ট্রেনে মাদ্রাজ। সেখানে ট্রেন বদল করে বাঙ্গালোর। দুটো রাত ট্রেনে থাকতে হবে। রওনা হবার দিন সকালে অরুণ সেন ছেলেকে একশোটি টাকা দিয়ে বলেন, ‘ট্রেনে কিছু কিনে খাবে না। তোমার মা যা দিয়েছে তাতে বাঙ্গালোর পর্যন্ত চলে যাবে। ফেরার সময় শুকনো কিছু কিনে নেবে। ট্যাক্সি বা রিকশা ভাড়ার জন্য খরচ করেও হাতে কিছু থাকবে। মনে রেখো তুমি এক্সকার্শনে যাচ্ছ না। অনেক কিছুই তুমি জানো না, অনেক কিছু শেখার বাকি। সেইসব জানার, শেখার সুযোগ এসেছে। সুযোগটা কাজে লাগাও। নিজেকে নিজে ঠেলে তুলতে হবে। বাবা—মা চিরকাল তোমাকে গাইড করবে না। একটা সময় আসবে যখন নিজেকেই নিজে চালনা করতে হবে। ক্রিকেট খেলাটা হল টাইটরোপ ওয়ার্কিং। দুটো পাহাড়ের চুড়োর মাঝে দড়ি—বাঁধা তার উপর দিয়ে হাঁটা। যদি ব্যর্থ হও, পড়ে যাবে। আর পড়লেই, মৃত্যু। সুতরাং তোমাকে সেরা হতেই হবে যদি টেস্ট খেলতে চাও।’
‘চিঠি দিবি তো?’
অনন্ত মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে শুধু হেসেছিল। বাঙ্গালোর থেকে সে চারখানা চিঠি লিখেছিল। শেষ চিঠিতে সে বাবাকে লেখে :
এখানে এসে আমার যে কী উপকার হল সেটা সামনের সিজনেই আমি বুঝিয়ে দিতে পারব। আমার দু—তিনটে ভুল শুধরে নিচ্ছি, বিশেষ করে ফলো থ্রু—র। পুরনো বলেও সুইং করাতে পারি দেখে সবাই অবাক হয়েছে। আমি যখন বললাম, রাতে বাড়ির বাগানে প্র্যাকটিস করি, ওরা তাই শুনে বিশ্বাস করতে পারছিল না। ভিডিও ফিল্মে বড়—বড় বোলারদের অ্যাকসন দেখলাম। লিলি, টমসন, হোল্ডিং, রবার্টস, হ্যাডলি, কপিলদেব, উইলিস। তা ছাড়া ট্রুম্যান আর লিন্ডওয়ালেরও ক্লিপিং দেখেছি।
পরপর দুটো ম্যাচ হল, আমাদের মধ্যেই দুটো টিম করে। দুটোতে আমি তিন আর পাঁচ, মোট আটটা উইকেট নিয়েছি। উসমানি দু’বারই আমার অপোনেন্ট টিমে ছিল। দু’বারই আমার অফ কাটারে স্লিপে ক্যাচ দিয়ে, এল বি ডব্লু হয়ে আউট হয়েছে। ও আমার উপর বেশ চটেছে এজন্য। আমাকে দেখলে মূখ ঘুরিয়ে নিচ্ছে। কিন্তু আমি কী করতে পারি? শুনলাম ও নাকি বলেছে, এরপর কোনও ম্যাচে পেলে আমার বল ছাতু করবে। উসমানির কিন্তু সত্যিই ভাল ব্যাট। স্টাইলিসও। মধ্যপ্রদেশ রঞ্জি টিমে এবারই আসত যদি না আঙুলে ইনজুরি হত। টেস্ট ও খেলবেই।
