”ভার্দের বইটি এখানে বোমার মতোই ফেটেছে। চারদিকে কানাঘুষো, কিন্তু কেউ কোনও কথা বলতে চাইছেন না। সবার মুখেই চাবি—আঁটা। যাকেই জিজ্ঞাসা করি, বলছেন এখনও পড়ে ওঠা হয়নি। মুখ দেখে অবশ্য বুঝতে অসুবিধা হয় না, ঠিকই পড়েছেন। হয়তো দু’ তিনবারও।
”আভাস পেলাম বোর্ডের তিন—চারজন বড়কর্তা আজ বা কালই শলা—পরামর্শ করতে বসবেন। ভার্দেকে ওরা ম্যাচ শেষ হলেই শো—কজ চিঠি ধরাবেন খবরের কাগজে কলাম লেখার জন্য। সেইসঙ্গে নতুন চুক্তিপত্র আবার খেলোয়াড়দের দিয়ে বলা হবে সই করতে। যেসব শর্ত ওরা কেটে দিয়ে সই করেছিল, সেগুলি এই নতুন চুক্তিপত্রে আবার রাখা হবে। যদি সই করতে ওরা রাজি না হয়, বোর্ড তা হলে এবার চরম ব্যবস্থা নিতে পেছুপা হবে না। মনে হচ্ছে এবার একটা শো—ডাউন হবেই।”
তৃতীয় দিনের শেষে দ্বিতীয় ইনিংসে অস্ট্রেলিয়ার রান দাঁড়াল, দু’জন ওপেনারকে হারিয়ে ৮০। চতুর্থ দিন সকালে ষষ্ঠ ওভারে নাইটওয়াচম্যান গোল্ডি তার ৪০ মিনিটের ইনিংস শেষ করল মাত্র এক রান করে। অস্ট্রেলিয়ার তখন ৯১ রান। তিনটি উইকেটই পেয়েছে ফরজন্দ। কিন্তু টেস্টম্যাচে এগারোটি শূন্য পাওয়া গোল্ডি ৩৮ বল খেলে গেল। উইকেট থেকে ফরজন্দের বল যেভাবে ব্যাটসম্যানদের কাছে আসছে, তাতে অস্ট্রেলিয়ার ধসে পড়ার আশঙ্কা নেই।
বোলান নামল এবং দুই ওভারের মধ্যেই তার ইচ্ছাটা সে জানিয়ে দিল। সেটা হল, লাঞ্চের পর ঘণ্টাখানেকের মধ্যে সে দল নিয়ে হোটেলে রওনা হতে চায়। মিন্টার ৩১ রান করে কাপুরের বলে কভারে ক্যাচ দিয়ে ফিরে যেতে ব্রাইট নামল। বোলানের তখন ১৪; অস্ট্রেলিয়া ১১১—৪। কুড়ি ওভার পর লাঞ্চ। বোলান ৫২, ব্রাইট ৪৪। অস্ট্রেলিয়া তখন জয় থেকে ৭৯ রান দূরে। লাঞ্চের পর চতুর্থ ওভারে ফরজন্দ তার চতুর্থ শিকার পেল ব্রাইটকে। অস্ট্রেলিয়া পাঁচ উইকেটে ২০৩। এরপর উডফোর্ডকে নিয়ে একঘণ্টা পর বোলান ড্রেসিংরুমে ফিরে এল, সঙ্গে অপরাজিত ১০৮ রান। উডফোর্ডও অপরাজিত ১৩। ফরজন্দ এবং পুষ্করনার বোলিংকে স্কুল ম্যাচের স্তরে নামিয়ে দিয়ে ষোলোটি বাউন্ডারি মেরে তিন ঘণ্টায় বোলান তার সেঞ্চুরিটি তুলে নিয়ে যখন দু’হাত আকাশের দিকে তুলে ঝাঁকাল, জীবন তখন বোধহয় বোলানের থেকেও খুশিভরে মন্থরগতিতে কলম চালিয়ে লিখল: ”ম্যাচটা বেরিয়ে গেল। তুই বোধহয় খেলছিস।”
অস্ট্রেলিয়া পাঁচ উইকেটেই জিতল, দেড়দিন হাতে রেখে।
সন্ধ্যার সময় অনন্তর টেলিফোন এল। জীবন রিসিভার তুলে, গলা শুনেই বলল, ”প্লেনের টিকিটটা এনেছিস।”
”হ্যাঁ। ফ্লাইট কাল দুপুরে।”
”আমি তোকে বাড়ি থেকে তুলে এয়ারপোর্টে পৌঁছে দিয়ে আসব। আজকের কাগজ পড়েছিস?”
”ভার্দের বই সম্পর্কে লেখাটা?”
