জীবন এটা জানে, ভার্দের ম্যাচ লেখাটা যতই বোকার মতো হোক লোকটা কিন্তু মোটেই তা নয়। আশিটার বেশি টেস্ট খেলেছে সুতরাং খুব ভালই জানে দুশো পঁচিশ রান লিড নেওয়া এই উইকেটে খুবই শক্ত কাজ। কিন্তু এমনভাবে লিখেছে যেন ইচ্ছে করলেই করে ফেলা যায় যদি ভারতের ব্যাটসম্যানদের অ্যাপ্লিকেশনটা আর একটু বেশি হয়।
কিন্তু জীবনকে ধাঁধায় ফেলল যে ব্যাপারটি, সেটি হল, এমন একটা লেখার কি খুবই দরকার আছে, ভারত অধিনায়কের? অতি সাধারণ মানের ম্যাচ—রিপোর্ট যেন। বিপক্ষ অধিনায়করা লিখে চাপ সৃষ্টি করতে পারে যদি তা হলে ভারতের অধিনায়কই বা লিখবে না কেন, এই যুক্তির পক্ষে কোনও সমর্থনই সে ভার্দের লেখায় খুঁজে পেল না। রিচার্ড বোলান কোথায় কোন কাগজে লিখে চাপ সৃষ্টি করেছে কি না জীবন তা এখনও জানে না কিন্তু ভার্দে যে বোর্ডের দিকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিল পার তো ব্যবস্থা নাও—এটা সে এবং সারা দেশই জেনে গেল।
কাগজে আর একটা ছোট্ট খবর তার চোখে পড়ল। বিরতি দিবসে ভার্দের লেখা দ্বিতীয় বইটির আনুষ্ঠানিক বিক্রি শুরু হবে। তাতে নাকি কয়েকজন সহ খেলোয়াড় ও বোর্ড সম্পর্কে তিক্ত কিছু মন্তব্য আছে বলে জানা গেছে।
আজও জীবন টিভি সেটের সামনে কাগজ কলম নিয়ে বসল। তার উৎকণ্ঠা লটন বা ব্রাইটকে নিয়ে নয়, ভারত দ্বিতীয় ইনিংসে দেড়শোর মধ্যে আউট হোক এটাই সে চায়। সারা দেশ হতাশ হোক, বিরক্ত হোক ভার্দের এই দলটা সম্পর্কে। ক্রিকেট বোর্ড বরখাস্ত করুক দলটাকে। তা হলে অন্তুর টেস্ট খেলার সুযোগ আসবে। খুব সহজ ও সরল তার অঙ্কটা। কিন্তু তার আগে হায়দরাবাদী ম্যাচটা ওকে উতরোতে হবে। ওটাই ওর জীবনের বড় ট্রায়াল।
অস্ট্রেলিয়ার ইনিংস শেষ হয়ে গেল ১২৮ রানে। রজার্স ৪৮, নট আউট থেকে গেল। ভারত পিছিয়ে রইল ৫৪ রানে। শেষ উইকেট দুটি নিয়েছে দুয়া। তার বোলিং দাঁড়াল ৫৫ রানে ছয় উইকেট ১৪.১ ওভার বল করে। ওকে সামনে রেখে তালি দিতে—দিতে ভারত দল মাঠ থেকে বেরোল।
ছয় রানের মধ্যেই ড্রেসিংরুমে ফিরে এল পিল্লাই (৫) আর উসমানি (০)। লটনের তৃতীয় ওভারে দুজনই বোল্ড হল ইয়র্ককারে। নবর আর ভার্দে লাঞ্চ পর্যন্ত আর কোনও উইকেট পড়তে দেয়নি। দুই উইকেটে ৬৬। সব থেকে অবাক হবার মত ব্যাপার, উইকেট একেবারে স্বাভাবিক। ফিরোজ শাহ কোটলার চিরন্তন রীতি বজায় রেখে, অলস ঘুমে মগ্ন। কেউ বিশ্বাসই করবে না এই উইকেটেই চব্বিশ ঘণ্টা আগে ভারত লাঞ্চে ছিল সাত উইকেটে ৫৮।
জীবন বিড়বিড় করল, ”ক্রিকেট! কিচ্ছু বলা যায় না। সত্তরেও অল আউট হয়ে যেতে পারে।”
