জীবন চাতালের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে মিনিটখানেক অপেক্ষা করে বলল, ”আজকের খেলাটা দেখেছিস?”
”প্রথম এক ঘণ্টা, তারপরই লোডশেডিং হল।”
”আজকের রেজাল্ট জানিস?”
পুলি ছেড়ে দিয়ে, দু’হাতের তালু ঘষতে—ঘষতে অনন্ত বলল, ”টি—এর চল্লিশ মিনিট পর কারেন্ট এল। মাঝে কি হল জানি না। তবে স্কোরগুলো জানি। ফ্যান্টাস্টিক ম্যাচ হবে।”
গত সিজনে শিলিগুড়িতে একটা ক্রিকেট টুর্নামেন্টে অনন্ত ফাইনালে খেলতে গেছল সেখানকার এক ক্লাবের পক্ষে। কড়ার ছিল, তাকে একটা সাদা—কালো টিভি সেট দিতে হবে। সে আটটা উইকেট ১১ রানে পায়। বাকি দু’জন রান আউট হয়েছিল। সেটটা দালানে খাবারের টেবলের পাশে রাখা। খবরের সময় এবং বিশেষ কোনও অনুষ্ঠান ছাড়া অন্য সময় সেট বন্ধই থাকে। দায়সারা লঘু ব্যাপার মা ও ছেলের কেউই পছন্দ করে না।
”ম্যাচটাই শুধু নয়, মাঠের বাইরেও কিছু ফ্যান্টাস্টিক ব্যাপার হবে বলে মনে হচ্ছে। তুই আজকের আনন্দবাজারটা পড়েছিস?”
”পড়েছি।”
”তোর কি মনে হয় না, বোর্ডের সঙ্গে প্লেয়ারদের একটা প্রচণ্ড গণ্ডগোল ঘনিয়ে আসছে? একটা এসপার—ওসপার এবারই হয়ে যাবে?”
”পাণিগ্রাহি আর হরিহরণের কথা থেকে তাই—ই যেন মনে হচ্ছে। এই সিরিজেই ওদের ঢিট করব বলেছে যখন, মনে হয় বোর্ড কিছু একটা করবে।”
”কী করবে?” জীবন বাঁ পকেট থেকে লবঙ্গ বার করে দাঁতে কাটল, ”আজ ইন্ডিয়া টিমের যা পারফরম্যান্স তাতে ওদের গায়ে হাত দিতে বোর্ড সাহস পাবে ভেবেছিস?”
”খেলার এখনও চারদিন বাকি।” অনন্ত হাত বাড়াল। ”একটা লবঙ্গ দে।”
”এই উইকেটে খেলা পাঁচদিন যাবে না, থার্ড কি ফোর্থ ডে লাঞ্চ পর্যন্ত, তার বেশি নয়।”
”কে জিতবে?” লবঙ্গটা চিবোতে—চিবোতে অনন্ত তড়াক করে লাফিয়ে উঠে ”ফুলু কোথায় যাচ্ছিস” বলে চাতাল থেকে দৌড়ে নেমে গেল। পাঁচিল দিয়ে একটা সাদা বেড়াল গুটি—গুটি যাচ্ছিল। অনন্ত সেটাকে ধরে নিয়ে এসে চেয়ারে বসল। ফুলুকে কোলে বসিয়ে তার গলা চুলকে দিতে দিতে বলল, ”ম্যাচটা এমন জায়গায় এসে আজ দাঁড়াল, তাতে বলা শক্ত কে জিতবে।”
”আমি চাইছি ইন্ডিয়া হারুক।”
”সে কী? না, না, আমি চাইছি জিতুক।”
”না হারলে বোর্ড কোনও অ্যাকশনই নিতে পারবে না।”
”সেজন্য দেশকে হারতে হবে?”
”একটা টেস্ট হারলে কিছু আসে যায় না। গণ্ডা—গণ্ডা টেস্ট তো আমরা হেরেছি, তার সঙ্গে নয় আর একটা যোগ হবে। কিন্তু তাতে লাভ হবে এই যে, প্লেয়াররা যেরকম ইনডিসিপ্লিনড হয়ে পড়েছে, বোর্ডকে পর্যন্ত জোট বেঁধে শাসাতে শুরু করেছে, সেটা তা হলে বন্ধ করা যাবে। আর এখনই বন্ধ না করলে এর জের পরের জেনারেশনগুলোকেও প্রভাবিত করবে।”
”কিন্তু প্লেয়াররা যা চায় সেটা কি খুব অনায্য?”
”টাকা?”