”হ্যাঁ”। একটু সময় দিয়ে জীবন বলল, ”ভারতের ক্রিকেটে যা ঘটেনি, এবার তাই ঘটবে।”
”কী ঘটবে?”
”সেদিন যা বলেছিলাম। সময় ঘনিয়ে এসেছে। ভার্দেকে যদি শো—কজ করে, আর ওকে সামনে রেখে টিম যদি বিদ্রোহ করে, তা হলে বোর্ড চ্যালেঞ্জটা নেবে।”
”বোর্ডের এত সাহস হবে কি?”
”হবে। আজকের রেজাল্টই সাহসটা দেবে। তবে আমার মনে হয়, বোম্বাই আর বাঙ্গালোর টেস্ট পর্যন্ত টানাটানিটা চলবে। কেন চলবে জানিস? এই অস্ট্রেলিয়া টিমের কাছে আরও দুটো টেস্ট ইন্ডিয়া হারবে। হ্যাঁ, হারবে। টিভির একটা সুবিধে কি জানিস, ক্লোজ আপে মুখের ভাব খুঁটিয়ে দেখার সুযোগ করে দেয়। তুই আমাদের প্লেয়ারদের মুখগুলো লক্ষ করেছিস কি?”
”করেছি। মনে হচ্ছিল কেউ খেলতে চায় না।”
”তার কারণ গোটা টিমটাই ডিস্টার্বড। স্পিরিট বলে কোনও জিনিসই নেই। মনে হচ্ছিল সব ভাড়াটে সৈনিক। এরা কোনও টেস্টই এই সিরিজে জিততে পারবে না। এদের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি হওয়ারই শুধু অপেক্ষা। নারায়ণ সরকারকে ফোন করেছিলাম। হরিহরণ ওকে বলেছে, হায়দরাবাদের ম্যাচটা বোর্ডের কাছে খুব ক্রুসিয়াল। তার মানে, বোর্ড প্লেয়ার দেখে নিতে চাইছে রিপ্লেস করার জন্য। তোকে যখন ডেকেছে, আর আমার কোনও সন্দেহ নেই। অন্তু, তুই আর যাকেই নিরাশ করিস, তোর বাবাকে করিস না। উনি প্রাণ ঢেলে দিয়েছিলেন তোকে ক্রিকেটার করে তোলার জন্য। ওঁকে শান্তি দিস।”
জীবন তার দীর্ঘ সংলাপ থামাল। ওধার থেকে কোনও সাড়া নেই। জীবন বারতিনেক ”হ্যাঁলো অন্তু?” বলার পর ঘুম ভেঙে ওঠার মতো ”উঁউ” শব্দ হল।
”কাল পৌনে তিনটেয় তোর ফ্লাইট। আমি একটা থেকে সওয়া একটার মধ্যে পৌঁছচ্ছি।”
অনন্ত ও জীবন দমদম এয়ারপোর্টে পৌঁছল দুটোয়। পথে অনন্ত বলে, ”এই প্লেনে চড়ে যাওয়াটা খুব বাজে ব্যাপার।”
”কেন? কত সময় বাঁচে জানিস? ট্রেনের চব্বিশ ঘণ্টার পথ দু’ঘণ্টায় চলে যায়!”
”তা জানি। কিন্তু আমার কেমন যেন ভয় করে।”
”ভয়?” জীবন এমন কথা অন্তুর মুখে প্রথম শুনছে।
”বুকের মধ্যে কীরকম হয়, কে যেন খামচে ধরে কলজেটা। সিরসির করে সারা শরীর। খালি মনে হয় প্লেনটা যদি পড়ে যায়?”
”ওহহ অন্তু, পুরুষ মানুষের এসব ভয় থাকতে নেই। তুই একাই কি প্লেনে যাচ্ছিস? আরও একশো মানুষ তোর সঙ্গে রয়েছে, বুড়ো—বাচ্চচা…” জীবন বাঁ হাত দিয়ে অন্তুর ঊরুতে চাপড় মারল।
অন্তু সন্তর্পণে আড়চোখে জীবনের বাঁ হাতের দিকে তাকাল। চামড়ার নীচে মোটা তিন—চারটে শিরা। তার মধ্য দিয়ে রক্ত বইছে। ঈষৎ গোলাপি নখ। চমৎকার লম্বা আঙুল। চওড়া কবজি। আর অন্য হাত, যেটা স্টিয়ারিংয়ে, সেখানেও আঙুল, কবজি রয়েছে, কিন্তু…। তার বুকের মধ্যে কলজেটা কে যেন খামচে ধরল। ‘আমার জন্য, আমার জন্য’ মনে মনে সে বলল।