লাঞ্চের পর নবর স্ট্রেট ড্রাইভে তিন রান পেয়ে লটনের পরের বলে গালিতে ক্যাচ দিয়ে ফিরে গেল। ৭৬ বল খেলে ৪০ রান করেছে। ভার্দে তখন ১৮ রানে। তিন ওভার পর পুষ্করনা প্রথম স্লিপে ধরা পড়ল ব্রাইটের বলে। ৮২—৪; ভার্দে ২৬ রানে। ধীরে—ধীরে সে নিজেকে থিতু করছে, ব্যস্ততা নেই। উইকেটের এবং বোলিংয়ের ঝাঁঝ মরে গেছে। বড় রান পাবার গন্ধ পেয়েছে ভার্দে, তা ছাড়া টেস্ট ক্রিকেটে নিজের পাঁচ হাজার রান পূর্ণ করার সম্মানটাও আর দু’কদম দূরে অপেক্ষা করছে। ভার্দেকে এখন আউট করতে হলে অসম্ভব ভাল বল দরকার।
অ্যামরোজকে অফ ড্রাইভে বাউন্ডারিতে পাঠিয়ে ভার্দে ৩৯ রানে পৌঁছে হাততালি পেল। পাঁচ হাজার রান পূর্ণ হল। পরের বলে এক রান নিয়ে সে ভোজানিকে আনল অ্যামরোজের সামনে। ম্যাচের বিবরণ দেওয়া বন্ধ করে বিশেষজ্ঞ লোকটি তখন ভার্দের ব্যাটিংয়ের গুণাবলী জানাতে ব্যস্ত। তার মধ্যেই হঠাৎ চমকে উঠে বললেন, ‘ভোজানির মুখে বল লেগেছে।’
জীবন দেখল, ফিল্ডাররা ছুটে গেছে। ভোজানি মাটিতে শুয়ে। তাকে ঘিরে একটা জটলা। হাত নেড়ে কয়েকজন ডাকছে। ডাক্তার ছুটে গেল, সঙ্গে আরও দু’জন। মুখে রুমাল চেপে ধরে ভোজানিকে মাঠের বাইরে আনা হচ্ছে। বোর্ডে ওর রান তখন ১০। ভারতের ১০৫। এই ম্যাচে আর ব্যাট করতে পারবে কিনা সেটা এখন বলা যাচ্ছে না। তাকে নিয়ে পাঁচজন ভারতীয় মাঠ ছেড়ে এল। কাপুর ব্যাট করতে নামার দু’ওভার পরই চা—এর জন্য বিরতি হল।
ঝড়ের গতিতে কাপুর ৪৪ রান করে এল বি ডব্লু হল। ভার্দে তখন ৬১—তে। দ্বিতীয় ইনিংসে ভারত সেই সময় ১২৪ রানে এগিয়ে। গুপ্তার ব্যাটিং থেকেই বোঝা গেল উইকেট যদি আড়মোড়া না ভাঙে তা হলে দ্বিতীয় ইনিংসে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটসম্যানরা বিপন্ন হবে না। ২১০—৫, দ্বিতীয় দিনের শেষে। ভার্দে দুশো বল খেলে ৭৪, গুপ্তা ১৮। ভারত ১৫৬ রানে এগিয়ে। কমেন্টেটর জানালেন, ভোজানির বাঁ চোখের নীচে সাতটা সেলাই হয়েছে, হাড় ভাঙেনি, কাল বিশ্রাম দিন, পরশু দরকার হলে ব্যাট করবে।
খেলার তৃতীয় দিনে লাঞ্চের এক ঘণ্টা পর ভারতের দ্বিতীয় ৩২৮ রানে শেষ হল। অস্ট্রেলিয়াকে ম্যাচ জিততে হলে ২৭৫ রান তুলতে হবে, সময় আছে দেড়দিন। তারা জিততেও পারে, হারতেও পারে।
ভার্দে সেঞ্চুরি করেছে। ১০২—এ পৌঁছে অ্যামরোজের শট—পিচ বল মিড—উইকেটের হাতে পাঠায় পুল করে। ফেরার সময় ক্যামেরা তার মুখটা কিছুক্ষণ ধরেছিল। জীবনের মনে হল উদ্বেগের ছায়া মুখে পড়েছে। পুলটায় সময়—বিচারে ভুল হয়েছিল। কারণ উইকেট ঝিমিয়ে মন্থর হয়ে গেছে। বলটা প্রত্যাশামতো গতিতে আসেনি, ওঠেওনি। ভার্দের মুখে মনে হল যেন প্রশ্ন : স্পিনাররা কি ২৭৫ রান তোলা ঠেকাতে পারবে?
