এই সময় রাস্তা থেকে একটি লোক চেঁচিয়ে বলল, ”এই যে বাড়িতেই আছিস দেখছি!”
”আরে শচীনদা আপনি, কি ব্যাপার?” অনন্ত এগিয়ে গেল ফটকের দিকে।
”দু’বছর আগে একবার এসেছিলুম আর আজ। জীবনও রয়েছে দেখছি।” শচীনদা নামক টাকমাথা, ঘোর কৃষ্ণবর্ণ, লম্বা লোকটি চাতালে উঠে চেয়ারে বসল। বান্ধব সমিতির সহ সচিব গত পনেরো বছর ধরে।
”আজ নেটে যাসনি?”
”টিভি দেখব বলে আর বেরোইনি। কালও যাব না। খেলাটা দেখতে হবে।”
”খেলাটা জব্বর জমেছে, প্রথম দিনেই আঠারোটা উইকেট। চা খাওয়া।”
অনন্ত বাড়ির ভিতরে গেল। জীবন রাস্তার দিকে তাকিয়ে, দূরে দেখল তনিমা আসছেন। কালো পাড়ের সাদা তাঁতের শাড়ি, বুকের কাছে ধরা চামড়ার ব্যাগ। কালো ফ্রেমের চশমা। ছিপছিপে, দীর্ঘ সমুন্নত দেহের গড়নের মধ্যে অনন্তর আদলটা খুব স্পষ্ট।
”শচীনদা আপনাকে অনেকদিন পর দেখছি।”
”আমিও তোমাকে। সেই অ্যাকসিডেন্টের পর তুমি আর একদিনও ময়দানে পা দাওনি। তিনবছর বোধহয়।” শচীনদা ব্যথিত চোখে জীবনের ডান হাতটার দিকে তাকালেন। অস্ফুটে একবার বললেন, ”কপাল!”
অনন্ত ভিতর থেকে বেরিয়ে এল। ‘কপাল’ প্রসঙ্গটা যাতে না গড়ায় তাই জীবন তাড়াতাড়ি বলল, ”শচীনদা আজ খেলা দেখলেন?”
”দেখব কোত্থেকে, অফিসে কি টিভি আছে?”
”আপনার কি মনে হয় পিচ আন্ডার প্রিপেয়ার্ড না একেবারেই আন প্রিপেয়ার্ড?”
”কে জানে কী করেছে, ওরে অন্তু যে জন্যে আসা, নারানদা কালই তোকে সি এ বি—তে গিয়ে ওর সঙ্গে দেখা করতে বলেছেন, খুব জরুরি। দুপুরে আমাদের টেন্টে লোক দিয়ে বলে পাঠিয়েছেন, তোকে যেন এক্ষুনি, আজকেই জানিয়ে দেওয়া হয়।”
”কী ব্যাপার? কী জন্য?” অনন্তর সঙ্গে—সঙ্গে জীবনও অবাক হয়ে শচীনদার দিকে তাকিয়ে থাকল। নারায়ণ সরকার সি এ বি—এর সেক্রেটারি। রাশভারী লোক। অপ্রয়োজনে কোনও কাজ করেন না। বাজে কথা বলেন না। তনিমা সেই সময় বাড়িতে ঢুকলেন। জীবন দাঁড়িয়ে উঠল।
”মা ভাল আছেন?”
”হ্যাঁ। বলছিলেন আপনি কবে আসবেন?”
