গেছে।
”ওই দ্যাখ অন্তু, তোর থেকে অনেক ছোট।”
লাইনে দাঁড়িয়ে চার—পাঁচ বছরের একটি শিশু। জীবনের দিকে ভর্ৎসনার দৃষ্টিতে অনন্ত তাকাল। পিছনে লাগার একটা অজুহাত জীবন পেয়ে গেছে।
”ভয় কী জিনিস সেটা বোঝার মতো বয়স ওর হয়নি,” অনন্ত বলল।
”তোর বুঝি হয়েছে?”
অনন্ত মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকাল জবাব না দিয়ে। মানুষের সারিটা ধীরে ধীরে এগোচ্ছে। জীবন ওর সঙ্গে—সঙ্গে সিকিউরিটি চেকিংয়ের দরজা পর্যন্ত এল। অনন্ত যখন দরজা দিয়ে ঢুকতে যাবে জীবন তখন বলল, ”অন্তু একটা কথা বলব।”
”বল!”
”একটু নিচু হ, তুই বড্ড লম্বা।”
ছ্যাঁত করে উঠল অনন্তর বুকের মধ্যে। কে যেন তার কলজেটা খামচে ধরল। মোটরের হেড লাইটের আলো…রাস্তার মাঝে ওলটানো আরশোলার মতো স্কুটারটা পড়ে রয়েছে…জীবন বাঁ হাতে ভর দিয়ে নিজেকে ওঠাবার চেষ্টা করছে। …’অন্তু, তুই বড্ড লম্বা, নিচু হ।’ অনন্ত ঝুঁকল। তারপর সেই কথাটা ‘আমার আর টেস্ট খেলা হবে না রে।’ তখন কী কথাটা যেন সে জীবনকে বলেছিল?
”না, নিচু হব না, তুই বল।”
জীবন প্রায় স্বগতোক্তির মতো বলল, ”আমার মন বলছে তুই টেস্ট খেলবি।”
”চলুন, চলুন, লাইনটা দাঁড়িয়ে গেছে।”
পিছন থেকে অধৈর্য কণ্ঠে একজন এইসময় বলে উঠল। অনন্ত দরজা পেরিয়ে ভিতরে ঢুকে গেল। আর একবারও সে পিছন ফিরে তাকাল না। তাকালে দেখতে পেত জীবন তার ডানহাতটা পিছনে লুকিয়ে বাঁ হাত নাড়িয়ে তাকে বিদায় জানাচ্ছে।
.
।। ছয় ।।
পঁচিশ বছরের কম বয়সীরা প্রায় হেরে যাচ্ছিল, যদি না ফলো—অনের পর উসমানি অসাধারণ দৃঢ়তা দেখাত। প্রথম টেস্টের পরই অস্ট্রেলিয়ার টেস্ট দলের সিনিয়র চারজন আগ্রায় তাজমহল দেখে ফিরে, তিনদিন দিল্লিতে কাটিয়ে দ্বিতীয় টেস্টম্যাচ খেলার জন্য কানপুর চলে যায়। হায়দরাবাদের ম্যাচটিকে তারা গুরুত্ব দেয়নি।
হোটেলে চেক—ইন করে অনন্ত রিসেপসনিস্টের কাছে খোঁজ নেয়, কে তার রুম মেট? দেশরাজ আনোখার নাম শুনে সে স্বস্তি বোধ করে। ঘরের চাবি বোর্ডে ঝোলানো নেই, তার মানে ঘরের লোকের কাছে রয়েছে, অর্থাৎ আনোখা ঘরেই আছে।
”আরে ইয়ার, তুম আ গয়ে!”
অনন্তকে ঘরে ঢুকতে দেখেই লাফিয়ে উঠল আনোখা। ”অনেকদিন পর দেখা হল, প্রায় একবছর, তাই না?”
”দশমাস।
জানুয়ারিতে চণ্ডীগড়ে পঞ্জাবের সঙ্গে রঞ্জি কোয়ার্টার ফাইনাল খেলায় দু’জনের শেষবার দেখা হয়েছিল। ম্যাচে সাতটা উইকেট অনন্ত পায়। কিন্তু প্রথম ইনিংসে এগিয়ে থাকায় পঞ্জাব জেতে। আনোখা পেয়েছিল এগারো উইকেট।
”চা খাবে?”