আর একজন প্রেসারকে আমার ভাল লাগল। পঞ্জাবের দেশরাজ আনোখা। আউট সুইংটা আমার থেকেও ভাল। বলের প্রেস আমারই মতো। ব্যাট করে খুব স্বচ্ছন্দে আর ছয় মারতে ওস্তাদ। টেস্ট টিমে আসার জন্য এর সঙ্গেই আমাকে কমপিট করতে হবে মনে হচ্ছে। এজন্য আমাকে ব্যাটিংয়ের উপর আরও জোর দিতে হবে। দুটো ম্যাচের প্রথমটায় আমার ব্যাট করার সুযোগ আসেনি। দ্বিতীয়টায় ২৩ নট আউট ছিলাম। আমি যে অনেকের থেকে ভাল ব্যাট করতে পারি সেটা এখানে প্রমাণ করা গেল না। তবে আর একটা ম্যাচ খেলা হবে কর্ণাটকের ভেটারেনদের সঙ্গে। এই একটা ব্যাপারে আনোখা আমার থেকে এগিয়ে রয়েছে। ছেলেটা রগচটা কিন্তু সরল। আমার সঙ্গে ওর বন্ধুত্ব হয়ে গেছে। স্টেডিয়ামে আমাদের খাট দুটো পাশাপাশিই। একদিন রাতে কথায়—কথায় বলল, প্রত্যেক ব্যাটসমানকেই ও শত্রু বলে ভাবে। খেলার বাইরেও কোনও ব্যাটসম্যানের সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতায় না। তা হলে নাকি ওদের সম্পর্কে মন নরম হয়ে যাবে। অদ্ভুত, তাই নয়? সবসময় ও ঘৃণা করে ব্যাটসম্যানদের। ওর যুক্তি হল, তা হলে বল করার সময় বাড়তি একটা তেজ ও পায়, কখনও ঝিমিয়ে পড়ে না। আমাকে পরামর্শ দিল, ‘তুমিও হেট করো ব্যাটসম্যানদের। দেখছ তো তোমাকে কেমন হেট করে উসমানি। ও ঠিক বদলা নেবে তোমাকে।’ আনোখাকে আমি বললাম, ‘তুমি আমার রাইভাল। ও শুনে হোহো করে হাসল। বলল, ‘অনন্ত তোমাকে মোটেই রাইভাল ভাবি না। একটা টিমে বল ওপেন করতে দু’দিক থেকে দুটো লোক দরকার। ওয়েস্ট ইন্ডিজ টিম হলে তো চারটে লোক চাই। আমাদের দেশে চারটে কোথায়, শুধু তো একজনই এখন টেস্ট ক্লাসের মিডিয়াম ফাস্ট বোলার, সে হল দুয়া। চার—পাঁচ বছরের মধ্যেই আমি টেস্টে বল ওপেন করব আর অন্য দিক থেকে করবে তুমি।’ আনোখার কথা শুনে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। কি বিশ্বাস নিজের সম্পর্কে!
এখানে খাঁটি চন্দন কাঠ পাওয়া যায়, চন্দন পাউডারও। কাঠের নানারকম মজার মজার পুতুলও দোকানে দেখলাম। মার জন্য চন্দন কাঠ, পাউডার, ধূপ আর তোমার জন্য পুতুল নিয়ে যাব।
.
অনন্ত কলকাতায় ফেরার আগের দিন যখন বাঙ্গালোরে মহাত্মা গান্ধী রোডে কাবেরি থেকে চন্দন কাঠ কিনছিল সেই সময় প্রায় দেড় হাজার মাইল দূরে কলেজে ক্লাস নিতে—নিতে অরুণ সেন হঠাৎ মাথায় তীব্র যন্ত্রণা বোধ করেন। সংজ্ঞা হারিয়ে তিনি চেয়ার থেকে পড়ে যান। ডাক্তার আসেন। কাছাকাছি এক নার্সিং হোমে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয়। জ্ঞান আর ফেরেনি এবং সন্ধ্যায় তিনি যখন মারা যান তনিমা সেন তখন তাঁর হাত ধরে ছিলেন।
।। চার ।।
প্রিমিয়ারটা বাড়ির সামনে থামিয়ে, একবার হর্ন বাজিয়ে জীবন জানিয়ে দিল সে এসেছে।
চাতালের একধারে দেওয়ালে লাগান পুলি টেনে অনন্ত তখন ব্যায়াম করছিল। নভেম্বরেও দরদর করে ঘাম ঝরছে তার গলা ঘাড় বেয়ে। কাঁধের এবং পিঠের ফুলে ওঠা পেশীগুলো ঘামে ঝকঝক করছে। হর্নের আওয়াজে তার ব্যায়াম বন্ধ হল না।