”যাব। সময় আগে যেমন ছিল এখন তো ঠিক ততটা পাই না। যাব একদিন।” তনিমা ভিতরে গেলেন। স্বামী মারা যাওয়ার পর আর্থিক অনটনে পড়েছিলেন। সেটা কাটাতে প্রাইভেট কোচিং শুরু করেছেন। দুটি মেয়েকে তাদের বাড়িতে গিয়ে সপ্তাহে দু’দিন পড়ান আর পাঁচটি ছেলেমেয়েকে নিয়ে সন্ধ্যায় এই চাতালেই শতরঞ্চি পেতে বসেন। সপ্তাহে চারদিন। সকালে তিনি অনন্তর পড়ায় সাহায্য করেন। সামনের বছর সে বি—এসসি ডিগ্রি পরীক্ষায় বসবে।
”অন্তু।”
ভিতর থেকে চাপা গলায় এক প্রৌঢ়া ডাকলেন। অনন্ত ভিতরে গেল এবং ট্রে হাতে ফিরল। চায়ের সঙ্গে রয়েছে চানাচুর।
”নারানদা কেন ডেকেছেন, কিছু তো বুঝতে পারছি না।” অনন্ত দু’জনের মুখের দিকে তাকাল।
শ্যামবাজার মোড়ে শচীনদাকে নামিয়ে দিয়ে বাড়ি ফিরেই টেলিফোন ডাইরেক্টরি থেকে নম্বর নিয়ে জীবন ফোন করল নারায়ণ সরকারের বাড়িতে।
”আজ সকালে দিল্লি থেকে হরিহরণ ফোন করেছিল। অনন্তকে অতি অবশ্য হায়দ্রাবাদ যেতে বলেছে। ওখানে আন্ডার টোয়েন্টি ফাইভের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ানদের খেলা এই টেস্টের তিনদিন পর। টেস্ট যেদিন দিল্লিতে শেষ হচ্ছে সেইদিনই অনন্ত যেন হায়দ্রাবাদ পৌঁছয়। প্লেনের টিকিট আজই করিয়ে রেখেছি, কাল এসে যেন নিয়ে যায়।”
”হঠাৎ এমার্জেন্সি কল, ব্যাপার কী? টিম তো সাতদিন আগেই অ্যানাউন্সড হয়ে গেছে, চোদ্দজনে অন্তু নেই। তা হলে? এখন অদলবদল করতে পারে শুধু সিলেকশন কমিটির চেয়ারম্যান, বোর্ড সেক্রেটারির কি সে—ক্ষমতা আছে?’
”আছে কি নেই সে—সব প্রশ্ন এখন অবান্তর। বোর্ড চাইলে সিলেকশন কমিটি আমাকেও খেলাতে পারে। একটা কিছু উদ্দেশ্য নিয়েই অনন্তকে ডেকেছে। কথা বলে মনে হল, বোর্ড কিছু একটা করতে যাচ্ছে। হরিহরণ বারবার বলল, ‘দিস আন্ডার টোয়েন্টি ফাইভ ম্যাচ উইল বি ভেরি—ভেরি ক্রুসিয়াল ফর আস অ্যান্ড অলসো ফর সাম অব দ্য ইয়ং স্টারস। ইফ দে ক্যান কাম আউট উইথ ফ্লাইং কলারস…” এর বেশি আর কিছু বলল না। তবে আমার মনে হয় বোর্ড এবার চরম কোনও ব্যবস্থা নেবে।”
”গোটা টিমটাকে কি স্যাক করবে?”
ওধারে কয়েক সেকেন্ডের নীরবতা জীবনের হৃদপিণ্ডকে টেনে গলার কাছে নিয়ে এল।
”বোধহয়।”
.
।। পাঁচ ।।
প্রথম দিনের খেলা সম্পর্কে ভারত অধিনায়ক ভার্দের বক্তব্য ইন্টারন্যাশনাল ফিচার্সের মাধ্যমে ভারতের কয়েকটি খবরের কাগজে ছাপা হল। শুরুতে বিস্ময় প্রকাশ—পিচের খামখেয়ালির কারণ দর্শাতে না পারার জন্য অসহায়তা জানিয়ে মৃদু সমালোচনা নিজের ব্যাটসমানদের, প্রশংসা লটন ও ব্রাইটকে তারপর ম্যাচে ভারতকে ফিরিয়ে আনতে দুয়া ও কাপুরের চেষ্টার জন্য তাদের কাছে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে, দ্বিতীয় দিন ভারতকে খুব মন দিয়ে ও সাহস ভরে ব্যাট করতে হবে এটা মনে করিয়ে দিয়ে অবশেষে ভার্দে আশা করেছে উইকেটের অবনতি ঘটবে। অস্ট্রেলীয়দের তা হলে স্পিনের মোকাবিলা করতে হবে চতুর্থ ইনিংসে এবং তারা যে ধারাদ্ধার ও পুষ্করনার মতো ওয়ার্লড ক্লাস ল্যাটা স্পিনার ও ফরজন্দের মতো ক্লাসিক অফ স্পিনার সামলাতে হিমসিম খাবে সেটা না বললেও চলে। ভারতের এখন টার্গেট অস্ট্রেলীয় প্রথম ইনিংস দেড়শোর মধ্যে বেঁধে ফেলে কমপক্ষে দুশো পঁচিশ রানে দ্বিতীয় ইনিংসে নিজেদের এগিয়ে দেওয়া। অস্ট্রেলীয়দের এই উইকেটে চতুর্থ ইনিংসে স্পিনাররা দুশো রানের মধ্যে শেষ করে দিতে পারবে।