”হ্যাঁ।” অনন্ত ঘরের কোণে কাঠের টেবলে তার সুটকেসটা রেখে জিজ্ঞাসা করল, ”কাল সকালেই প্র্যাকটিস?”
”দশটায়।”
আড়াইঘণ্টা প্র্যাকটিস শেষে অধিনায়ক উসমানি জানিয়ে দেয়, আবার চারটের সময় দ্বিতীয় দফা প্র্যাকটিস হবে। এখানে এসে অনন্তর সঙ্গে উসমানির প্রথম দেখা রাতে খাবার টেবলে। শুধু একবার তাকিয়ে ”হ্যালো” বলা ছাড়া উসমানি আর কোনও কথা বলেনি। সকালে লালবাহাদুর শাস্ত্রী স্টেডিয়ামে পি. টি. করার পর যখন নেটে ব্যাটিং প্র্যাকটিস শুরু হল নতুন বল দিয়ে, হঠাৎ উসমানি তখন অনন্তকে বলে, ”তুমি পরে বল কোরো, আগে রেগুলার বোলাররা নতুন বলে বল করুক।”
অনন্ত শুনে আশ্চর্য হয়। সে বলেছিল, ”আমি কি ইরেগুলার নাকি?”
”এগারোজনের টিমে যারা থাকতে পারে তারাই নতুন বল প্রথম ব্যবহার করুক। আমি এটা চাই।”
”যদি একজন বাড়তি লোক বল করেই তাতে ক্ষতিটা কী?”
”অস্ট্রেলিয়ান নিউ বল অ্যাটাক যে ধরনের, আমি সেই ধরনের বলে প্র্যাকটিস করাতে চাই। তোমার বল একটু অন্য রকমের, তুমি একটু পরে বল করতে এসো।”
অনন্তর কাছে যুক্তিটা অদ্ভুত মনে হল। চেয়ারম্যান সমেত চারজন জাতীয় নির্বাচক মাঠে রয়েছেন, যা সাধারণত দেখা যায় না। শোনা গেল, বোর্ড প্রেসিডেন্ট আর সেক্রেটারিও আসবেন। যেন টেস্ট ম্যাচ খেলা হবে এমন একটা ভাব চারদিকে ছড়ানো।
নেটে প্রথম ব্যাট করতে গেল উসমানি। নতুন বল নিয়ে শুরু করল চারজন বোলার। অনন্ত নেটের পিছনে গিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। রাগে তখন তার শরীর জ্বলে যাচ্ছে। একজন নির্বাচক, মধ্যাঞ্চলের মৃদুল শর্মা তাকে দেখে জিজ্ঞাসা করলেন, ”এ কি তুমি বল করছ না যে?” অনন্ত তাকে উসমানির কথাগুলো জানাল। শুনে তিনি মাথা নেড়ে তারিফ করে বললেন, ”হি ইজ এ ব্রেইনি চ্যাপ! কতটা ভাবনা চিন্তা করে দেখেছ? অস্ট্রেলিয়ান অ্যাটাক কীভাবে অবজার্ভ করেছে, অ্যাঁ! আমি বলে দিচ্ছি ও একদিন ইন্ডিয়ার ক্যাপ্টেন হবে, হবেই।”
উসমানি নেট থেকে বেরিয়ে যখন চেয়ারের দিকে যাচ্ছে, তখন অনন্তর সঙ্গে চোখাচোখি হল। অনন্ত দাঁত চেপে বলল, ”এইবার কি বল করতে পারি?”
”তোমার ইচ্ছে।” উসমানি নিস্পৃহ স্বরে বলল।
অনন্ত টানা আধঘণ্টা বল করল। তার অফ কাটারগুলো গুড লেংথ থেকে লাফিয়ে উঠছিল। একজনের বুকে, আর একজনের হেলমেটে লাগার পর, দলের ম্যানেজার অনিল পটবর্ধন তাকে ডেকে বললেন, ”সেন, ওরা ম্যাচ খেলবে, ইনজুরি হলে টিমেরই ক্ষতি। তুমি সোজা ওভারপিচ বল করো অফ স্টাম্পের বাইরে, ওদের শট নিতে দাও।”
