পারেনি।
তার আগে খবরের কাগজে সংবাদ হল ভার্দের বইয়ের কয়েকটা প্যারাগ্রাফ। তাতে সে এক জায়গায় লিখেছে : ”ক্রিকেটারদের দমিয়ে রাখার, শাসন করার নতুন নতুন উদ্ভাবনী—কৌশল আবিষ্কার করতেই বোর্ডের কর্তারা যাবতীয় শক্তি ও সময় ব্যয় করেন। খেলোয়াড়দের লেখালেখি, লোগো—পড়া এসবে নাকি ক্রিকেটের মর্যাদা ও গুণের হানি হচ্ছে। আসলে লোগো নিয়ে মাথাব্যথার কারণ হল, খেলোয়াড়রা বিশেষ কোনও কোম্পানির লোগো পরলে অন্য স্পনসররা তেমন উৎসাহিত হন না। এতে বোর্ড ও আয়োজক সংস্থাগুলি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে টিভি কর্তৃপক্ষও চাপ সৃষ্টি করে। টেনিসের দিকে একবার তাকান তো আমাদের বোর্ড কর্তারা! উইম্বলডনে খেলোয়াড়রা যে হারে লোগো ব্যবহার করেছেন, তাতে গোটা ব্যাপারটাকে একটা ইন্ডাস্ট্রি বললেও অত্যুক্তি হয় না। টেনিসের জন্য এক নিয়ম, আর ক্রিকেটের জন্য অন্য, এটা কখনওই মেনে নেওয়া যায় না। তা ছাড়া কাউন্টি ক্রিকেটে খেলোয়াড়রা যখন যথেচ্ছ লোগো ব্যবহার করছে, তখন টেস্ট খেলায় কেন তা পারবে না? এই সহজ যুক্তিও বোর্ডের কর্তাদের নিরেট কিন্তু প্যাঁচালো মাথায় ঢোকানো শক্ত। এতে প্রশাসকরা তো ব্যক্তিগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন না। তা হলে খেলোয়াড়দের উপর এই অবিচার চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে কেন?”
চার বছর আগে একবার টেস্ট দল থেকে বাদ পড়ার প্রসঙ্গটি তুলে ভার্দে তার বইয়ে এক জায়গায় লিখেছে : ”আমাদের জাতীয় দল গড়ার জন্য যে লোকগুলি টেবিলে বসে বিজ্ঞ কথাবার্তা বলে, তারা এক একটা ভাঁড় ছাড়া আর কিছু নয়। ওদের সার্কাসে গিয়ে লোক—হাসানোর কাজ নেওয়া উচিত।”
আর এক জায়গায় সে মন্তব্য করেছে : ”দলের অনেক সিনিয়র খেলোয়াড়ই ম্যাচ নিয়ে চিন্তা করার চেয়েও বেশি চিন্তা করে নিজেদের স্বার্থ নিয়ে। কাপুর এবং পিল্লাই কদাচিৎ টিম মিটিংয়ে আসত। মাঠেও এরা আমার সঙ্গে সহযোগিতা করতে আগ্রহী ছিল না। গতবার ইংল্যান্ড সফরে হেডিংলি টেস্টের পঞ্চম দিনে হাতে ছয় উইকেট নিয়ে যখন জিততে ৫৭ রান বাকি, পিল্লাই ও কাপুর যখন বোলিংয়ের মাথায় চড়ে বসেছে, তখনই দু’জন বিস্ময়কর দুটি বাজে স্ট্রোক নিয়ে আউট হয়ে ফিরে আসে। আমরা ১৬ রানে তৃতীয় টেস্ট ম্যাচটি হারি। আমার স্থির বিশ্বাস, ওরা দু’জন যদি অমনভাবে আত্মহত্যা না করত, তা হলে পরের ব্যাটসম্যানরা ঘাবড়ে যেত না। ছয় উইকেটেই ভারত জিতত।”
ইংল্যান্ডে ভার্দে ওই সিরিজেই স্টিফেন রাইফের সঙ্গে মাঠে তর্কাতর্কিতে জড়িয়ে পড়েছিল ওভালে, চতুর্থ টেস্ট ম্যাচের চতুর্থ দিনে। ইংল্যান্ডের রবার্টসনের ব্যাট—প্যাড ক্যাচের আবেদন রাইফ নাকচ করে দিলে, ভার্দে সিলি মিড অন থেকে বোলার ধারাদ্ধারকে লক্ষ করে বলে, ‘বাহ, চমৎকার আম্পায়ারিংই বটে। ভারতীয় ব্যাটসম্যান হলে আঙুলটা ঠিকই উঠে যেত।’ ধারাদ্ধার তখন বলে, ‘বোল্ড না করলে…দের আউট করা যাবে না।’ দু’জনের কথা রাইফের কানে গিয়েছিল। তিনিও ‘ব্লাডি চিটারস, ইউ… ইন্ডিয়ানস’ বলে গালাগাল দেন। ভার্দে লিখেছে, ”তারপর, আর মেজাজ ঠিক রাখা সম্ভব হল না। ভারতীয়দের ‘চিট’ বলাটা আমার কাছে কল্পনাতীত অভিযোগ, স্বপ্নেরও অগোচরে। আমিও পালটা কিছু কথা তাকে বলি। এরপরই ঝড় উঠল। পরদিন সকালে রাইফ জানালেন, ”আমি লিখিতভাবে ক্ষমা না চাইলে তিনি মাঠেই নামবেন না। আমিও বললাম, ”ক্ষমা চাইতে রাজি, যদি রাইফও ক্ষমা চেয়ে চিঠি দেন।” কিন্তু টি সি সি বি তাদের আম্পায়ারের পক্ষই নিল। পঞ্চম দিনের খেলা বন্ধ রইল। ইতোমধ্যে ভারতীয় দলের ম্যানেজার ফোনে যোগাযোগ করলেন ভারতীয় বোর্ড প্রেসিডেন্টের সঙ্গে। দিল্লির সাউথ ব্লকও খোঁজখবর শুরু করল লন্ডনে আমাদের হাই কমিশনারের কাছে। হাই কমিশনার ডেকে পাঠালেন আমাদের ম্যানেজারকে। আমি প্রমাদ গুনলাম। ম্যানেজার ফিরে এলেন মুখ লাল করে। বললেন, ”যে কোনও মূল্যেই হোক, খেলা চালু করতে হবে। দিল্লির বিদেশ দপ্তর থেকে কড়া নির্দেশ এসেছে।” শেষ পর্যন্ত মূল্যটা দিতে হল ভারত—অধিনায়ককেই নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করে। পরদিন সকালে রাইফের হাতে চিঠিটা দিলাম খেলা শুরুর চল্লিশ মিনিট আগে। জবরদস্তি আমাকে দিয়ে এটা করানো হল। ঘটনাটা আমাকে চুরমার করে দেয়। আমি মনে—প্রাণে বোর্ডের সমর্থন চেয়েছিলাম, কিন্তু পাইনি। ভেবেছিলাম মাঠে নামব না, পদত্যাগই করব। কিন্তু এটাও জানি, আমি মাঠে না নামলে দলের একজনও মাঠে নামবে না। সবাই জিদ ধরে সেদিন আমার পিছনে দাঁড়ায়। তারা সবাই একযোগে বিবৃতিও দেয় আমাকে সমর্থন করে। তবু আমি পদত্যাগ না করে মাঠে নামি। না নামলে রাইফেরই নৈতিক জয় হত। খেলাটা শুরু হল এবং বিরক্তিকর ড্র হল। ভেবেছিলাম আমাদের বোর্ড নিশ্চয় কিছু ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু নেয়নি। আমাকে অপমান হজম করতে হল।”
আনন্দবাজারের স্টাফ রিপোর্টার ভার্দের বই থেকে উদ্ধৃতিগুলো দিয়ে মন্তব্য করেছেন, ”ভারতীয় ক্রিকেটারদের এই বিবৃতি নজীরবিহীন ঘটনা তো বটেই, সেইসঙ্গে চুক্তিবিরোধীও। ভারতীয় বোর্ডের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী এটা তাঁরা করতে পারেন না। আর অপমান হজম করার কথা ভার্দে লিখেছেন বটে, কিন্তু হজমটা কোন হজমিবড়ি দিয়ে করানো হল, সেটা আর লেখেননি। ওই ঘটনার দু’দিন পরই বোর্ডের প্রেসিডেন্ট ও কোষাধ্যক্ষ লন্ডনে উড়ে গিয়ে ভারতীয় দলের সঙ্গে বসে কথা বলেন। ঝিমিয়ে—পড়া দলের মনোবল ফেরাতে তাঁরা দলের প্রত্যেককে বাড়তি পাঁচ হাজার টাকা দেবার কথা বলেন, ভার্দেকে পনেরো হাজার টাকা। কয়েকজন খেলোয়াড় টাকা নিতে আপত্তি জানিয়ে বলেছিলেন, ‘এটা তো ঘুষেরই সামিল। আমরা টাকা নয়, সম্মান পুনরুদ্ধার চাই।’ কিন্তু বেশিরভাগের ইচ্ছার কাছে তাঁদের নতি স্বীকার করতে হয়। ভার্দেও পনেরো হাজার টাকা হজম করেন।