”হ্যাঁ। তাদের ভাঙিয়ে লক্ষ—লক্ষ নয়, কোটি টাকার উপর বোর্ড তহবিল গড়েছে। অবিরত তাদের দিয়ে টেস্ট ম্যাচ, বছরে তিনটে করে সিরিজ খেলিয়েছে, অসংখ্য ওয়ান ডে ইন্টারন্যাশনাল। মুখের রক্ত তুলে তারা টাকা এনে দিয়েছে বোর্ডকে। জীবন, আগে ক্রিকেটাররা কত বছর ধরে, কটা করে টেস্ট খেলত?”
”এখনকার থেকে বেশি বছর ধরে কিন্তু কম টেস্ট।”
”ব্রাডম্যানের কথা বাদই দিচ্ছি, কুড়ি বছরে মাত্র বাহান্নটা। হ্যামন্ড, উলি হবসদের ফার্স্টক্লাস কেরিয়ার কত বছর ধরে বলত? এক—একজনের প্রায় তিরিশ বছর ধরে। তার মধ্যে হ্যামন্ড পঁচাশিটা, উলি চৌষট্টিটা, হবস একষট্টিটা টেস্ট খেলেছে। আমাদের মার্চেন্ট, মুস্তাক, মাঁকড়, হাজারেরা কত বছরে ক’টা টেস্ট খেলেছে? পঙ্কজ রায় দশ বছরে বিয়াল্লিশটা, ফাড়কর দশ বছরে একত্রিশটা, মাঁকড় বারো বছরে মাত্র চুয়াল্লিশ…”
”হয়েছে, হয়েছে, রেকর্ড চালানো বন্ধ করো। আমি মানছি এখনকার সুপারস্টাররা দশ বছরেই সত্তর—আশিটা টেস্ট, একশোর উপর ওয়ান ডে খেলে নিজেদের জ্বালিয়ে ছাই করে ফেলছে কিন্তু এর সঙ্গে এইসব বিশৃঙ্খলা, নিয়ম ভেঙে ফেলা, ঔদ্ধত্য দেখানোর সম্পর্ক কি? খেলছে বেশি, টাকাও তেমনি বেশি পাচ্ছে। আনন্দবাজারের ওই লেখাটার এক জায়গায় রয়েছে প্লেয়াররা বিদ্রোহ করবে, বোর্ডকে চিঠি দিয়ে তারা জানাবে ভার্দেকে রোজ খবরের কাগজে লিখতে দিতেই হবে নইলে…”
”ব্ল্যাকমেইলিং?”
”তা ছাড়া আর কি!”
”আমি তা মনে করি না।” অনন্ত এই বলে ফুলুকে কোল থেকে নামিয়ে দিল। ছাড়া পেয়ে সে আড়মোড়া ভেঙে ল্যাজ তুলে গদাই লশকরি চালে ভিতরে চলে গেল।
”বোর্ড যদি শোষকের মতো কাজ করে, তার প্রতিবাদ হবে না?” অনন্ত এবার উত্তেজিত গলায় বলল, ”যদি সাহস থাকে বোর্ড এদের বরখাস্ত করছে না কেন?”
”হয়তো সময়ের অপেক্ষায় রয়েছে আর সেই সময়টা বোধহয় ঘনিয়েও আসছে।” জীবন ঝুঁকে পড়ল। গলা নামিয়ে বলল, ”অন্তু তা হলে তোর সুযোগ এলেও আসতে পারে।”
”কী বললি?” ঝাঁকুনি খেয়ে অনন্তর মুখ থেকে কথাটা বেরিয়ে এল। ”আমার সুযোগ কি করে আসবে?”
”সাত—আটজন যদি বাদ পড়ে তা হলে নেক্সট যারা জায়গা নেবার জন্য রয়েছে তাদের মধ্যে তুইও পড়িস। উসমানি আর নবর সই করেছে, ওরা থাকবে। মধ্যপ্রদেশ ছেড়ে উসমানি কর্ণাটকে এসে খুঁটি পেয়েছে হরিহরণকে। দুয়া আর কাপুরের জায়গায় আসবে আনোখা আর তুই। দলিপ ট্রফিতে, ইরানি ট্রফিতে তোর এবারের পারফরম্যান্স যথেষ্ট ভাল। রঞ্জিতে গতবার তোর আটত্রিশটা উইকেট! অন্তু আজ ইন্ডিয়ান বোলাররা যেভাবে হিটব্যাক করেছে তাতে মনে হয়েছে তোর আর আশা নেই টেস্ট খেলার। কিন্তু এখানে আসার পথে মনে হল, আশা এখনও আছে যদি ইন্ডিয়া এই টেস্ট হারে। সেইজন্যই আমি চাই ইন্ডিয়া হারুক।”
